কক্সবাজারের শিশু রিপা মণি হত্যা মামলা

চার্জশিটের বৈধতা নিরূপণেই আদালতে ১৮ বছর পার!

চার্জশিটের বৈধতা নিরূপণেই আদালতে ১৮ বছর পার!
চার্জশিটের বৈধতা নিরূপণেই আদালতে ১৮ বছর পার!

তদন্তের বৈধতা নিয়েই ১৮ বছর ধরে চলছে আইনি লড়াই। এই আইনি লড়াইয়ের নিষ্পত্তি না হওয়ায় ২০ বছর ধরে আটকে আছে এক হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম। আর নজিরবিহীন এই ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএম চর বেতুয়া গ্রামে শিশু রিপা মনি হত্যা মামলায়। তদন্ত প্রতিবেদনের বৈধতা নিয়ে বাদী-বিবাদী পক্ষের মধ্যে চলা এই লড়াই কবে শেষ হবে জানে না কেউ। এদিকে সর্বশেষ আইনি লড়াইয়ে হেরেছেন মামলার প্রথম চার্জশিটভুক্ত এক আসামি। উচ্চ আদালতের খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে এখন আপিল বিভাগে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার আইনজীবী।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইন সাময়িকী ঢাকা ল’ রিপোর্ট (ডিএলআর) এর সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান ইত্তেফাককে বলেন, চার্জশিটের বৈধতা নিয়ে যদি দেড় যুগ ধরে আইনি লড়াই চলে তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। এতে বিলম্বিত হচ্ছে গুরুতর অপরাধের এ মামলার বিচার। বিলম্বিত এই বিচারের কারণে এক সময় সাক্ষী পাওয়াটাও দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে দ্রুত নিম্ন আদালতে মামলার বিচার কাজ শুরু করা উচিত। মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএম চর বেতুয়া গ্রামে শিশু রিপা মনি হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ঐদিন নিহতের পিতা আবুল বশর চৌকিদার বাদী হয়ে আব্দুল মান্নানসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন।

এজাহারে বলা হয়, আসামিরা মামলার বাদী ও তার স্ত্রী আয়াতুন্নাহারের ওপর হামলা করে। এ সময় রিপা দৌড়ে এলে তাকে কোদাল দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে আসামিরা। খাস জমির আইল বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধের জেরে আসামিরা এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।

আরও পড়ুন: ব্রিটেনে দ্বিতীয় দফা লকডাউনের সিদ্ধান্ত বরিস জনসনের!

মামলার তদন্ত শেষে ২০০২ সালে এজাহারভুক্ত ছয় জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৩২৪/৩৫৪/৩৭৯/৩০২ ধারায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। এই অভিযোগপত্র আদালতে গ্রহণের পূর্বে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য আদালতে আবেদন জানায়। এ বছরই ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের আদেশ দেয়। পুনঃতদন্ত শেষে ২০০৪ সালে নিহত রিপা মনির মা আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় চার্জশিট দেন সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা তন্ময় রায়। একই সঙ্গে এজাহারভুক্ত ছয় আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন। এই চার্জশিটে বলা হয়, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই রিপাকে তার মা আয়াতুন্নাহার নিজেই হত্যা করে এজাহারভুক্ত আসামিদের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়েছে। ঐ বছরের ২৯ মার্চ আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করে এজাহারভুক্ত আসামিদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত।

মামলার বাদী নিহত রিপা মনির বাবা আবুল বশর এই আদেশের বিরুদ্ধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করলে তা নামঞ্জুর হয়। নিম্ন আদালতের এ আদেশ বাতিল চেয়ে ২০০৪ সালে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি। হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম স্থগিতের পাশাপাশি রুল জারি করে। ঐ রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০১১ সালে উচ্চ আদালত রায় দেয়। ঐ রায়ে আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে নেওয়ার আদেশ বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে প্রথম চার্জশিটে উল্লেখিত ছয় আসামি ও আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে দেওয়া চার্জশিট একত্রে রেখে বিচারকাজ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন বাদী ও আয়াতুন্নাহারের স্বামী আবুল বশর। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক রায়ে আয়াতুন্নাহারকে আসামি করে সিআইডি কর্তৃক দাখিলকৃত সম্পূরক চার্জশিট অবৈধ ঘোষণা করে। এছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন মনে করলে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন মর্মে পর্যবেক্ষণ দেয়। এ রায় পুনর্বেচনা চেয়ে আসামি আব্দুল মান্নান রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন। ২০১৬ সালে আপিল বিভাগ রিভিউ পিটিশন খারিজ করে দেয়। এর পরই আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে কক্সবাজার আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি অধিকতর তদন্ত করে ২০১৭ সালের ১৪ মার্চের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) চকরিয়াকে নির্দেশ দেন। এই অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পূর্বেই মামলার বাদীর এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তার দেওয়া চার্জশিট আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা করেন আব্দুল মান্নান। গত বছরের ২৩ অক্টোবর ঐ রিভিশন আবেদন খারিজ করে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ খোন্দকার হাসান মো. ফিরোজ তার আদেশে বলেছেন, সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) চকরিয়াকে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেওয়া হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও কোনো অধিকতর তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেননি। যেহেতু এটি একটা হত্যা মামলা, সেই বিবেচনায় প্রথম চার্জশিট আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি যথাযথ হয়েছে। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন মামলা করেন আব্দুল মান্নান। গত ৪ অক্টোবর বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ভার্চুয়াল ডিভিশন বেঞ্চ ঐ আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেয়।

আব্দুল মান্নানের আইনজীবী সৈয়দ মিসবাহুল আনোয়ার ইত্তেফাককে বলেন, আপিল বিভাগের আদেশ ছিল অধিকতর তদন্তের। সেই অধিকতর তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলাম। আদালত আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। হাইকোর্টের আদেশের অনুলিপি পেলেই আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করব। হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশিরউল্লাহ বলেন, হাইকোর্ট বলেছে, আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্ন আদালতে এ হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ পর্যায়ে আসামির আবেদন গ্রহণের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এই আদেশের বিরুদ্ধে আসামি পক্ষ আপিল বিভাগে গেলে তা হবে বিচারকে বিলম্বিত করার অপপ্রয়াস মাত্র।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত