নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদনদী কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যই নহে, ইহা দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ এবং জীবন-জীবিকারও অন্যতম প্রধান অবলম্বন। তবে পরিতাপের বিষয়, সেই নদীপথই আজ আতঙ্কের বড় কারণ হইয়া উঠিয়াছে। সন্ধ্যা নামিলেই যাত্রী, জেলে ও নৌশ্রমিকদের নিরাপত্তা লইয়া উদ্বেগ বাড়িয়া যাইতেছে। কোথাও ডাকাতি, কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও আবার ঘটিতেছে অপহরণ কিংবা হত্যাকাণ্ড। শুধু তাহাই নহে, পণ্যবাহী নৌযান হইতে মালামাল লুটের ঘটনাও ঘটিতেছে হররোজ। এমনকি অপরাধ দমনে গিয়া নৌ-পুলিশের সদস্যরা হামলার শিকার পর্যন্ত হইতেছেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিতে নৌ-পুলিশের পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। ২০২৪ সালে নদীপথে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও অন্যান্য অপরাধে ২ হাজার ৮৫টি মামলা হইয়াছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বাড়িয়া দাঁড়াইয়াছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারে। অর্থাৎ এক বৎসরেই মামলা বাড়িয়াছে প্রায় দেড় হাজার। চলতি বৎসরের জানুয়ারি হইতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যুর ঘটনায় আরও ৫০৫টি মামলা হইয়াছে। মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম অনুষঙ্গ নদীপথগুলি যদি এইভাবে অনিরাপদ হইয়া উঠে, তাহা হইলে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটিবে কীভাবে?
নদীপথে অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ নিঃসন্দেহে ‘নজরদারির সীমাবদ্ধতা’। নৌ-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য থাকে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার, শুষ্ক মৌসুমে যাহা কমিয়া দাঁড়ায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটারে। এই বিস্তীর্ণ জলপথে পর্যাপ্ত জনবল, নৌযান ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়া সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বভাবতই কঠিন। যদিও এই সীমাবদ্ধতাকে অপরাধীদের সুযোগ হিসাবে ব্যবহৃত হইতে দেওয়া যায় না। আর তাই প্রয়োজন অনুযায়ী নৌ-পুলিশকে শক্তিশালী করিবার বিকল্প নাই। দেশব্যাপী ‘কার্যকর এবং সক্রিয়’ নৌ-থানা ও ফাঁড়ি নিশ্চিত করিবার পাশাপাশি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াইতে হইবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা এই ক্ষেত্রে অনুকরণীয় হইতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড সমুদ্রের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জলপথেও মাদক ও অবৈধ পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে কাজ করিয়া থাকে। সেইখানে ‘আমেরিকাস ওয়াটারওয়ে ওয়াচ’ কর্মসূচির মাধ্যমে জলপথের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাইতে উৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ নিরাপত্তার দায়িত্ব কেবল পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখিয়া জনসচেতনতাকেও কাজে লাগানো হয়। জেলে, নৌযানের চালক, শ্রমিক, ঘাটের ব্যবসায়ী ও নদীতীরবর্তী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলিকে যুক্ত করিয়া আমরাও কার্যকর তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে পারি। বিশেষ করিয়া, নদীতীরবর্তী শিল্পকারখানা, নৌবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সেইগুলির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। অপরাধপ্রবণ ও নির্জন এলাকাগুলি চিহ্নিত করিয়া ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী নজরদারি বাড়াইতে হইবে। ইহার পাশাপাশি নদীপথে চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্তে দিতে হইবে বিশেষ গুরুত্ব।
এইখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে দৃষ্টিপাতযোগ্য। অভিযোগ রহিয়াছে, ভুক্তভোগীরা প্রায়শই ভয়ে মামলা বা সাক্ষ্য দিতে চাহে না। এমনটা কেন হইবে? মামলা বা সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অপরাধীরা ‘পার পাইয়া’ গেলে তাহাদের দ্বারা কি নূতন অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্র বা সুযোগ তৈরি হইবে না? সুতরাং, ভুক্তভোগীদের যেমন সর্বাগ্রে নৌ-পুলিশের শরণাপন্ন হইতে হইবে, তেমনিভাবে অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গোপনে তথ্য দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অবৈধ বালু উত্তোলন, মাদক পরিবহন ও চোরাই পণ্যের কারবার দমনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি সমন্বিতভাবে অভিযান চালাইতে পারিতেছে কি না, তাহাও দৃষ্টিপাতযোগ্য। সর্বোপরি, নদীপথের নিরাপত্তা ফিরাইতে জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ, অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং নদীতীরবর্তী জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিতে হইবে। মোদ্দা কথা, নদীকে কোনোভাবেই অপরাধীদের অভয়ারণ্য হইতে দেওয়া চলিবে না। সকলকে মনে রাখিতে হইবে, নদনদী, খালবিল দেশের সম্পদ এবং সেই সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব, তেমনিভাবে সেই দায়িত্ব পালনে সমাজের সহযোগিতাও অপরিহার্য। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল নদীপথে চলাচল নিষ্কণ্টক হইতে পারে।