মানুষ ঘর হইতে বাহির হইয়া নিরাপদে ফিরিবে-এই নিশ্চয়তাটুকুও যদি না থাকে, তাহা হইলে উন্নয়নের সাফল্য ম্রিয়মাণ হইয়া যায়। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই ও নানা অপরাধে জনজীবনে আতঙ্ক বাড়িতেছে। শিশুরাও নিরাপদ নহে। মানুষের মনে যখন নিজের জীবন, সন্তান ও সম্পদ লইয়া শঙ্কা বাসা বাঁধে, তখন উন্নয়নের হিসাবের আড়ালে এই বাস্তবতা চাপা দেওয়া যায় না। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ঘাটতি দেখা দিলে সমাজের অগ্রগতি লইয়াও প্রশ্ন উঠিবে।
সম্প্রতি নাটোরে এক জার্মান পর্যটকের ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন হারাইয়া যায়। সেইগুলি উদ্ধারের আশায় তাহাকে থানায় বারবার ধরনা দিতে হইয়াছে। একজন বিদেশি পর্যটকের এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বিব্রতকর। তাহার ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি দেশের জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তৎপরতা লইয়াও প্রশ্ন উঠিতে পারে। বিদেশে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বান্ধবীর বাড়ি যাইবার পথে নিখোঁজ হইবার পর তাহার মরদেহ ধানখেতে পাওয়া যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনা আরো বড় প্রশ্ন তুলিয়া দেয়-আমাদের শিশুরাও কি নিরাপদে চলাফেরা করিতে পারিবে না? খুলনায় এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা এবং বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আক্রান্ত হইবার খবরও উদ্বেগ বাড়াইতেছে। বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বৈষম্যের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এই সবের অজুহাতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নাই।
বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কার্যকর বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলিয়া বিবেচনা করে। নিরাপত্তার অভাব অর্থনীতিকেও দুর্বল করে। মানুষ যখন নিজের সম্পদ, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান কিংবা জীবন লইয়া শঙ্কিত থাকে, তখন বিনিয়োগে ঝুঁকি বাড়ে, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও সংকুচিত হইয়া পড়ে। কাজেই উন্নয়নের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাইতে হইলে তাহার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলির অভিজ্ঞতা হইতে আমাদের শিক্ষা গ্রহণের অবকাশ রহিয়াছে। অনেক দেশে নাগরিকেরা সরাসরি থানায় অপরাধের অভিযোগ জানাইতে পারেন; কোথাও অনলাইনেও চুরি, প্রতারণা কিংবা সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ দাখিলের ব্যবস্থা আছে। অভিযোগ গ্রহণের পর তদন্ত হয় এবং প্রয়োজন অনুসারে বিষয়টি প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়। অর্থাৎ, অভিযোগ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ গড়িয়া তোলা হইয়াছে।
পৃথিবীর কোনো দেশই অবশ্য অপরাধমুক্ত নহে। কিন্তু অপরাধ ঘটিলে রাষ্ট্র কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং সেই ব্যবস্থার জন্য কতটা জবাবদিহি নিশ্চিত করে-প্রশ্ন এইখানেই। আমাদের দেশেও নজরদারি জোরদার করিতে হইবে। অপরাধীর রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক পরিচয় যাহাই হউক, আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকা চলিবে না। অপরাধের বিচার নিশ্চিত হইলেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিবার পথ তৈরি হইবে। নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক প্রত্যাশা। রাস্তায় চলিতে, সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাইতে কিংবা নিজের উপার্জিত সম্পদ রক্ষা করিতে মানুষকে প্রতিনিয়ত শঙ্কায় থাকিতে হইলে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই অনিশ্চয়তা দূর করা। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরাইতে হইলে অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ, পুলিশের দ্রুত সাড়া এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে একটি সমাজ কতদূর আগাইতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিবার সময় আর দীর্ঘায়িত করা চলে না। সুতরাং ভয়ভীতিমুক্ত সমাজ গঠনই হউক রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।
