ভেটেরিনারি খাতে বিশেষ বিসিএস সময়ের দাবি

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৮

দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন, নিরাপদপ্রাণিজ আমিষের জোগান দেএবং পানিবাহিত রোগের ঝাঁকি মোকাবিলায় ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মাঠপর্যায়ে প্রাণিস্বাস্থ্যসেবা ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো কতটা পর্যাপ্ত, সেই প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মাননীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী প্রতি উপজেলায় চার জন করে ভেটেরিনারি সার্জন এবং প্রতিটি ইউনিয়নে এক জন করে ভেটেরিনারিয়ান নিয়োগের প্রক্রিয়া চলার কথা জানিয়েছেন।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাণিস্বাস্থ্যসেবা ও উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে। তবে ঘোষণাকে কার্যকর সেবায় রূপ দিতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, অনুমোদিত পদ সৃষ্টি, বাজেট বরাদ্দ এবং সময়বদ্ধ নিয়োগ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের জনবল চাহিদা পূরণে বিশেষ বিসিএসের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ খাত এখন শুধু গবাদি প্রাণী পালন বা দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের পুষ্টিনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও এ খাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গবাদি প্রাণী, বন্যপ্রাণী ও পাখির সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, খামারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং জলাতঙ্ক, ব্রুসেলোসিস, অ্যানথ্রাক্স, সালমোনেলোসিস, অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিপাহ ভাইরাসের মতো প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে এমন রোগ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ভেটেরিনারি জনবল অপরিহার্য। প্রাণী, মানুষ ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নেওয়া ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার বাস্তব প্রয়োগেও মাঠপর্যায়ে ভেটেরিনারি সেবার বিকল্প নেই।

প্রাণিসম্পদ খাতে বিশেষ বিসিএসের ঐতিহাসিক নজির রয়েছে বইকি। ১৯তম বিশেষ বিসিএস (লাইভস্টক), ১৯৯৮ সালের বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে প্রাণিসম্পদ খাতের বিভিন্ন পদে মোট ৫৮৭টি শূন্যপদের উল্লেখ ছিল। এর মধ্যে ভেটেরিনারি সার্জন, থানা লাইভস্টক অফিসার ও প্রভাষক পদে ৫১৯টি এবং পিডিও, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রভাষক পদে ৬৮টি পদ ছিল। ঐ বিসিএসের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ৫৫৫ জন (ভেটেরিনারি থেকে ৪৭৫ জন এবং অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি থেকে ৮০ জন) নিয়োগ পান বলে জানা যায়।

ভেটেরিনারি খাতে বিশেষ বিসিএসের দাবি কোনো একক পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের দাবি নয়; এটি প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা, নিরাপদ খাদ্য, গ্রামীণ জীবিকা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত জাতীয় প্রয়োজন। দেশে ভেটেরিনারি শিক্ষার বিস্তার ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা প্রয়োজন

১৯তম বিশেষ বিসিএস অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় দেশের ভেটেরিনারি শিক্ষার পরিসর ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক সীমিত। তখন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬১ সাল থেকে ভেটেরিনারি শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল এবং ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভেটেরিনারি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল; তবে এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে তখনো স্নাতক বের হননি। পরবর্তী সময়ে দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি ও প্রাণিসম্পদবিষয়ক অনুষদ ও বিভাগ, বেড়েছে আসনসংখ্যা।
 
বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের ৩০ জুলাই ২০২৫ তারিখের তালিকায় ১৫টি ভেটেরিনারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম), বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি এবং বিএসসি ইন এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রিতে মোট ১ হাজার ২৯৮টি আসনের হিসাব পাওয়া যায়। এর মধ্যে ডিভিএমে ৫১৫টি, ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি সমন্বিত ডিগ্রিতে ৭৩৩টি এবং অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রিতে মাত্র ৫০টি আসন রয়েছে। তবে ভর্তি আসন আর প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা স্নাতকের সংখ্যা এক নয়। এ কারণে প্রকৃত জনবলের চাহিদা নির্ধারণে সরকারি পদের সংখ্যা, শূন্যপদ, অবসরজনিত ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ে প্রাণিস্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন একসঙ্গে মূল্যায়ন করা দরকার।

