স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, কম খাওয়া। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, নিজেকে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করার প্রয়োজন নেই — আপনাকে শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে খেতে হবে। পরিমিত পরিমাণে খাওয়া মানে খাবারে বিধিনিষেধ আরোপ করা নয়;বরং এটি হলো ভারসাম্য, সচেতনতা এবং আপনার শরীরের ঠিক কতটা প্রয়োজন তা বোঝার বিষয়।
আপনার দৈনন্দিন খাবারে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াকে সহজ, আনন্দদায়ক এবং কার্যকর করে তোলার উপায় এখানে কিছু উপায় দেওয়া হলোঃ
খাবারের পরিমাণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্যকর খাবারও আপনার পুষ্টির লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে, যদি আপনি তা অতিরিক্ত পরিমাণে খান। উদাহরণস্বরূপ:
এক মুঠো বাদামে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ভরপুর থাকে — কিন্তু এর দ্বিগুণ পরিমাণ গ্রহণ করলে আপনার ক্যালোরির পরিমাণও দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।ফলে ওজন, ফ্যাটি লিভার বা শরীরে চর্বি বাড়াতে পারে।
আবার পরিমাপ না করে খাবার খেলে এক বাটি সিরিয়াল সহজেই তিনজনের খাওয়ার মতো হয়ে যেতে পারে।
রেস্তোরাঁয় খাবারের পরিমাণ প্রায়শই সুপারিশকৃত পরিবেশন আকারের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি হয়।এজন্য রেস্তোরায় গেলে খাবার পরিমিত খেতেও হবে।
খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা থাকলে, অতিরিক্ত না খেয়েও আপনি তৃপ্ত পেতে পারেন।
প্রতিদিনের অংশের নির্দেশিকা
কোনো খাবার মাপার যন্ত্রের প্রয়োজন নেই।শুধু পরিমানের ধারনা রাখা জরুরী।
প্রোটিন (মাংস, মুরগি, মাছ, টোফু): আপনার হাতের তালুর আকারের মতো (৩-৪ আউন্স)।
শর্করা (ভাত, পাস্তা, শস্য): আপনার হাতের তালুর সমান (রান্না করা ½ কাপ)।
শাকসবজি: আপনার প্লেটের অর্ধেকটা শাকসবজি দিয়ে পূর্ণ করুন — এগুলো পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং এতে ক্যালোরি কম থাকে।
ফল: টেনিস বলের আকারের মতো (১ কাপ বা একটি মাঝারি আকারের ফল)।
স্বাস্থ্যকর চর্বি (বাদাম, তেল, অ্যাভোকাডো): আপনার বুড়ো আঙুলের সমান (১ টেবিল চামচ তেল বা ¼ কাপ বাদাম)।
দুগ্ধজাতীয় খাবার (দুধ, দই, পনির): এক পরিবেশন হলো প্রায় ১ কাপ দুধ বা দই, অথবা দেড় আউন্স পনির (আপনার বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মিলিত আকারের)।
এই পরিমান খাবার খাওয়ার নির্ধারণকে সহজ করে তোলে যা প্রতি বেলায় মাপার কাপের প্রয়োজন হয় না।
স্মার্ট খাদ্যাভ্যাস কৌশল অনুসরন কিভাবে করবেন: ছোট প্লেট দিয়ে শুরু করুন। ছোট প্লেট আপনার পেট ভরার অনুভুতির সাথে চোখেও অনুভূতি দেয়। একটি ছোট প্লেট আপনার মস্তিষ্ককে কে বলে যে অল্পতেই আপনার পেট ভরে গেছে।
নাস্তা আগে থেকে ভাগ করে নিন। প্যাকেট থেকে সরাসরি খাওয়ার পরিবর্তে বাদাম, চিপস বা শুকনো ফল এক বেলার খাবারের পাত্রে ভাগ করে নিন।
ধীরে ধীরে খান। আপনার মস্তিষ্কের পেট ভরা বুঝতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। খাবারের স্বাদ উপভোগ করুন — এটি আপনাকে স্বাভাবিকভাবেই কম খেতে সাহায্য করে।
শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক রাখুন। অনেক সময় তৃষ্ণাকে ক্ষুধা বলে মনে হয়। আপনার প্রকৃত ক্ষুধা বোঝার জন্য খাওয়ার আগে জল পান করুন।
আঁশযুক্ত খাবার বেশি করে খান। শিম, ডাল, ফল এবং শাকসবজির মতো খাবার আপনাকে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে — যা অতিরিক্ত খাওয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ বনাম ক্যালোরি গণনা: ক্যালোরি গণনা করা কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতনতা একটি দীর্ঘমেয়াদে অনুশীলন করা সহজ করে তোলে — বিশেষ করে বাইরে খাওয়ার সময় বা পরিবারের সাথে খাবার ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে।
পরিমিত খাবার গ্রহণকে একটি কঠোর নিয়ম হিসেবে না দেখে, একটি সচেতন অভ্যাস হিসেবে ভাবুন। এটি আপনাকে নিজের শরীরের কথা শুনতে, ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেত চিনতে এবং খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখায়।
লেখক: পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।