বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা অত্যন্ত বাঙলাদেশে দৌলার দাকে শিক্ষা বন্যার কারণে বছরের অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। এই প্রাকৃতিক সুবিধা যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে সৌরবিদ্যুৎ দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা শুধু বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেল স্টেশন, অনাবাদি জমি, নদীর চর এবং জলাধারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। কৃষিজমিতে কৃষিকাজ অব্যাহত রেখে একই জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অ্যাগ্রিভোল্টাইক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কার্বন নিঃসারণ হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও তৈরি হয়।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বাস্তবায়িত তিস্তা সোলার লিমিটেডের ২০০ মেগাওয়াট (এসি) সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রমাণ করেছে যে বিভিন্ন কাঠামোগত ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। প্রকল্পটি উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে তিস্তা সোলার বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতাকে বাস্তবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি সুকুকের মাধ্যমে অর্থায়িত বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে দেশের ইসলামিক ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক সৃষ্টি করেছে।
তিস্তা সোলার লিমিটেডের প্রধান অগ্রাধিকার হলো সুন্দরগঞ্জে অবস্থিত ২০০ মেগাওয়াট (এসি) সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বজায় রাখা। প্রায় ৬৫০ একর জমির ওপর নির্মিত কেন্দ্রটি ৮ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন এবং প্রায় ৩৫.৭০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় করতোয়া সোলার লিমিটেডের ৩০ মেগাওয়াট (এসি) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রকল্পটির ভূমি উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ভবিষ্যতে অনুকূল সরকারি নীতি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পর্যাপ্ত গ্রিড সুবিধা পাওয়া গেলে নতুন বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, শিল্পভিত্তিক রুফটপ সোলার, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ এবং কৃষির সঙ্গে সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
আমরা মনে করি, সৌরবিদ্যৎ প্রকল্পের সাফল্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় দক্ষতা তৈরিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিস্তা সোলার প্রকল্প এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এ অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি অনুসরণীয় মডেল হতে পারে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে দক্ষ কর্মী তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যে কারিগরি ও দক্ষ জনবল তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উপযুক্ত জমির স্বল্পতা, জমি সংগ্রহ ও নামজটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন, ঋণপত্র বা এলসি খোলার সমস্যা, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা বড় প্রতিবন্ধকতা। একই সঙ্গে গ্রিড সংযোগের সক্ষমতা এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের বিল সময়মতো প্রাপ্তির বিষয়টিও প্রকল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর দেশ। ফলে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য একসঙ্গে পর্যাপ্ত ও বিরোধমুক্ত জমি পাওয়া কঠিন। বিভিন্ন মালিকের কাছ থেকে জমি ক্রয়, দলিল সম্পাদন, নামজারি, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন গ্রহণে দীর্ঘ সময় লাগে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্যানেল, ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির বড় অংশ আমদানি করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ডলার-সংকট, এলসি খোলার সীমাবদ্ধতা, উচ্চ সুদের হার এবং আমদানি পর্যায়ের কর ও শুল্ক প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দিনের বিভিন্ন সময় এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে উৎপাদন ওঠানামা করে। তাই বৃহৎ পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন পূর্বাভাস এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ প্রয়োজন। অনেক সম্ভাবনাময় এলাকায় পর্যাপ্ত সাব স্টেশন ও সঞ্চালন লাইন না থাকাও একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
এছাড়া বন্যা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, অতিরিক্ত ধুলা, ঝড় এবং অন্যান্য প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রকল্পের নকশা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। তিস্তা নদীসংলগ্ন এলাকায় প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার বন্যার ঝুঁকি কমেছে এবং কৃষি উৎপাদনের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা বৃহত্তর অর্থে একটি সার্কুলার ইকোনমির ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতের দ্রুত ও টেকসই বিকাশের জন্য একটি সমন্বিত, স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য কার্যকরী সার্ভিস চালু করে ভূমি, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, গ্রিড সংযোগ, আমদানি ও করসংক্রান্ত অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পব্যয়ের অর্থায়ন, পুনঃঅর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির কর-শুল্ক যৌক্তিকীকরণের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে মানসম্মত সৌরযন্ত্রাংশ উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন সাব স্টেশন ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ জরুরি। রুফটপ সোলারের নেট মিটারিং প্রক্রিয়া আরো সহজ ও কার্যকর করে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে হবে। কৃষিজমি সুরক্ষার স্বার্থে অনাবাদি জমি, চরাঞ্চল, সরকারি ভবনের ছাদ, শিল্পাঞ্চল, জলাধার এবং অ্যাগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
সব শেষে, বিনিয়োগকারীদের চুক্তিগত অধিকার সংরক্ষণ, নীতির ধারাবাহিকতা, উৎপাদিত বিদ্যুতের বিল সময়মতো পরিশোধ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের অনুকূল পরিবেশ। নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।
লেখক: সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার, তিস্তা সোলার লিমিটেড

