পুলিশ আবার হামলা ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হইতেছে!

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৯

গতকাল ছিল ‘পুলিশ সহযোগিতা দিবস'। দিবসটির নামকরণের মধ্যেই যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিহিত রহিয়াছে। কারণ, ‘সহযোগিতা’ কেবল পুলিশের নিকট হইতে পাওয়ার বিষয় নহে, এই ক্ষেত্রে বরং পুলিশের জন্যও আমাদের সহযোগিতার বিষয়টি সম্মুখে চলিয়া আসে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জানমালের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, দুর্যোগ ও সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ যখন বিপদে পড়িয়া আশ্রয় খোঁজে, তখন থানাপুলিশই হইয়া উঠে প্রধান ভরসাস্থল। ইহা যেন বাংলা নাটকের ঠিক সেই চমৎকার গানের কথার ন্যায়—“অর্ধেক দেবতা তুমি, অর্ধেক পুলিশ'। কথাটি নিছক রসিকতা হইলেও পুলিশের দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতার সহিত ইহার একধরনের সাদৃশ্য খুঁজিয়া পাওয়া যায়।

প্রকৃত পক্ষে পুলিশের চাকুরি অন্য ১০টি চাকুরির মতো নহে। সুবিশাল এই বাহিনীর সদস্যগণ অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় দায়িত্ব পালনে রত থাকেন। অথচ দুঃখজনকভাবে বিগত কয়েক বৎসর ধরিয়া তাহারা অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করিতেছেন। বিশেষত, '২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাহিনীটি অভূতপূর্ব সংকটের মুখে পড়িয়া যায়। দেশের বহু থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ইহাতে পুলিশের একটি বড় অংশ কর্মস্থল ছাড়িতে বাধ্য হন। ইহার পর পুলিশ ধীরে ধীরে দায়িত্বে ফিরিয়াছে বটে; কিন্তু আস্থা ও মনোবলের সংকট কাটাইয়া একটি পেশাদার বাহিনী হিসাবে নিজেদের পুনর্গঠন করা সহজ কাজ নহে। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও পুলিশের উপর একাধিক হামলার খবর আমাদের উদ্বেগ আরো বাড়াইয়া দিয়াছে। কোথাও আসামি ছিনাইয়া লওয়া হইতেছে, থানায় হামলার ঘটনা ঘটিতেছে; কোথাও সড়কে ট্রাফিক পুলিশকে প্রকাশ্যে মারধর করা হইতেছে; কোথাও আবার অপরাধী ধরিতে গিয়া হামলার শিকার হইতেছেন পুলিশ সদস্যরা। সর্বশেষ সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের এক সদস্যকে নির্মমভাবে পিটাইয়া হত্যার ঘটনা স্বভাবতই সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করিয়াছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বৎসরের জানুয়ারি হইতে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন হামলায় ৩৬১ জন পুলিশ সদস্য আহত হইয়াছেন। ২০২৫ সালে আহত হন ৬০১ জন। অর্থাৎ, বিগত ১৯ মাসে প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হইয়াছেন। এই পরিসংখ্যানকে কি কোনোভাবে স্বাভাবিক বলা যায়?

কোনো পুলিশ সদস্যের অন্যায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকিলে তাহার জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করিতে হইবে; কিন্তু সেই অভিযোগের কারণে পুরো বাহিনীকে শত্রু কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখিবার সুযোগ নাই। কারণ, পুলিশের উপর হামলা রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতার উপর আঘাতের শামিল। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশসমূহের দিকে তাকাইলে আমরা দেখিতে পাই, সেইখানে পুলিশকে কেবল ‘শক্তি প্রয়োগকারী বাহিনী' হিসাবে দেখা হয় না, বরং তাহাদের নিকট পুলিশ হইল 'জনগণের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান'। ইহার পাশাপাশি পুলিশের ক্ষমতার উপর থাকে শক্তিশালী জবাবদিহি ও স্বাধীন তদারকি। তবে দুঃখজনকভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের সমাজব্যবস্থায় পুলিশিং এখনো ততটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াইতে পারে নাই।

প্রশ্ন হইল, যেই পুলিশ সর্বদাই এতটা দায়িত্ব এবং চাপের মধ্যে নিপতিত থাকে, সেই তাহাদের প্রতিই কেন অহর্নিশ অঙ্গুলি প্রদর্শন করা হইবে? পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দেওয়া যেই কোনো রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। পুলিশ দুর্বল হইলে আইন দুর্বল হইয়া পড়ে, আর আইন দুর্বল হইলে শক্তিশালী হয় অপরাধীরা। মূলত এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরিয়া পুলিশের সংস্কার ও পুনর্গঠনের দাবি রহিয়াছে। পুলিশের মনোবল ফিরাইবার স্বার্থে তাহাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, ঝুঁকি মূল্যায়ন, মানসিক সহায়তা এবং দায়িত্ব পালনের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিও দীর্ঘদিনের। তবে পরিতাপের বিষয়, বিভিন্ন সময় এই সকল বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে উহার অধিকাংশই আলোর মুখ দেখে নাই।

মনে রাখা দরকার—সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল পুলিশ জনগণের বন্ধু। তাই পুলিশকে ভয় নহে, বরং আস্থার প্রতীক করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। দায়িত্ব পালনের জন্য তাহাদের দিতে হইবে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক মর্যাদা। আমরা মানবিক পুলিশ চাইব; কিন্তু পুলিশের প্রতি মানবিক আচরণ করিব না—এই দ্বিমুখী প্রবণতা লইয়া আর যাহাই হউক, ‘জনবান্ধব পুলিশিং' প্রত্যাশা করা অমূলক।

ইত্তেফাক/এনএন