রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান জনগণের সম্পদ বিধায় প্রতিষ্ঠানগুলি দেশের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার কাজে ব্যবহৃত হইবে-ইহাই প্রত্যাশিত। অথচ বাংলাদেশের বহু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বৎসরের পর বৎসর লোকসান দিয়া চলিতেছে। লোকসানের বোঝা বাড়িতেছে, ব্যাংকের ঋণ জমিতেছে, উৎপাদনক্ষমতার অপচয় ঘটিতেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন তিনটি কর্পোরেশনের ২০২৫-২৬ অর্থবৎসরের হিসাবেই সমস্যাটির গভীরতা স্পষ্ট। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের অধীন ১৬টি প্রতিষ্ঠানের আয় হইয়াছে ১ হাজার ২২২ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা, ব্যয় ১ হাজার ৫৭৬ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের অধীন ১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটি লোকসান দিয়াছে। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনের অধীন ৯টি প্রতিষ্ঠানের ছয়টিই লোকসানের মুখে। অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ১৮টি প্রতিষ্ঠানের লোকসান এক অর্থবৎসরে ১৯ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকায় পৌঁছিয়াছে। এই অর্থের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করিতে হয় জনগণকেই।
প্রশ্ন হইল, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা কি নাই, যাহাতে সরকারি মালিকানা বজায় রাখিয়াও মুনাফা অর্জন সম্ভব? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলিতেছে, তাহা সম্ভব। সিংগাপুরে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নরওয়ের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ, সুস্পষ্ট লক্ষ্য এবং নিয়মিত কর্মসম্পাদন মূল্যায়নের ব্যবস্থা রহিয়াছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাবিষয়ক নির্দেশিকাতেও মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে পৃথক রাখিবার উপর গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। এই অভিজ্ঞতা হইতে বাংলাদেশের শিক্ষণীয় বিষয় হইল, রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিজে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নিশ্চিত করে না। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং ফলাফলের জন্য জবাবদিহিতা। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, অপ্রয়োজনীয় জনবল, ট্রেড ইউনিয়নের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না করিলে কেবল অর্থ বরাদ্দ করিয়া পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো যাইবে না।
সর্বাগ্রে প্রয়োজন কর্মকর্তাদের কর্মমূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন। একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা প্রধান নির্বাহীর সাফল্য নির্ধারিত হইবে তাহার পদমর্যাদা বা চাকুরির মেয়াদ দিয়া নহে, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের গুণমান, বাজার সম্প্রসারণ ও আর্থিক ফলাফল দিয়া। দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় লইয়া তাহাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য দেওয়া যাইতে পারে। সেই লক্ষ্য অর্জিত হইলে প্রণোদনা, পদোন্নতি কিংবা দায়িত্বের মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ থাকিবে। আর অবহেলা, অদক্ষতা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে লোকসান বাড়িলে কর্মমূল্যায়নে তাহার নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটিবে। তবে বাজারের প্রতিকূলতা, সরকারি নীতির বাধ্যবাধকতা কিংবা কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে লোকসান হইলে তাহার নিরপেক্ষ মূল্যায়নও জরুরি।
ইহার সহিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আয়ব্যয়, ঋণ, উৎপাদনক্ষমতার ব্যবহার ও সরকারি ভর্তুকির হালনাগাদ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন। স্বাধীন নিরীক্ষা এবং সংসদীয় তদারকির মাধ্যমে অনিয়ম চিহ্নিত করিতে হইবে। যেই সকল প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের মাধ্যমে লাভজনক করা সম্ভব, সেইগুলির জন্য সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাইতে পারে। আর যেই সকল প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে টিকসই করা সম্ভব নহে, সেইগুলির ক্ষেত্রে বাস্তবোচিত বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে যৌথ বিনিয়োগ কিংবা অন্য কোনো সম্ভাবনা যাচাই করা যাইতে পারে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও পাওনা সুরক্ষার ব্যবস্থাও পাশাপাশি রাখিতে হইবে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লোকসানকে নিয়মিত ঘটনা হিসাবে গ্রহণ করিবার সংস্কৃতি ভাঙিতে হইবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবহারের দায়িত্ব যাহাদের হাতে, সাফল্যের কৃতিত্ব এবং ব্যর্থতার দায়ও তাহাদের বহন করিতে হইবে। যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা না গেলে লোকসানের বিল মিটাইতেই থাকিবে রাষ্ট্র-যাহা জনগণেরই অর্থ। সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও কেবল কাগজেই থাকিয়া যাইবে। দিনের পর দিন ইহা চলিতে পারে না।