কিছু মানুষ কর্মক্ষেত্র হইতে বিদায় নেন বটে, কিন্তু তাহাদের বিদায়ে যেন নীরব হইয়া পড়ে কোটি মানুষের হৃদয়। ফুটবলের বরপুত্র লিওনেল মেসির বিদায় ঠিক তেমনই। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামিয়া মেসি গোল করিলেন, বিদায় বলিলেন, আবেগ সামলাইতে না পারিয়া তাহার চোখের কোণে অশ্রু জমিল আর সেই আনন্দাশ্রু ভাসাইয়া লইয়া গেল গোটা বিশ্বকে। তবে মেসির বিদায়ি ভাষণের সব চাইতে বড় দিক যতটা না ফুটবল, তাহার চাইতে অধিক নিজের দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাহার অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিংবদন্তির বিদায়ি কথাগুলির মধ্যে আমরা এক বৃহত্তর শিক্ষার উপলক্ষ্য খুঁজিয়া পাই; তিনি বলিয়াছেন, আর্জেন্টাইন হইয়া জন্মগ্রহণ করিতে পারায় তিনি সৃষ্টিকর্তার নিকট কৃতজ্ঞ এবং দেশের মানুষের সঙ্গে নিজের স্বপ্ন পূরণ করিতে পারায় গর্বিত। পৃথিবীর অন্যতম সফল মানুষ হইয়াও নিজের জাতীয় পরিচয়কে এমন গভীর আবেগে ধারণ করা নিঃসন্দেহে এক অনন্য শিক্ষা।
মেসির কথার মধ্যে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকাইয়া আছে; উহা হইল, দেশের জন্য কাজ করিবার কোনো নির্দিষ্ট পেশা নাই। একজন ফুটবলার যেমন দেশের পতাকাকে বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল করিতে পারেন, তেমনি একজন শিক্ষক জ্ঞান দিয়া, একজন চিকিৎসক সেবা দিয়া, একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করিয়া, একজন প্রকৌশলী নির্মাণ করিয়া, একজন সাংবাদিক সত্য প্রকাশ করিয়া দেশের জন্য অবদান রাখিতে পারেন। অর্থাৎ, দেশপ্রেম কেবল স্লোগান নহে, ইহা দায়িত্ব পালনেরও নামান্তর। পতাকা হাতে দাঁড়াইলেই দেশের প্রতি দায়িত্ব শেষ হইয়া যায় না; বরং নিজের কাজটি সততার সহিত করা, মানুষের উপকারে আসা এবং দেশের মর্যাদা রক্ষা করাও দেশপ্রেমেরই অংশ। মেসি আর্জেন্টিনার সম্পদ, কিন্তু তাহার প্রতিভা তাহাকে সমগ্র বিশ্বের সম্পদে পরিণত করিয়াছে। ক্রীড়ার এই শক্তি যে কত গভীর, তাহার আরেকটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ফুটবলের আরেক কিংবদন্তি পেলে। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের মধ্যেও পেলের সান্তোস দলের ম্যাচকে কেন্দ্র করিয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘটিয়াছিল। একজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতি যদি যুদ্ধরত মানুষকে পর্যন্ত সাময়িকভাবে অস্ত্র নামাইতে বাধ্য করিয়া তুলে, তাহা হইলে ক্রীড়া যে মানবিকতারও এক শক্তিশালী ভাষা, তাহাই প্রমাণ হইয়া যায়।
এইখানেই বড় প্রশ্নটি আসিয়া যায়—যাহারা মাঠের ভিতর-বাহিরে মানুষকে ঐক্যের বার্তা দেন, আমরা তাহাদের সেই বার্তা কতটা শুনি? মেসি বলিয়াছেন, কঠিন সময়েই বুঝা যায় একটি দল কতটা শক্তিশালী; বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল। ফুটবল দলের ক্ষেত্রে কথাটি যেমন সত্য, একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাহা আরো অধিক সত্য। রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে মতের অমিল থাকিবে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকিবে, সামাজিক বিতর্ক থাকিবে—ইহাই স্বাভাবিক; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের জায়গায় যদি বিভাজনই মুখ্য হইয়া উঠে, তাহা হইলে অগ্রগতির পথ কখনো মসৃণ হইবে কি? পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ যেই যুদ্ধ, সংঘাত ও অস্থিরতা চলিতেছে, তাহা বন্ধে এই মুহূর্তে ঐক্য ও সংলাপের প্রয়োজনতাকে আমরা কীভাবে অস্বীকার করিব? মেসি আরো বলিয়াছেন, সবচাইতে কঠিন সময়েও তিনি লড়াই করা, নিজের সর্বস্ব দেওয়া এবং দলের পাশে থাকা বন্ধ করেন নাই। জীবনের বাস্তবতাও কি ইহাই নহে? চলার পথে ব্যক্তিগত বা জাতীয় জীবনে সংকট আসিবে। তবে সুসময় যেমন চিরস্থায়ী নহে, দুঃসময়ও নহে। এই জন্য খারাপ সময়ে হাল ছাড়িয়া দেওয়া নহে, বরং অধিক প্রয়োজন দায়িত্বকে আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়াইয়া ধরা। একজন ব্যক্তি যেমন ভুল করিয়া আবার ঘুরিয়া দাঁড়াইতে পারেন, তেমনিভাবে একটি জাতিও সংকট অতিক্রম করিয়া সামনে আগাইয়া যাইতে পারে। প্রয়োজন কেবল ইচ্ছা, বিবেক ও দায়বদ্ধতা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
ফুটবল হইতে মেসি বিদায় লইয়াছেন; কিন্তু তাহার গল্প শেষ হইয়া যায় নাই। গোল, ট্রফি, রেকর্ড মেসিকে কিংবদন্তি করিয়াছে; কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসা, কঠিন সময়ে লড়াই করিবার মানসিকতা এবং মানুষের পাশে থাকিবার শিক্ষা তাহাকে আরো দীর্ঘকাল স্মরণীয় রাখিবে। মেসির বিদায় তাই আমাদের জন্য এই বার্তা—একতা আামদের শক্তি দেয়, দায়িত্ব বড় করিয়া তুলে, আর নিজের দেশ ও মানুষের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করিলে একজন মানুষ সময়ের সীমানা অতিক্রম করিয়া অমর হইয়া থাকেন।
