ঢাকা বুধবার, ২২ জানুয়ারি ২০২০, ৯ মাঘ ১৪২৭
২৪ °সে

আতঙ্কের নাম ভুয়া ওয়ারেন্ট

ওয়ারেন্ট দ্রুত যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় চক্র সক্রিয় নিরপরাধ ব্যক্তি কারাবন্দি পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত শুরু
আতঙ্কের নাম ভুয়া ওয়ারেন্ট
ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে ভয়ঙ্কর ফাঁদ পেতেছে শক্তিশালী একটি প্রতারক চক্র। আর এ ফাঁদে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফাঁদে আটকে পড়া অনেককেই পুলিশি গ্রেফতারির শিকার হতে হচ্ছে। অনেককে কারাগারে বন্দীজীবন কাটাতে হচ্ছে।

জানা গেছে, একটি চক্র প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে এ ধরনের ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন পুলিশ অথবা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে। এরপর ঐ গ্রেফতারি পরোয়ানা যাচাই-বাছাই না করেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট থানায়। থানার কাছে ঐ গ্রেফতারি পরোয়ানা পৌঁছার পর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ি পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করতে যায়। ঐ আসামি মামলা দায়ের ও গ্রেফতারি পরোয়ানার ব্যাপারে আগাম কোন তথ্য জানেন না। এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। কারাবন্দী হওয়ার পর ওই ব্যক্তির নামে বিভিন্ন থানা ও আদালতে দায়ের হয় একাধিক মামলা। পূর্বে ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতার হলেও পরবর্তীতে দায়ের করা মামলায় ওই ব্যক্তিকে মাসের পর মাস আবার বছরের পর বছর কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে বন্দী জীবন কাটাতে হয়।

পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ শাখার সূত্র অনুযায়ি, চলতি বছর ঢাকাসহ সারাদেশে সহস াধিক ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ও মিথ্যা মামলা শনাক্ত করেছে। এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা গতকাল বলেন, একটি চক্র রয়েছে যারা এ ধরনের ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং মিথ্যা মামলা তৈরি করে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করে। এ ধরনের চক্রের কয়েকজন সদস্য ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর খুব গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীদের বিষয়ে মেট্রোপলিটন ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর প্রধানদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলাটা সমর্থনযোগ্য নয়: জিএম কাদের

মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইবুনাল-১, যশোর। যশোর জেলা জজ অমিত কুমার দে’র এক আদেশনামায় বলা হয়েছে, ‘ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেল সুপারের প্রেরিত এক স্মারক পত্রে হাজতী সোহেলকে (পিতা-আবু তাহের, থানা ও জেলা-ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া) মানব পাচার ৩১/১৬ হাজিরা পরোয়ানা প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়েছে। স্মারকপত্রে উল্লেখিত আসামি সোহেল ট্রাইব্যুনালের মানব পাচার মামলার কোনো আসামি নয়। বর্ণিত স্মারকে উল্লেখিত হাজিরা পরোয়ানা এই ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রেরিত হয়নি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার নয়নপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহেল চৌধুরীর নামে তিনটি মামলা রয়েছে। তিনি ৯ মাস জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন। জেল খাটতে হয়েছে তার এক স্বজনকেও। সোহেল চৌধুরী রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক ও শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট গুণাবলি পদকপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু মামলায় জড়িয়ে পড়ায় তাকে চাকরি হারাতে হয়েছে। আবু জাহের মো. রেজা চৌধুরীর ছেলে সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে কামাল মিয়ার মেয়ে মিথিলার বিয়ে হয় ২০১৬ সালের ১৭ জুন। বিয়ের পর থেকে মিথিলা ও তার বাবার সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয় সোহেলের। একপর্যায়ে মিথিলাকে তালাক দেন তিনি। এরপরই নেমে আসে মামলার ‘খড়গ’। সোহেল পেশাগত কাজে প্রবাসে যাওয়ার প্রায় তিন মাস পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কামাল মিয়া বাদী হয়ে আদালতে নারী নির্যাতনের অভিযোগে একটি মামলা করেন। মামলায় সোহেল, তার মা, মামা ও দুই খালাকে আসামি করা হয়। তিনি দেশে ফেরার পর ওই মামলায় গ্রেপ্তার হন। এর আগে জেল খাটেন তার খালা নিলু বেগম। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন সোহেল। জামিনের আদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কারাগারে আসার আগেই আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশের কাগজপত্র আসে যশোর থেকে। কারা কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হলে সংশি­ষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে জানা যায় ওই আদেশের কপি জাল। এরপর ঢাকার আশুলিয়া থানার একটি মানবপাচার মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আসে কারাগারে। ওই পরোয়ানায় সোহেলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকার কারাগারে পাঠানো হয়।

সোহেল চৌধুরী বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকাকালে বুঝতে পারেন তিনি মামলাবাজ চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। কামাল মিয়া টাকার বিনিময়ে ওই চক্রের কাছে তাকে বিক্রি করে দিয়েছেন। কামাল মিয়াকে এ বিষয়ে সহায়তা করেছেন তাদের এলাকার সাহেদ মিয়া। তখন অনেকে কামাল মিয়ার সঙ্গে তাকে আপস করার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে শ্বশুর কামাল মিয়ার নামে বাড়ি লিখে দেওয়া ও চেক দেওয়ার শর্তে তিনি আপস করেন। এরপর মিথিলার সঙ্গে তার আবার বিয়ে হয়। কিন্তু মিথিলাকে বাড়ি আনার পরপরই আবার বিরোধ দেখা দেয়। একদিন মিথিলা নিজেই দেয়ালে মাথা ঠুকে আহত হয়ে তার বাবাকে খবর দেয়।

রাজধানীর কাফরুল থানার একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা খাটছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার মৌড়াইলের মোল্লাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা কমিন শাহ (৬৭)। গত ১২ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৯-এর রায়ে তার এই সাজা হয়। তিনি এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ। কমিন শাহ ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের কুলি সর্দার। তার নামে ঢাকা, যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে আরো ৯টি মামলা করা হয়েছে। কমিন শাহ’র ছেলে কানাডা প্রবাসী হিরো জুম্মান।

হিরো জুম্মান বলেন, নিজের বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়ে ঝামেলাকে কেন্দ্র করে তার বাবা এখন কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। রাজধানীর কাফরুলে ২০১৩ সালের ১৮ মার্চ আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তি খুন হন। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার তিন নম্বর আসামি ইকবাল। এজাহারে ইকবালের বাবার নাম অজ্ঞাত পরিচয় লেখা হয়েছে। ইকবাল নামের আসামির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে পুলিশ প্রথম প্রতিবেদন দিয়েছিল। কিন্তু পরে ইকবাল ওরফে কমিন শাহ লিখে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরই ভিত্তিতে আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেন।

ইত্তেফাক/এএএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন