দেশের বিশেষ এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাহিদা পূরণের জন্য নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে দেশে ৩৫টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মাত্র কয়েকটি এনবিএফআই কার্যকরভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তালিকাভুক্ত এনবিএফআইগুলোর মধ্যে একটি, পিপলস লিজিং, গত কয়েক বছরে তার আর্থিক অবস্থার পতনের কারণে বর্তমানে লিকুইডেশনে (অবসায়ন) রয়েছে। ব্যাংকের তুলনায় এনবিএফআই সেক্টরটি নতুন এবং ছোট, লিকুইডেশনের ঘটনা এ সেক্টরে লিকুইডেশনের প্রথম ঘটনা যা এই সেক্টরকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। আরো অনেক এনবিএফআই ইতিমধ্যে ঝুঁকিতে রয়েছে, যা অদূর ভবিষ্যতে লিকুইডেশন বা অনুরূপ ধরনের ক্রিয়া সাপেক্ষে হতে পারে।
এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬৪ শতাংশ যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ, পুরো খাতে মোট মুনাফা কমেছে ৬১ শতাংশ, ৩৪টির মধ্যে ভালো অবস্থানে আছে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলোর বেহাল দশা ঋণ অনিয়মসহ বিভিন্ন কারণে আর্থিক দুরবস্থায় পড়েছে বেশির ভাগ নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এতই নাজুক যে, তারা গ্রাহকের আমানতের টাকা পর্যন্ত ফেরত দিতে পারছে না। অনিয়মের মাধ্যমে ঋণের নামে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত নাজুক এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ তদারকিতে রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে মন্দ ঋণ এ খাতের পরিস্থিতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, এটি গত এক দশকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। কোভিড মহামারির মধ্যে সরকারি এবং বেসরকারি মিলে ৩৪ এনবিএফআই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি ছাড়া বাকিগুলো দারুণ সংকটের মধ্যে আছে।
দেশের অধিকাংশ ব্যাংক ‘ঋণ অনিয়মের’ যে বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তা থেকে মুক্ত নয়। ঋণ বিতরণে রাজনৈতিকসহ নানা ধরনের প্রভাব, ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, সুশাসনের অভাব ইত্যাদির ভূত ব্যাংকগুলোর ওপর থেকে বর্তমানে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভর করেছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির ঝুঁকি ও তারল্য সংকটে দুরবস্থায় রয়েছে ‘রেড জোনে’ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো। ঋণ বিতরণে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না এসব প্রতিষ্ঠান। অনেকে আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণ করেছে বেশি। ক্যাশ ফ্লো বা পরিচালন নগদ প্রবাহও ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। ফলে আমানতের টাকা সময়মতো গ্রাহককে ফেরত দিতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
তহবিলের বিকল্প উত্স খোঁজা এই শিল্পের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ, বছরের পর বছর তহবিলের উচ্চ ব্যয় বাড়তে থাকে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে পিপলস লিজিং অবসায়নের জন্য অবসায়ক নিয়োগ করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও বিআইএফসিতে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে আদালত। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত না দিতে পেরে চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে রয়েছে। এ ছাড়া ফার্স্ট ফাইন্যান্স এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে মন্দ ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যা এ খাতের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যের অবনতি মনে করা হচ্ছে।
পি কে হালদারের কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জড়িত হওয়া উদ্বেগজনক। দেশের ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল খরচ বেশি। তবে এই সংস্থাগুলো ব্যাংকের মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না এবং লোকেরা দুর্নীতিগ্রস্ত উপায়ে এর সুবিধা নিয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি আরো তদন্ত করে তাহলে আরো বেশি কেলেঙ্কারি ও অনিয়ম বের হয়ে আসবে। এ খাতের বর্তমান অবস্থার জন্য বোর্ড পরিচালকরাও দায়ী। পরিচালকদের দুর্নীতির কারণে এ খাতটি সমস্যায় পড়েছে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ খাতের ওপর নজরদারি আগের চেয়ে আরো জোরদার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবিলিটি রেটিং ২০২০ অনুযায়ী, মাত্র পাঁচটি এনবিএফআই প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থানে রয়েছে। স্ট্রেস টেস্টিং রিপোর্ট বলছে, ১৩টি এনবিএফআই ‘রেড জোনে’ বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেডিট ঝুঁকি, সুদের হার ঝুঁকি, ইক্যুইটি প্রাইস ঝুঁকি এবং তারল্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে