বাংলাদেশের কৃষি বরববরই প্রকৃতিনির্ভর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি নানা অভিঘাত মোকাবিলা করে এগোচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও ঠাণ্ডা হাওয়া অতি সম্প্রতি যোগ হয়েছে উচ্চ তাপপ্রবাহ বা হিট শক, যা গত ৪ এপ্রিল হাওরাঞ্চলে প্রবাহিত হাওয়ায় বোরো ফলনে কিছুটার অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, যার কারণ দীর্ঘদিনের বৃষ্টিহীন প্রকৃতি।
এ হিট শকে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা এবং গোপালগঞ্জ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের ৩৬টি জেলার বেশকিছু অঞ্চলে বোরো ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, সবজি, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী ও কলার ফলন নষ্ট হওয়ায় সব মিলিয়ে টাকার অঙ্কে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে ৩২৮ কোটি টাকার, ভুট্টার ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩.১০ লাখ কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, হিট শকে ৪৮ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান আক্রান্ত হয়েছে। গত বছর বোরো মৌসুমে ধানের ফুল ফোটা পর্যায়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহনীয় পর্যায়ে ছিল, ফলে বোরো ধানের চিটা সমস্যা ততটা প্রকটভাবে দেখা যায়নি। করোনাকালে নতুন এ সংকট সবাইকে খাদ্যনিরাপত্তার ব্যাপারে ভাবিয়ে তুলছে।
এ ব্যাপারে ধান গবেষকদের মতামত হলো, গত বছর বোরো মৌসুমে ধানের ফুল ফোটা পর্যায়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহনীয় পর্যায়ে ছিল, ফলে বোরো ধানের চিটা সমস্যা ততটা প্রকটভাবে দেখা যায়নি। কিন্তু চলতি বোরো মৌসুমে তেমন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তাপমাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছিল বিধায় সংগত কারণে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিহীন কালবৈশাখীর সঙ্গে তীব্র্র দাবদাহ বয়ে যাওয়ার ফলে যে জমির ধান ফুল ফোটার পর্যায়ে ছিল, সেসব এলাকায় ধানের শিষ শুকিয়ে যায়। বৃষ্টিহীন তীব্র দাবদাহে বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। ফলে সেগুলোর পরাগরেণু শুকিয়ে ধান চিটা হয়ে যায়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, হাওর এলাকায় পানি থাকলে এবং সূর্যের তাপ থাকলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে এবং বাতাসের গতি না থাকলে আমরা হয়তো ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ডে থাকে, কিন্তু তাপমাত্রার অনুভব ৪০ ডিগ্রি সেলিসয়াসের বেশিও হতে পারে। বাতাসে যদি জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ৭০ শতাংশের বেশি থাকে এবং বাতাসের গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারের কম থাকে, তখন যে তাপমাত্রা পরিমাপ করি না কেন, এর চেয়ে অনুভব তাপমাত্রা অনেক বেশি হয়, যা হাওর এলাকায় হয়েছে, যা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। এই ক্ষতি থেকে ধানকে রক্ষার একমাত্র উপায় হচ্ছে ধানের জীবনকালের ওপর ভিত্তি করে বপন ও রোপণ সময় এমনভাবে সমন্বয় করা, যাতে ধানের ফুল ফোটার সময় কালবৈশাখীর এমন তীব্র দাবদাহ এড়িয়ে যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট হিটশক থেকে বোরো ধান রক্ষার জন্য চার দফা করণীয় পালনের পরামর্শ দিয়েছে, যেমন :
এক : এ সময় বোরো ধানের যেসব জাত ফুল ফোটার পর্যায়ে আছে বা এখন ফুল ফুটছে বা সামনে ফুল ফুটবে সেসব জমিতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে হবে এবং ধানের শিষে দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত জমিতে অবশ্যই দুই-তিন ইঞ্চি দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে;
দুই. ঝড়ের কারণে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া (বিএলবি) বা ব্যাকটেরিয়াজনিত লালচে রেখা (বিএলএস) রোগের আক্রমণ হতে পারে। আক্রান্ত যেসব জমিতে ধান ফুল আসা পর্যায়ে রয়েছে সেসব জমিতে ৬০ গ্রাম এমওপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ২০ গ্রাম দস্তা সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে বিকেলে স্প্রে করতে হবে। তিন. বোরো ধানের এ পর্যায়ে নেক ব্লাস্ট বা শিষ ব্লাস্ট রোগের ব্যাপক আক্রমণ হতে পারে। শিষ ব্লাস্ট রোগ হওয়ার পরে দমন করার সুযোগ থাকে না। তাই ধানের জমিতে রোগ হোক বা না হোক, থোড় ফেটে শিষ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একবার এবং এর পাঁচ-সাত দিন পর আরেকবার বিঘাপ্রতি (৩৩ শতাংশ) ৫৪ গ্রাম ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি বা দিফা ৭৫ ডব্লিউপি বা জিল ৭৫ ডব্লিউপি অথবা ৩৩ গ্রাম নাটিভো ৭৫ ডব্লিউজি, অথবা ট্রাইসাইক্লাজল বা স্ট্রবিন গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় ৬৭ লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে এবং চার. এ সময় জমিতে বাদামি ঘাসফড়িংয়ের আক্রমণ হতে পারে। আক্রমণপ্রবণ এলাকায় কীটনাশক যেমন মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি, প্লিনাম ৫০ ডব্লিউজি, একাতারা ২৫ ডব্লিউডি, এডমায়ার ২০এসএল, সানমেক্টিন ১.