সারে ভেজাল, কৃষকের সর্বনাশ

দুই শত বৎসর পূর্বে জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডেরিক আকুম লন্ডনের খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহতা দেখাইয়া 'Death in the Pot' নামে একটি গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন। তাহার সেই সতর্কবার্তার পর উন্নত বিশ্ব ধীরে ধীরে খাদ্য ও কৃষি উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং বাজার তদারকির ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিয়াছে। অথচ দুঃখজনকভাবে আমরা যেন সেই পুরাতন সমস্যাটিকেই নূতন মোড়কে ফিরাইয়া আনিতেছি! ভেজালের জগতে আমাদের কৃতিত্বের সত্যিই কোনোই সীমারেখা নাই। দুধে পানি, মসলায় ইটের গুঁড়া, মাছে রং-এমনকি কথাবার্তা, আচরণ ও সম্পর্কেও ভেজালের অভিযোগ উঠে নিত্যদিন; আর এইবার ভেজাল ঢুকিয়া পড়িয়াছে কৃষকের জমির জন্য নির্ধারিত সারের বস্তায়। অনুর্বর মাটিকে উর্বর করিবার রসদ, তথা খোদ ফসল ফলাইবার উপকরণের সঙ্গে ভেজাল মিশ্রিত করিবার এই প্রবণতা কৃষকের ঘাম, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সহিত ছিনিমিনি খেলা বই আর কিছুই নহে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ভেজাল সার ও কীটনাশক তৈরির কারখানার সন্ধান মিলিতেছে। কোথাও ডলোমাইট চুন, সিরামিক মাটি, সিমেন্ট ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মিশাইয়া সার তৈরি করা হইতেছে, কোথাও আবার অনুমোদনহীন ও ভেজাল কীটনাশক নামিদামি প্রতিষ্ঠানের মোড়কে বাজারজাত করা হইতেছে। প্রশাসনের অভিযানে এমন কারখানা হইতে বিপুল পরিমাণ ভেজাল সার-কীটনাশক, কাঁচামাল ও সরঞ্জাম জব্দের পাশাপাশি জরিমানা, কারাদণ্ড, পণ্য ধ্বংস ও কারখানা সিলগালার ঘটনাও ঘটিয়াছে। শুধু কারখানায় অভিযান চালাইয়া নহে, বাজারে বিক্রি হওয়া পণ্যের পরীক্ষাতেও ভেজালের প্রমাণ মিলিতেছে। সম্প্রতি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে বাজার হইতে ১৬টি প্যাকেটজাত কৃষিপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করিয়া পরীক্ষা করা হইলে কৃষি বিভাগ সাতটি কোম্পানির সারে ভেজাল পাওয়ার কথা জানায় এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজার হইতে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।

ইহা যেন কল্পনারও বাহিরে! একজন কৃষক সারা বৎসরের পরিশ্রম, ঋণ বা ধারকর্জ এবং সঞ্চয়ের অর্থ ব্যয় করিয়া জমিতে সার প্রয়োগ করিয়া পরবর্তী সময়ে দেখিলেন যে, সেই সারের ভিতর প্রয়োজনীয় উপাদানের পরিবর্তে রহিয়াছে চুন, মাটি কিংবা অন্য কোনো অনুপযুক্ত পদার্থ-কৃষকের এই ক্ষতি কীভাবে পূরণ হইবে? কারণ, ভেজাল সারের ক্ষতি কেবল আর্থিক হিসাবে পরিমাপযোগ্য নহে। কৃষক একদিকে আসল পণ্যের মূল্য দিয়া নকল বা নিম্নমানের পণ্য কিনিতেছেন, অন্যদিকে ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলন না হইলে পুনরায় সার বা কীটনাশক কিনিতে হইতেছে। অর্থাৎ, ইহার ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়িতেছে, কমিতেছে কৃষকের আয়। আবার কীটনাশক অকার্যকর হইলে পোকামাকড় দমন হওয়ার পরিবর্তে উলটা ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। কৃষকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি পোষাইবে কে?

উন্নত বিশ্বে আমরা কী দেখি? সেইখানে কৃষি উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখা হয়। নিবন্ধনহীন, ভেজাল বা ভুল লেবেলযুক্ত কীটনাশকের বিরুদ্ধে পণ্য জব্দ, বাজার হইতে প্রত্যাহার এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি ব্যবস্থার বিধান করিয়াছে তাহারা। নির্ধারিত মান পূরণ না করা সার বাজার হইতে প্রত্যাহার বা রিকল করিবার ব্যবস্থা পর্যন্ত রহিয়াছে। অর্থাৎ, সেইখানে কৃষকের হাতে পৌছানোর পূর্বেই পণ্যের মান, উপাদান ও উৎস শনাক্তকরণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদেরও কি সেই পথে হাঁটা উচিত নহে?

যুদ্ধবিগ্রহ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক নানা সংকটে যখন খাদ্যনিরাপত্তা লইয়া বিশ্ব জুড়িয়া উদ্বেগ বাড়িতেছে, ঠিক সেই সময়ে কৃষির অন্যতম প্রয়োজনীয় উপকরণে ভেজাল মিশানোর প্রবণতাকে কোনোভাবেই 'সাধারণ ব্যাবসায়িক অনিয়ম' হিসাবে দেখিবার সুযোগ নাই। অতএব, সরকারকে এখনই কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। অভিযান চলুক, কিন্তু অভিযানের পাশাপাশি স্থায়ী নজরদারি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়িয়া উঠুক; অপরাধীর শাস্তি হউক এবং সর্বোপরি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হউক। কৃষকের ঘাম ও দেশের খাদ্যভাণ্ডার লইয়া যাহারা ছিনিমিনি খেলিতেছে, তাহাদের প্রতি রাষ্ট্রের এই পরিষ্কার বার্তা দিতে হইবে যে, সারে ভেজাল কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হইবে না।