ধর্ষণের বিচারে নতুন আইন চায় কমিশন

নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা বাতিলের প্রস্তাব
ধর্ষণের বিচারে নতুন আইন চায় কমিশন
প্রতীকী ছবি

নারী ও শিশুকে ধর্ষণসহ যে কোনো ধরনের যৌন নির্যাতন দমনে নতুন আইন চায় আইন কমিশন। এ লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে এসংক্রান্ত আইনের খসড়াও প্রণয়ন করেছে তারা।

ঐ খসড়ায় ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনে অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ডের পাশাপাশি যে কোনো মেয়াদের দণ্ড প্রদানের ক্ষমতা বিচারককে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কোনো অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে কী কারনে ঐ দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যা রায়ে বিচারককে উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া বিচারকালে ধর্ষণের শিকার নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না আসামিপক্ষ। এ উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে খসড়ায়। একই সঙ্গে গৃহকর্মীর ওপর বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টিও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ও শাস্তির বিধান রেখে নারী নির্যাতন দমন আইনের পূর্ণাঙ্গ নতুন খসড়া প্রণয়ন করেছে আইন কমিশন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এই খসড়া পাঠানো হয়েছে।

কমিশন বলছে, বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী দায়েরকৃত মামলাগুলোর মধ্যে একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির খালাস হওয়া, গুরুদণ্ড প্রদানের হার নিম্নমুখী হওয়া, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মামলা প্রমাণিত না হওয়ায় খারিজ হয়ে যাওয়া এবং বছরের পর বছর নারী নির্যাতনের সার্বিক চিত্র একই রূপ থেকে যাওয়া। আইনটির অপপ্রয়োগের হারও আশঙ্কাজনক। এই প্রেক্ষাপটে বিচারকগণও দোষী সাব্যস্ত করতে এবং গুরুদণ্ড আরোপে সাবধানতা অবলম্বন করতে অনেকটাই বাধ্য হন। এই বাস্তবতার সংকট নিরসনে আইনটির সার্বিক সংস্কার প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: আদালতে নি:শর্ত ক্ষমা চাইলেন কুষ্টিয়ার এসপি

এ কারণে বিদ্যমান আইনের ওপর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের মতামত নেওয়া হয়। পরে বিদ্যমান আইনটি পর্যালোচনা শেষে প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন আইনের খসড়া করে কমিশন।

দেশে ধর্ষণসহ নারী ও শিশুর ওপর যে কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের অপরাধের বিচার হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে। ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত অক্টোবর মাসে সরকার ধর্ষণের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান এনে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে। কিন্তু এর পরও বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রহিতের প্রস্তাব রেখে নতুন একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন প্রসঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরো আইনটি গ্রহণ করা না হলেও খসড়ায় যেসব ভালো দিক রয়েছে, সেগুলো বিদ্যমান আইনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সরকার ভেবে দেখতে পারে।

খসড়ায় যা রয়েছে

সাক্ষ্য আইনের তিন ধারা নিয়ে প্রশ্ন : কমিশন বলছে, ধর্ষণের শিকার নারী যখন আইনি প্রতিকার চায়, তাকেই সর্বাধিক ঝামেলা পোহাতে হয়। আদালতে তার বিশ্বাসযোগ্যতার মূল্যায়ন করার জন্য তার অতীত যৌন ইতিহাস বা আচার-আচরণের ওপর ভিত্তি করে প্রায়ই অপরাধের শিকার নারীকে ভালো বা খারাপ ‘চরিত্রের’ ওপর জোর দিয়ে আদালতে জনসমক্ষে নিষ্ঠুরভাবে কাটাছেড়া করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিক। শুনানির সময় সাক্ষ্য আইনের ৫৩, ১৪৬ ও ১৫৫ (৪) ধারা অপব্যবহার করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অপরাধের শিকার নারীকে ‘খারাপ মেয়ে’ প্রমাণের চেষ্টা করেন, যেন ‘খারাপ মেয়ে’কে যে কেউ ধর্ষণ করতে পারে। ধর্ষণের শিকার একজন নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে হলে সাক্ষ্য আইনের ৫৩ ও ১৪৬ ধারা ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন মামলার ক্ষেত্রে প্রয়োগ নিষিদ্ধ এবং ১৫৫(৪) ধারা বাতিল করা বিশেষ প্রয়োজন।

কমিশন বলছে, খসড়া আইনের ৬ ও ৯ ধারায় ধর্ষণ বা অন্যবিধ কারণে অপরাধের শিকার নারীর মৃত্যু হলে অন্যূন ৩০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা তদূর্ধ্ব যে কোনো মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইনের সীমার মধ্য থেকে বিচারক ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে অপরাধীর শাস্তি যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে পারবেন।

সে কারণে খসড়ায় ধর্ষণের কিছু অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে ১০ থেকে ৩০ বছর সাজা ও ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, অন্তঃসত্ত্বা ও সম্মতি প্রদানে অক্ষম, একাধিকবার কোনো নারীকে ধর্ষণ, ধর্ষণের কারণে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক বৈকল্য, ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে শাস্তি হিসেবে ৩০ বছর থেকে তদূর্ধ্ব যে কোনো মেয়াদে কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ খসড়া আইনে রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: দীপন হত্যা মামলার রায় ১০ ফেব্রুয়ারি

কমিশন বলছে, বর্তমান আইনে ১২টি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সাজার বিধান রয়েছে, যার মধ্যে দুটি অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু অপরাধ সংঘটিত করার চেষ্টার জন্য আছে। এমতাবস্থায় এক্ষেত্রে সাজা হিসেবে একমাত্র মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করে অনুরূপ অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি, পরিধি, আসামির বয়স, অভিপ্রায় এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে সাজা হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড, প্রয়োজনে জঘন্যতম ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকতে পারে, কিন্তু একমাত্র সাজা হিসেবে নয়।

দহনকারী বা সমজাতীয় পদার্থ অন্তর্ভুক্তকরণ: প্রস্তাবিত খসড়া আইনে কোনো তীব্র জ্বালাদায়ক দহনকারী তপ্ত তরল পদার্থ বা ধাতব বস্তু কথাগুলো যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান আইনে ‘প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায় করে যৌনসংগম ধর্ষণ বলে গণ্য হলেও একাধিকবার যৌনসংগমের ভিত্তিতে আদালত ধরে নেয় যে এতে নারীর নীরব সম্মতি ছিল। প্রস্তাবিত আইনে প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়ের বিষয়টি সুস্পষ্ট করার প্রয়াস নিয়েছে কমিশন।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন কমিশন এই নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করেন।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x