মেডিকেল ভর্তি: চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা কি সমান সুযোগ পাবে?

একই প্রশ্নপত্র, একই মেধাতালিকা এবং একই আসনের জন্য প্রতিযোগিতা—কিন্তু প্রস্তুতির সুযোগে যদি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থাকে, তাহলে সেই প্রতিযোগিতায় যতটা সম্ভব সমতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় আসা উচিত।

২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময় নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যেই পরীক্ষা আয়োজনের চিন্তা রয়েছে। সেশন এগিয়ে আনার লক্ষ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এবারের বিশেষ বাস্তবতায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতিও ভর্তি পরীক্ষার সময় নির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

অন্যদের প্রস্তুতি শুরু, চট্টগ্রামে তখনও পরীক্ষা

বন্যা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের একাধিক এইচএসসি পরীক্ষা দীর্ঘ সময় স্থগিত ছিল। সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের স্থগিত লিখিত পরীক্ষা শেষ হচ্ছে ৯ সেপ্টেম্বর। ফলে দেশের অন্য অনেক বোর্ডের শিক্ষার্থীরা যখন ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখন চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের এইচএসসি পরীক্ষার কার্যক্রম সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়েছে।

এই ব্যবধান শিক্ষার্থীদের নিজেদের কারণে সৃষ্টি হয়নি; এটি একটি অনিবার্য পরিস্থিতির ফল।

একই প্রতিযোগিতায় যৌক্তিক প্রস্তুতির সময়

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর একটি। এখানে অল্প নম্বরের ব্যবধানও মেধাক্রমে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এইচএসসির প্রস্তুতির পাশাপাশি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত পুনরাবৃত্তি, বহুনির্বাচনী প্রশ্নের নিবিড় অনুশীলন, সময় ব্যবস্থাপনা, নির্ভুলতা এবং নেতিবাচক নম্বর এড়িয়ে চলার কৌশল।

তাই এইচএসসি শেষ হওয়ার পর একটি যৌক্তিক প্রস্তুতির সময় পাওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র, অতিরিক্ত নম্বর বা বিশেষ সুবিধার প্রশ্ন এখানে নেই। বিষয়টি বরং আরও সাধারণ—একটি জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিবার্য কারণে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরাও যেন যতটা সম্ভব সমান প্রস্তুতির সুযোগ পায়।

আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের পক্ষ থেকেও চট্টগ্রামের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী ভর্তি কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও সমানভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ফলে বিষয়টি কেবল শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ নয়; সমান সুযোগ নিশ্চিত করার একটি বাস্তব প্রশ্নও বটে।

জানুয়ারির মাঝামাঝি কি অস্বাভাবিক?

সেশন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভর্তি কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়া কাম্য নয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ সময় এগিয়ে নেওয়ার বিপরীতে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির বাস্তব সুযোগটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

জানুয়ারির মাঝামাঝি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৭ জানুয়ারি ২০২৫।

সেই নজির এবং এবারের চট্টগ্রাম বোর্ডের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৭ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করা যুক্তিসংগত হতে পারে। এতে সেশন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য পুরোপুরি উপেক্ষিত হবে না; আবার চট্টগ্রামের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরাও তুলনামূলকভাবে যৌক্তিক প্রস্তুতির সময় পাবে।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার তারিখ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের শ্রম, পরিবারের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের স্বপ্ন।

তাই সিদ্ধান্তটি শুধু কত দ্রুত পরীক্ষা নেওয়া যায়—এই বিবেচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে, কোন সময়ে পরীক্ষা নিলে প্রতিযোগিতাটি যতটা সম্ভব সমান ও ন্যায়সংগত হয়—সেই প্রশ্নটিও সামনে রাখা প্রয়োজন।

সেশন এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এবারের বিশেষ বাস্তবতায় এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত—বিশেষ করে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় বিবেচনা করা—সবচেয়ে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক