বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু জায়েদ উসামাহ ইবনু জায়েদ ইবনু হারিসাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। আগুনের তাপে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে।
সে অবস্থায় সে জাহান্নামের মধ্যে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা চরকার চারপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামিরা তার চারপাশে জড়ো হয়ে তাকে বলবে, ‘হে অমুক! তোমার কী অবস্থা? তুমি তো মানুষকে ভালো কাজের আদেশ করতে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে।’
সে বলবে, ‘হ্যাঁ, আমি তোমাদের ভালো কাজের আদেশ করতাম, কিন্তু নিজে তা পালন করতাম না। আবার তোমাদের অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতাম, অথচ নিজেই সেই কাজে লিপ্ত হতাম।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৬৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৪৮৩
এই হাদিসে অন্যকে ভালো কাজের উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের জীবনেও সেই উপদেশ বাস্তবায়নের গুরুত্ব অত্যন্ত কঠোরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, কাউকে ভালো কাজের নসিহত করার আগে নিজের জীবনেও তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত। শুধু মুখে উপদেশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিজের আমলও সেই কথার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
মানুষকে নামাজের কথা বলে নিজে নামাজ না পড়া, সত্যবাদিতার শিক্ষা দিয়ে নিজে মিথ্যা বলা কিংবা হারাম থেকে বেঁচে থাকার উপদেশ দিয়ে নিজেই হারামে লিপ্ত থাকা অত্যন্ত ভয়ংকর বিষয়। নিয়মিত অন্যকে ভালো কাজের কথা বলা হলেও নিজে তা পালনের ব্যাপারে উদাসীন থাকলে সেই নসিহত একসময় তার বিরুদ্ধেই প্রমাণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিমুখী আচরণ থেকে বেঁচে থাকা। অন্যের জন্য এক ধরনের নীতি আর নিজের জন্য ভিন্ন নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়। মানুষের সামনে একরকম এবং গোপনে আরেক রকম জীবনযাপন করাও একজন মুমিনের জন্য বিপজ্জনক।
শুধু দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই জ্ঞানের দাবি অনুযায়ী আমল করাও জরুরি। কারণ জ্ঞান যখন আমলে পরিণত হয় না, তখন তা মানুষের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে তার ওপর দায়িত্ব ও জবাবদিহির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে নিজের কোনো দুর্বলতা থাকলে অন্যকে ভালো কাজের নসিহত করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। বরং অন্যকে সঠিক কথা বলার পাশাপাশি নিজের সংশোধনের চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে। নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা এক বিষয়, আর জেনেশুনে অন্যকে নসিহত করে নিজে তা পালনের ব্যাপারে উদাসীন থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সুতরাং একজন মুমিনের চেষ্টা হওয়া উচিত—তার কথা ও কাজের মধ্যে যেন সামঞ্জস্য থাকে। প্রকাশ্য ও গোপন জীবনেও যতটা সম্ভব মিল থাকা প্রয়োজন। কারণ মানুষের সামনে ভালো সাজা, অথচ গোপনে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকা ঈমানদারের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।