ডিগ্রির ধরন ও পেশাগত যোগ্যতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি একটি সমন্বিত ডিগ্রি, যেখানে ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি এই দুই ধারার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত। এ ডিগ্রিধারীরা প্রযোজ্য নিয়োগবিধি ও নির্ধারিত যোগ্যতা অনুযায়ী ভেটেরিনারি এবং অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগের সুযোগ পেতে পারেন। তাই জনবল পরিকল্পনা ও নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ডিগ্রির নাম নয়, পাঠ্যক্রম, পেশাগত স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট পদের নিয়োগবিধিও বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ (ডিএলএস) প্রাণিসম্পদ বিষয়ক সরকারি সব ক্ষেত্রের নিয়োগবিধিতে এই সমন্বিত ডিগ্রিকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

মানবস্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকের ঘাটতি মোকাবিলায় বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগের নজির রয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতেও আবেগ বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং তথ্যের ভিত্তিতে জনবল চাহিদা নিরূপণ করা জরুরি। দেশের কতটি উপজেলায় কতজন ভেটেরিনারি সার্জন কর্মরত, কতটি পদ শূন্য, কোথায় অনুমোদিত পদই নেই এবং আগামী কয়েক বছরে কত জন অবসরে যাবেন, এসব তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন পদ সৃষ্টি, শূন্যপদ পূরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

তবে বিশেষ বিসিএস আয়োজনই শেষ কথা নয়। মাঠপর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ভেটেরিনারিয়ানদের কাজের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ, রোগনির্ণয়ের সরঞ্জাম, পরীক্ষাগারের সুবিধা, যানবাহন, জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী ও কৃত্রিম প্রজননের সুবিধা থাকা জরুরি। পাশাপাশি রোগ নজরদারি, টিকাদান, খামার পরিদর্শন ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। নিয়োগের পাশাপাশি পদায়ন, কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে প্রত্যাশিত সেবার মান অর্জন কঠিন হবে।

কর্মসংস্থানের বিষয়টিও কেবল সরকারি চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। পোলট্রি, পেট ও ডেইরি শিল্প, প্রাণী খাদ্য উৎপাদন, ওষুধ ও ভ্যাকসিন খাত, রোগনির্ণয় পরীক্ষাগার, খাদ্যনিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণা, রোগ নজরদারি এবং বেসরকারি ভেটেরিনারি সেবায় দক্ষ জনবলের ভূমিকা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সহায়তা বাড়ানো গেলে সরকারি নিয়োগের ওপর একক নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাতও পাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী। তবে বেসরকারি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ানোর উদ্যোগ সরকারি সেবায় প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের বিকল্প নয়; দুটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রতি উপজেলায় চার জন ভেটেরিনারি সার্জন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে একজন ভেটেরিনারিয়ান নিয়োগের ঘোষণাকে বাস্তবায়নে এখন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে নিয়োগের ধাপ, পদ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা, অর্থায়ন এবং সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা ও প্রকাশের ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যাতে ঘোষণাটি কেবল নীতিগত আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব সেবায় রূপ নেয়। ভবিষ্যতে জনবলসংকটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিশেষ নিয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত নিয়োগব্যবস্থাও সচল রাখতে হবে।

ভেটেরিনারি খাতে বিশেষ বিসিএসের দাবি কোনো একক পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের দাবি নয়; এটি প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা, নিরাপদ খাদ্য, গ্রামীণ জীবিকা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত জাতীয় প্রয়োজন। দেশে ভেটেরিনারি শিক্ষার বিস্তার ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা প্রয়োজন।

এজন্য সরকারকে প্রথমে উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক জনবলের চাহিদা, অনুমোদিত পদ, শূন্যপদ এবং অবসরজনিত সম্ভাব্য ঘাটতির সমন্বিত হিসাব তৈরি করতে হবে। সেই হিসাবের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি, বিশেষ বিসিএসসহ সময়বদ্ধ নিয়োগ পরিকল্পনা এবং নিয়মিত নিয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্ত ভেটেরিনারিয়ানদের কার্যকর সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ওষুধ ও রোগনির্ণয়ের সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতের নিয়োগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ধারাবাহিক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখকদ্বয়: যথাক্রমে সভাপতি, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিল, ঢাকা এবং ভেটেরিনারিয়ান ও তরুণ কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এসএএস