৮ ইসি, এসাটাফ ৭৫ এসপি, প্লাটিনাম ২০ এসপি অথবা অনুমোদিত কীটনাশকের বোতলে বা প্যাকেটে উল্লিখিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
গত বছর বন্যায় আউশ ও আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ বছর বোরোতে তা পুষিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় এ বছর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার হেক্টর বাড়িয়ে নির্ধারণ করে, যার ফলে বাস্তবে ১ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ বৃদ্ধির ফলে এ বছর মোট বোরো আবাদ দাঁড়ায় ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টরে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাইব্রিড আবাদ বাড়ানো হয় প্রায় ২ লাখ হেক্টর। সরকার বলছে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রিডের আবাদ বেড়েছে। গড়ে হেক্টরপ্রতি এক টন করে বেশি ফলন হলেও কমপক্ষে ৩ লাখ টন উত্পাদন বাড়বে।
চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে মোট ১৭ লাখ টন ধান ও চাল কিনবে সরকার। এর মধ্যে মিলারদের কাছ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল, ৩৯ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং কৃষকদের কাছ থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে সাড়ে ৬ লাখ টন ধান কেনা হবে। গত বছর বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান, ৩৬ টাকা কেজি দরে সেদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় গত বোরো ও আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল কিনতে পারেনি সরকার।
কৃষি ক্যালেন্ডার অনুসারে এপ্রিল-মে মাসেই বোরো ধান কাটার সময় এবং বন্যা শিলাবৃষ্টির ঝুঁকিতে কৃষকরা দিন কাটায়; কিন্তু এ বছরটি ব্যতিক্রম বিশেষত অনাবৃষ্টির কারণে বোর ধানসহ সব কৃষি উত্পাদনের ওপর এর প্রভাব লক্ষণীয়। অন্যান্য বছরের মতো এবার কৃষিশ্রমিকের ঘাটতির সম্ভাবনা থাকায় কৃষকদের ধান কেটে দিতে দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার বিষয়ে সরকারপ্রধান আরো বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি এবং আমরা সে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।
ওপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান বছরটি আবহাওয়ার দিক থেকে মোটেই ফসলের জন্য অনুকূল বছর নয়, যদিও সরকার সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য তৈরি রয়েছে, যা গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। এখন করণীয় হলো—১. বোরো ফসল কাটার সময় কৃষিশ্রমিকের ঘাটতি মেটাতে গত বছরের মতো সরকারি খরচে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে শ্রমিক হাওর এলাকায় পাঠাবে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে। ২. ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র গত বারের মতো এবারও সরকার প্রস্তুত রেখেছে এবং আগ্রহী উদ্যোক্তাদের ক্রেডিটসহ প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করছে। ২০২০ সাল থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে অন্যান্য খাতের মতো কৃষি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি খাতে স্বল্পসুদে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষকদের স্বাভাবিক উত্পাদনশীল কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনাসহ কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে ঋণ/বিনিয়োগের সুদ/মুনাফা হার হ্রাস করা প্রয়োজন। সরবরাহ পরিস্থিতি বাড়াতে এরই মধ্যে সরকারিভাবে চাল আমদানি করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে চাল আমদানিতে উত্সাহিত করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি—সব বাধা দূরীভূত হবে এবং মুজিববর্ষে স্বধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে আমরা আমাদের পূর্বের রেকর্ড ধরে রাখতে সক্ষম হব ধান-চাল উৎপাদনে—সেটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক: অধ্যাপক ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
ইত্তেফাক/জেডএইচডি

