বাংলাদেশ বাংলাদেশ সৌরশক্তি উন্নয়নের জন্য বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। বছরে প্রায় ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় এবং দেশের অধিকাংশ এলাকায় দৈনিক ৪ থেকে সাড়ে ৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা/বর্গমিটার সৌর বিকিরণ বিদ্যমান। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, গ্যাসক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা এবং ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ এখন কেবল বিকল্প নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। রুফটপ সোলার, ফ্লোটিং সোলার, সোলার সেচ, এগ্রিভোল্টাইক এবং অফ-গ্রিড প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
জুলস পাওয়ার লিমিটেড (জেপিএল) ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০১৮ সালে টেকনাফ সোলারটেক এনার্জি লিমিটেডের মাধ্যমে দেশের প্রথম সোলার আইপিপি চালু করে প্রতিষ্ঠানটি একটি নতুন মাইলফলক স্থাপন করে। বর্তমানে TSEL (২৮ MWp) এবং মুক্তাগাছা সোলারটেক এনার্জি লিমিটেড (এমএসইএল) (২৮ MWp) মিলিয়ে ৫৬ MWp IPP পোর্টফোলিও পরিচালনা করছে।
রুফটপ সেগমেন্টে রবিনটেক্স গ্রুপ, নওয়াব গ্রুপ, এসকিউ গ্রুপ, সায়হাম গ্রুপ এবং আকিজ গ্রুপ সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। নওয়াব গ্রুপের প্রকল্পটি বাংলাদেশের প্রথম ভাসমান সোলার প্লান্ট হিসেবে পরিচিত। এমএসইএল বাংলাদেশের প্রথম বাস্তব Agrivoltaic Solar IPP, যেখানে ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি মৎস্যচাষ পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশে জমির প্রাপ্যতা সীমিত হওয়ায় ইউটিলিটি স্কেল সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থায়ন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রাঝুঁকি, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, গ্রিড আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা। সেজন্য ফ্লোটিং সোলার, Agrivoltaics এবং এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫, নেট মিটারিং গাইডলাইন-২০২৫ এবং প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজতর করার লক্ষ্যে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমরা সরকারের। এই সময়োপযোগী পদক্ষেপকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাতে চাই।
তবে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হওয়ার পরও এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হয় না। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়।
আমাদের মতে সরকারের আগামী দিনের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে সব অনুমোদন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনা। ইউটিলিটি স্কেল রিনিউবল এনার্জি প্রকল্পের জন্য আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ অনুমোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমূল্যেও গ্রিন ফাইনান্স সম্প্রসারণ করা।
সোলার, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর কর ও শুল্ক কাঠামো আরও বিনিয়োগবান্ধব করা। বিদেশি অর্থায়ন আকর্ষণে সরকারি গ্যারান্টির প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ইউটিলিটি স্কেল সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, রপ্তানি ঋণ সংস্থা, উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে শক্তিশালী পেমেন্ট সিকিউরিটি ম্যাকানিজম খোঁজে। তাই আমরা মনে করি, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইউটিলিটি স্কেল রিনিউয়েবল এনার্জি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকার পেমেন্টে গ্যারান্টি, Sovereign Support Mechanism অথবা সমমানের পেমেন্ট সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক বিবেচনা করতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংগ্রহ সহজ হবে; ঋণের সুদের হার কমানো সম্ভব হবে, প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম হ্রাস পাবে, বৃহৎ আকারের বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ত্বরান্বিত হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের পরবর্তী রূপান্তরের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট এবং কর্পোরেট রিনিউয়েবল পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট। এই কাঠামোর আওতায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সরাসরি শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে। এর মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের ESG, RE100 এবং নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সবুজ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
এমপিপি এবং কর্পোরেট পিপিএ সফল করার ক্ষেত্রে হুইলিং চার্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমাদের মতামত হলো হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিট ১ টাকার নিচে নির্ধারণ করা উচিত। এই হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা হলে শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প আন্তর্জাতিক সবুজ সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত হতে পারবে, জাতীয় পর্যায়ে রিনিউয়েবল এনার্জি মার্কেট দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।
এমপিপি প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো দীর্ঘমেয়াদি পিপিএ মেয়াদকালে কোনো শিল্প গ্রাহক আর্থিক সংকটে পড়া, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দেউলিয়া হওয়া বা অন্য কোনো কারণে বিদ্যুৎ জয় অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হওয়া। এ ধরনের পরিস্থিতি বিনিয়োগকারী এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আমরা প্রস্তাব করছি যে, এমপিপি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় এমন একটি ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে যেখানে: যদি কর্পোরেট অফ-টেকার পিপিএ মেয়াদকালে বিদ্যুৎ ক্রয়ে অক্ষম হয়ে পড়ে, তাহলে জাতীয় গ্রিড বা সরকারের মনোনীত কোনো সংস্থা প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০০% ক্রয়ের সুযোগ বা নিশ্চয়তা প্রদান করবে। এ ধরনের একটি ব্যাকস্টপ অফটেক ম্যাকানিজম প্রকল্পের Bankability বৃদ্ধি করবে, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আস্থা বাড়াবে, দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি অর্থায়ন সহজ করবে, কর্পোরেট পিপিএ বাজারকে দ্রুত সম্প্রসারণে সহায়তা করবে, এমপিপি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশে সফল এমপিপি ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের জন্য হুইলিং চার্জ যৌক্তিক রাখা এবং অফ-টেক সিকিউরিটি নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি নতুন বিনিয়োগ যুগের সূচনা হতে পারে। জুলস পাওয়ার লিমিটেড ভবিষ্যতে ইউটিলিটি স্কেল সোলার, রুফটপ সোলার, ড্রেটিং সোলার, Agrivoltaics, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট এবং মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট খাতে নেতৃত্ব প্রদান করতে চায়। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি জ্বালানি-নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
লেখক: চেয়ারম্যান, জুলস পাওয়ার লিমিটেড