রাজধানী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা এবং জনজীবনকে সুশৃঙ্খল ও গতিশীল করিবার প্রয়াসে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ গৃহীত হইয়াছে। ইহারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থাকে জনবান্ধব করিবার লক্ষ্যে সাতটি কোম্পানির অধীনে ৮৬১টি বাস পরিচালনার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। দীর্ঘদিন ধরিয়া ঢাকা শহরের গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং বিশৃঙ্খলা চলিয়া আসিতেছে, এই নতুন উদ্যোগে তাহার অবসান ঘটিবে বলিয়া আশা করা যায়। মূলত রাজধানীর যানজট কমাইতে 'বাস রুট রেশনালাইজেশন' কার্যক্রমের আওতায় নতুন সাতটি রুটে এই কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হইয়াছে ১ নভেম্বর রবিবার হইতে। এই দিন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে সাতটি রুটে চলিবে ৮৬১টি বাস। কিছু রুটে চলিবে এসি বাসও। রুটগুলি হইল : গাজীপুরের শিববাড়ী হইতে আজিমপুর (ভিআইপি সিটি পরিবহন), টঙ্গী হইতে আজিমপুর (ঢাকা সিটি পরিবহন), মিরপুর চিড়িয়াখানা হইতে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া (চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহন), ঘাটারচর হইতে ডেমরা, ঘাটারচর হইতে কাঁচপুর, ঘাটারচর হইতে ধউর এবং নির্ধারিত সার্কুলার রুটেও চলিবে নির্দিষ্ট কোম্পানিভিত্তিক বাস।
উল্লেখ্য, নূতন ব্যবস্থায় বাসগুলিকে নির্ধারিত রুট ও স্টপেজ মানিয়া চলিতে হইবে। প্রতিটি বাসে সংযুক্ত রাখিতে হইবে স্টপেজের তালিকা। ইহাতে চালক ও কর্মীদের পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা এবং যাত্রীদের সহিত সৌজন্যমূলক আচরণ করা বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া অন্য কোথাও যাত্রী উঠানো-নামানো নিষিদ্ধ। এমনকি অতিরিক্ত যাত্রী সংগ্রহের জন্য স্টপেজে নির্ধারিত সময়ের অধিক অপেক্ষা করা যাইবে না। রাস্তায় অন্য যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং করাও যাইবে না। যাত্রীদের সুবিধার্থে রুটভেদে বাসের রং আলাদা রাখিবার পরিকল্পনা রহিয়াছে, যাহাতে সহজে নির্ধারিত রুটের বাস শনাক্ত করা যায়। ডিটিসিএ জানাইয়াছে, রাজধানীর সামগ্রিক বাস নেটওয়ার্ককে ধাপে ধাপে একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় আনা হইবে। ইহারই অংশ হিসাবে খুব শিগিরই এই সকল বাসে চালু করা হইবে নির্ধারিত বাসস্টপ, ইলেকট্রনিক টিকিটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং-ব্যবস্থা।
উপরিউক্ত উদ্যোগকে আমরা স্বাগত ও সাধুবাদ জানাই। তবে এই প্রসঙ্গে না বলিলেই নহে যে, ইহারও পূর্বে বহু বার আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাহা সফল হয় নাই। অনেক ভালো উদ্যোগ কিছুদিন পরই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে। এখন নূতন করিয়া যেই সকল উদ্যোগ গ্রহণ করা হইতেছে, তাহার ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে এবং তাহা যেন শেষ পর্যন্ত টিকসই হয়, সেই প্রত্যাশাই আমরা করি। আমরা মনে করি, বাস মালিকানায় বিশৃঙ্খলা ও যত্রতত্র যাত্রী উঠানামার প্রবণতা রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে দীর্ঘকাল ধরিয়া পঙ্গু করিয়া রাখিয়াছে। যত্রতত্র বাস থামানো এবং লিজ প্রথার নামে চালকদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করিবার ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে। ইহাতে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাইতে হয়। নতুন এই নিয়মের ফলে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব দূর হইয়া নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে নির্দিষ্ট রুটে বাস চলাচল নিশ্চিত হইলে এইরূপ দুর্দশা হইতে আমরা পরিত্রাণ লাভ করিতে পারি। ইহার পাশাপাশি নূতন নিয়মের কারণে চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাহাদের জীবনমান উন্নত করিবার পথ সুগম হইবে। তবে কেবল নীতিমালা প্রণয়ন করিলেই চলিবে না, তাহার সঠিক বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি। মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকিয়া নগরবাসীর যাতায়াত নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করিতে আন্তরিকভাবে কাজ করিয়া যাইতে হইবে। বিশেষ করিয়া গণপরিবহন ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করিতে হইবে। ড্রাইভার-হেলপারদের উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও মোটিভিশনের মাধ্যমে তাহাদের আরো দক্ষ ও যাত্রীবান্ধব করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। আমাদের গণপরিবহন-ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল ও উন্নত হইলে যুবসমাজের যেমন ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হইবে, তেমনি ইহার মাধ্যমে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের কাজও ত্বরান্বিত হইবে।