আন্তর্জাতিক মহাকাশ শান্তিচুক্তি জরুরি

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৯

সম্প্রতি মার্কিন বিমান বাহিনীর সচিব টা মেইংক আন্তর্জাতিক এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে প্রকাশ্যে এই প্রথম বারের মতো স্বীকার করিয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর কক্ষপথে আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন মহাকাশ অস্ত্র মোতায়েন করিয়াছে। এই সকল সক্ষমতা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক—উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হইতে পারে। ইহার মাধ্যমে শুধু আকাশে নহে, এখন হইতে মহাকাশেও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় থাকিবে। ইহাতে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি আরো বাড়িয়া গেল। এই পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করিয়াছে। বিশেষ করিয়া, চীন উক্ত ঘটনার তাৎক্ষণিক ও তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়া সতর্কবার্তা জারি করিয়াছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে এইরূপ পদক্ষেপ হইতে বিরত থাকিবার আহ্বান জানাইয়াছে।

উল্লেখ্য, মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ, বিশেষ করিয়া যোগাযোগ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত শত শত স্যাটেলাইটকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করে স্পেস ফোর্স। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইহা নতুন শাখা। গত বৎসর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংক্রান্ত একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। ইহারই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে ‘গোল্ডেন ডোম' প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করিয়াছে স্পেস ফোর্স। ইহার আওতায় রহিয়াছে—স্পেস বেসড ইন্টারসেপ্টর (এসবিআই) এবং স্পেস বেসড এয়ার মুভিং টার্গেট ইন্ডিকেশন (এএমটিআই)। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে দুই প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীন মূলত মহাকাশে মার্কিন স্বার্থের জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করিতেছে। প্রতিপক্ষের মহাকাশ সক্ষমতা মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরি করিতেছে চীন। অন্যদিকে রাশিয়া মহাকাশকে যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসাবে দেখে এবং মনে করে ভবিষ্যতে মহাকাশে আধিপত্যই হইবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক প্রথম মহাকাশযান হিসাবে কক্ষপথে যাওয়ার পরপরই স্যাটেলাইটে অস্ত্র মোতায়েন লইয়া কাজ শুরু করে ওয়াশিংটন ও মস্কো। চলতি বৎসরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে জানা যায়, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর হইতে ইউরোপের অন্তত ১০-১২টি স্যাটেলাইটের যোগাযোগে আড়ি পাতিয়াছে রাশিয়া। ইহার মাধ্যমে স্যাটেলাইট হইতে পাঠানো সকল সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এমনকি তাত্ত্বিকভাবে এই সকল স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র জানাইয়াছিল, রাশিয়া এমন একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করিয়াছে যাহা অন্য স্যাটেলাইটে হামলা চালাইতে সক্ষম। তবে এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করে নাই রাশিয়া। এমনকি ২০১৯ সালের মার্চে ভারতও বলিয়াছিল, তাহারা একটি নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট ধ্বংস করিয়াছে। সুতরাং মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতাই নহে, সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়িতেছে।

মহাকাশ অস্ত্র মূলত এমন এক প্রযুক্তিগত ও সামরিক ব্যবস্থা, যাহা পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থানরত কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস, অকার্যকর বা তথ্য আড়ি পাতিতে ব্যবহৃত হয়। ইহার গতিপ্রকৃতি দুই ভাগে বিভক্ত—এক. কাইনেটিক উইপনস বা গতিশক্তিনির্ভর অস্ত্র যাহা সরাসরি সংঘর্ষ ঘটাইয়া উপগ্রহ ধ্বংস করে। দুই, নানকাইনেটিক উইপনস বা গতিশক্তিবিহীন অস্ত্র, যাহা রেডিও জ্যামিং, লেজার বা সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা বিকল করিয়া দেয়। ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী মহাকাশে ব্যাপক বিধ্বংসী পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ হইলেও, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন প্রথাগ ত ও ইলেকট্রনিক মহাকাশ অস্ত্র মোতায়েনে প্রতিযোগিতা অব্যাহত রাখিয়াছে যাহা উদ্বেগজনক। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মহাকাশ যুদ্ধ আর দূরবর্তী কল্পবিজ্ঞান নহে, বরং এক আসন্ন বাস্তবতা। পৃথিবীর আধুনিক যোগাযোগ, জিপিএস, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কক্ষপথে সংঘাতের সৃষ্টি হইলে পৃথিবীর মহাকাশ আবর্জনার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাইবে। ইহা মানবজাতির ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযাত্রা ও মানব সভ্যতার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করিবে।

অতএব, মহাকাশে এই বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগাইয়া আসা উচিত। ১৯৬৭ সালের আংশিক চুক্তি পুনর্মূল্যায়নপূর্বক সর্বাত্মক ও বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক মহাকাশ শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। ইহার আওতায় সকল প্রকার স্যাটেলাইট-বিরোধী অস্ত্র ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধযন্ত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করিতে হইবে। জাতিসংঘের মাধ্যমে এই সংক্রান্ত তদারকি জোরদার করিতে হইবে। বিজ্ঞান মানবজাতির জন পরম আশীর্বাদ স্বরূপ, অন্যদিকে চরম অভিশাপও বটে। তাই ধ্বংসাত্মক মানসিকতা পরিহার করিয়া বিজ্ঞানের অবদানকে মানবজাতির কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এনএন