এনবিএফআইয়ের সম্পদের মান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত বছরের তুলনায় মোট খেলাপি ঋণ ৬৪ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার ৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ৯টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫ শতাংশের বেশি। আর ১২ প্রতিষ্ঠান ১০ শতাংশের ওপরে এবং ১৫ প্রতিষ্ঠান ৫ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরিচালকদের দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০ সালে পুরো এনবিএফআই খাতের মোট মুনাফা ৬১ শতাংশ কমে ৩৫৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এ খাতে খেলাপি বৃদ্ধি পেয়েছে, লোকসান বেড়েছে, প্রভিশন ঘাটতিও যথেষ্ট বেড়েছে। যা মুনাফা অর্জনকে প্রভাবিত করেছে। তবে বিশৃঙ্খলার মধ্যেও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালো করছে।
এসব কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, মালিকদের স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে তাদের আলাদা করতে সাহায্য করেছে। এদিকে আমানতকারী এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য দুর্নীতিগ্রস্ত পরিচালক অপসারণ করে সম্প্রতি হাইকোর্ট পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং বোর্ড পুনর্গঠন করেছে। শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এফএএস ফাইন্যান্স এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স বোর্ড পুনর্গঠন করেছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ফার্স্ট ফাইন্যান্সের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। এনবিএফআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দেশ ছাড়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়াও বাধ্যতামূলক করেছে।
নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে আরো বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই। দুই বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ পতনের কারণে এ খাতে আস্থা কমিয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। তখন থেকেই আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিয়ে ব্যর্থ হয় বেশ কয়েকটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এরপর বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রভাবে আরো ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এ খাতে। আমানত সংগ্রহে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতায় নেমে তুলনামূলক বেশি হারে মুনাফা প্রদানের ঘোষণা দিয়ে এবং আমানত সংগ্রহে তুলনামূলক বেশি খরচ করে প্রকারান্তরে নিজেদের জন্য আরো বড় বিপদ ডেকে এনেছে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সাধারণত এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের তহবিলের জন্য ব্যাংক এবং সাধারণ গ্রাহকের আমানতের ওপর নির্ভরশীল। তবে ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের অনুপাত কমে যাওয়ায় ব্যাংকসমূহ তাদের বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। ফলে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে সংকট দেখা দেয়। তহবিল সংকটের কারণে তারা নতুন করে ঋণ দিতে ব্যর্থ হয়। অতীতে যারা ঋণ নিয়েছিল এমন বহু ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে পড়ায় সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আমনতে ও ঋণে যথাক্রমে ৬ ও ৯ শতাংশ সুদ নিতে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। সেই নির্দেশনা মেনে ব্যাংকগুলো তা কার্যকর করেছে কিন্তু সে প্রজ্ঞাপনের আওতায় নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাখা হয়নি। ফলে সুদহার যার যার ইচ্ছামতো আরোপ করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। উচ্চসুদের প্রলোভন দেখিয়ে আমানত সংগ্রহে নেমেছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষকে মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে এসব প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় তারা তেমন অবিশ্বাস্য হারে মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত সুদহার বেঁধে দেওয়া হলেও পাশাপাশি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লাগাম ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই বাজারে দুই ধরনের নীতি চলতে পারে না। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একটি যৌক্তিক সুদহার থাকা উচিত। যদিও তাদের ‘কস্ট অব ফান্ড’ বেশি। তবুও তাদের জন্য যৌক্তিক সুদহার থাকা উচিত। বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে পারলে এ খাতটি আমাদের আর্থিক খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে কাজ করতে সক্ষম হতে পারে। যদি এ খাতকে তাদের অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথাযথ সহায়তা প্রদান করা হয়, তা হলে এ খাতটি একটি টেকসই খাতও হতে পারে।
ইত্তেফাক/এএইচপি

