প্রশ্ন ব্যতীত সমাজ সুস্থ হয় না

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩০

মানুষের চিন্তাশক্তির সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হইল প্রশ্ন করিবার সামর্থ্য। এই সামর্থ্যই মানুষকে স্থবিরতা হইতে মুক্ত করিয়া ক্রমাগত বিকাশের পথে পরিচালিত করে। প্রশ্ন করিতে না পারিলে জ্ঞান কেবল শব্দ, তথ্য ও ধারণার সমষ্টিতে পর্যবসিত হয়, জীবন্ত শক্তিতে পরিণত হয় না। জ্ঞান তখনই অর্থবহ হইয়া উঠে, যখন মানুষ প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করিতে, অজানাকে অনুসন্ধান করিতে এবং সত্যের গভীরে প্রবেশ করিতে আগ্রহী হয়। প্রশ্নই সেই অনুসন্ধানের প্রথম সোপান। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দার্শনিক ঐতিহ্যে প্রশ্নের ভূমিকা অপরিসীম।

উপনিষদের 'কেন', বুদ্ধের দুঃখের কারণ ও তাহার অবসানের অনুসন্ধান, সক্রেটিসের আত্মজিজ্ঞাসা এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর জ্ঞানান্বেষী মন-প্রত্যেকটি মানবচিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করিয়াছে। প্রচলিত বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করিয়া মানুষ যখন প্রশ্ন করিয়াছে, তখনই জন্ম লইয়াছে নূতন দর্শন, বিজ্ঞান ও সামাজিক চিন্তা। সভ্যতার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অন্তরালে রহিয়াছে কোনো না কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্ন, যাহা মানুষকে পরিচিত সত্যের বাহিরে তাকাইতে বাধ্য করিয়াছে।

কিন্তু বর্তমান সমাজে প্রশ্ন করিবার সেই স্বাভাবিক প্রবণতা নানা কারণে সংকুচিত হইতেছে। বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থনির্ভরতা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিকতার ভারে অবনত। শিক্ষার্থীর জানিবার আগ্রহের পরিবর্তে নির্দিষ্ট উত্তর মনে রাখিবার দক্ষতাই অধিক গুরুত্ব লাভ করে। পাঠ্যক্রমে 'কী' প্রশ্নের প্রাধান্য থাকিলেও 'কেন' ও 'কীভাবে' প্রশ্নের জন্য পর্যাপ্ত অবকাশ থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অনেক ক্ষেত্রেই গবেষণা, মুক্তচিন্তা ও অনুসন্ধানের পরিবর্তে সনদ অর্জন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হইয়া দাঁড়ায়। ফলে শিক্ষার পরিসর বিস্তৃত হইলেও চিন্তার গভীরতা ও স্বাধীনতা যথাযথভাবে বিকশিত হয় না।

আজিকার পৃথিবী তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিস্তারে পরিপূর্ণ। মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য তথ্য মানুষের হাতের মুঠায় পৌঁছাইয়া যাইতেছে; কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য সর্বদা জ্ঞানের গভীরতা নিশ্চিত করে না। তথ্যকে যাচাই, বিশ্লেষণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের আলোকে বিচার করিবার ক্ষমতা না থাকিলে তাহা কেবল বিচ্ছিন্ন উপাত্ত হিসাবেই থাকিয়া যায়। দ্রুততার এই যুগে মনোযোগের স্থায়িত্বও ক্রমশ হ্রাস পাইতেছে। ক্ষণস্থায়ী বিনোদন, উত্তেজক দৃশ্য ও অবিরাম পর্দা-নির্ভরতায় মানুষের চিন্তার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হইতেছে। ফেসবুক, ইউটিউবের রিলস ও শর্টসের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয়বস্তু অনেক সময় গভীর মনোযোগের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকে উৎসাহিত করে। ফলে চিন্তার ধীরতা, ধৈর্য ও মননশীলতার প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষিত হইতেছে।

এই পরিস্থিতিতে বই পাঠ, পাঠাগার সংস্কৃতি এবং মুক্ত আলোচনার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। একটি ভালো বই মানুষকে কোনো না কোনোভাবে ঋদ্ধ করে। বিজ্ঞান-পাঠ বুঝায়, লজিকের ভিতর দিয়াই ম্যাজিক তৈরি করা যায়। ক্রিটিক্যালি ইতিহাস-পাঠ মানুষকে বুঝিতে সাহায্য করে, কোন সমাজের বর্তমান অবস্থান কীভাবে নির্মিত হইয়াছে। দর্শন শেখায় যুক্তির সীমা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে ভাবিতে। সাহিত্য মানুষের অভিজ্ঞতাকে বহুমাত্রিক করিয়া তোলে, অন্যের জীবন ও অনুভূতির সহিত পরিচিত করায়। এই সকল চর্চার মধ্য দিয়াই মানুষ প্রশ্ন করিবার নৈতিক সাহস অর্জন করে। সে তখন জিজ্ঞাসা করিতে শেখে-কোনো সিদ্ধান্ত সত্যই ন্যায়সংগত কি না. প্রচলিত নীতি মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করিতেছে কি না।

প্রশ্নহীনতা কেবল শিক্ষার সংকট নহে; ইহা গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সামাজিক অগ্রগতিরও অন্তরায়। যেই সমাজে মানুষ প্রশ্ন করিতে ভয় পায়, সেখানে ভুল সিদ্ধান্ত, অন্যায় ও অসংগতি দীর্ঘস্থায়ী হইবার সুযোগ লাভ করে। যুক্তির পরিবর্তে অন্ধ আনুগত্য প্রতিষ্ঠা পায়। বিপরীতে, যেই সমাজে প্রশ্নকে জ্ঞানের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হিসাবে গ্রহণ করা হয়, সেইখানে মতের ভিন্নতা, বিতর্ক ও সংশোধনের পথ উন্মুক্ত থাকে। প্রশ্ন করিবার অধিকার তাই কেবল ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয় নহে, ইহা একটি সুস্থ সমাজের মৌলিক শর্ত। অতএব, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশে জিজ্ঞাসু মন গঠনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হইবে। যেই সমাজ প্রশ্ন করিতে জানে, তাহাকে দীর্ঘকাল অন্ধকারে আবদ্ধ রাখা কঠিন।

ইত্তেফাক/এএম