‘বাংলাদেশে কিছু করার সামর্থ্য নেই উগ্রবাদীদের’

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ২১:১৬

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, শ্রীলঙ্কায়  ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে ঝিমিয়ে পড়া উগ্রবাদীদের সজাগ করার আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে এরা কিচ্ছু করতে পারবে না। তারা (উগ্রবাদীরা) মনে করতে পারে, কিছু করবো। কিন্তু বাংলাদেশে সুসংগঠিতভাবে কোনো ধরনের ঘটনা ঘটানোর সক্ষমতা তাদের নেই। 

মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ‘মিট উইথ মনিরুল ইসলাম’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্রাব)। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্র্যাবের সভাপতি আবুল খায়ের, সাধারণ সম্পাদক দীপু সারওয়ার, ডিএমপি ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান, ডিসি আব্দুল মান্নান (সিটিটিসি) ক্র্যাব নেতৃবৃন্দ ও সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 

অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, হলি আর্টিজান হামলার পর বিভিন্ন দেশ ভেবেছে আমরা ঠেকাতে পারবো না। কিন্তু সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে, কিন্তু নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদ যেহেতু একটা মতবাদ, তাই কেউ না কেউ এই মতাদর্শের থেকেই যায়। যারা এই মতবাদের, তাদের অনেককেই ইতোমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে বা অনেকে নজরদারিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, এক দেশের ঘটনায় অন্য দেশের সন্ত্রাসী সজাগ হতে পারে। কিন্তু আমরাও সতর্ক। হলি আর্টিজান হামলার পর ইন্দোনেশিয়ার একটি গোষ্ঠী উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের মধ্যে প্রচারণা চালিয়েছিল। সর্বশেষ নিউজিল্যান্ডে হামলার পর কিছু গোষ্ঠী তাদের নিজেদের চ্যানেলগুলোতে খ্রিস্টান বা ইহুদিবিরোধী প্রচারণায় তৎপর হতে দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কার হামলার ঘটনাও বিশ্বে বিভিন্ন দেশে উগ্রবাদীদের সজাগ করতে পারে। দেশে কারও কারও মনে আসতে পারে, আমরা কিছু করবো। কিন্তু কারও পক্ষে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাংগঠনিক সক্ষমতা নেই। যারা আছে, তারা বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতেও যেনো কোনো গোষ্ঠী প্রস্তুতি নিয়ে কোনো ধরনের নাশকতা চালাতে না পারে এমন তৎপরতার কথাও জানান তিনি।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিটিটিসি প্রধান বলেন, শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গৃহযুদ্ধ ছিল। এলটিটি নামে একটি সুইসাইডাল বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ তৎপর ছিল সেখানে। গতবছর সর্বশেষ শ্রীলঙ্কায় যে দাঙ্গাটি হয়েছিল, সেটি বৌদ্ধ এবং মুসলমানদের মধ্যে। এছাড়া এলটিটি কখনও কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে টার্গেট করে হামলা চালায়নি। তাদের টার্গেট গভর্নমেন্ট মেকানিজমে যারা রয়েছে, তারা। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় গির্জা এবং হোটেলে যে হামলাটি হয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে সন্ত্রাসবাদ।

নিউজিল্যান্ড হামলার পর বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার উগ্রবাদী সংগঠনগুলো খ্রিস্টানদের ওপর ক্ষিপ্ত হতে দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে, আর এটার ইমপ্যাক্ট বাড়ানোর জন্য হোটেলগুলোতে হামলা করা হয়েছে।

আরো পড়ুন: আবারও পানি বিশুদ্ধের দাবি, শরবত খাননি ওয়াসার এমডি

মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, হামলায় সাধারণত কোনো গোষ্ঠীর নেতা পর্যায়ের লোক অংশ নেন না। কিন্তু এখানে তাওহিদ জামায়াতের নেতৃত্ব পর্যায়ের একজন সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তিনি নিহত হয়েছেন। গত ১১ এপ্রিল সরাসরি তাওহিদ জামায়াতের নাম উল্লেখ করে গির্জা এবং ভারতীয় মিশনে হামলা চালাতে পারে বলে একটি গোয়েন্দা রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। যারা হামলা চালিয়েছে, তারা সবাই সে দেশের নাগরিক বলে জানা গেছে। তবে হামলার যে ধরন এবং টার্গেট পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, সেখানে বাইরের কোনো গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে। মালদ্বীপ থেকে একটা বড় সংখ্যার লোক আইএসে যোগ দিয়েছে। মালদ্বীপের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার নৌপথে যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া তাওহিদ জামায়াতের একটা অংশও আইএসের বায়াত নিয়েছিল। তবে হামলাকারীদের মধ্যে তাদের কেউ ছিল কি-না এখন বলা মুশকিল বলেও মন্তব্য করেন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম।
 
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে দেরি হলে তারা সামাজিক নানা অপরাধসহ উগ্রবাদে জড়াতে পারে বলে মনে করেন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তবে, রোহিঙ্গাদের অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে গোয়েন্দা সদস্যরা কড়া নজরদারি করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি আইএস’র একটি ভিডিওতে বাংলাদেশে খলিফা নিয়োগের কথা বলা হয়েছে সাংবাদিকতের এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, এটা আইএস এর নিজস্ব দাবি। বাংলাদেশে তাদের কোনো খলিফা নাই। হয়তো প্রবাসী বাংলাদেশিদের কেউ তাদের সাথে থাকতে পারে, তাকেই খলিফা বলে দাবি করছে তারা।

আরো পড়ুন: সৌম্যের রেকর্ড গড়া ইনিংসে আবাহনীর ২০তম শিরোপা

অনেকেই জঙ্গি সংগঠন আইএস থেকে স্ব স্ব দেশে ফিরতে চাইছেন। বাংলাদেশিরা ফিরতে চাইলে তাদের ফেরত নেওয়া হবে কি না অথবা তারা দেশে ঢুকে পড়লে দেশের জন্য অস্বস্তিকর হবে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে মূলত ২০১৪ সালের শেষ দিকে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি আইএস’এ যোগদান করেছে। আমাদের ধারণা মতে তাদের কেউ ধরা পড়েছে, কেউ নিহত হয়েছে অথবা কেউ এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। তারা যদি এখন দেশে ফিরতে চায় তাহলে তাদেরকে অবশ্যই এয়ারক্রাফট দিয়ে দেশে ফিরতে হবে। এর জন্য তাদের পাসপোর্ট লাগবে। দেশে ফিরতে হলে তাদেরকে নতুন করে পাসপোর্ট আবেদন করতে হবে। আমরা পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে যখন পাসপোর্ট আবেদন পাচ্ছি সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে তাদেরকে পাসপোর্ট দিচ্ছি। তারা ফিরতে চাইলে রাষ্ট্রর সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদেরকে নেওয়া হতে পারে আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে।

কারাগারে জঙ্গিবাদ ছড়ানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিটিটিসি প্রধান বলেন, এটি একটি গ্লোবাল সমস্যা। যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশে কারাগারে জঙ্গিরা রেডিক্যালাইজড হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা। তবে, এই দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে ২টি সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। তাদের মামলাগুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়াও কারাগারগুলোতে সব ধরনের সন্ত্রাস বিরোধী আসামিদের মেলামেশার সম্ভাবনা খুব কম। 

ইত্তেফাক/এমআই