তবুও চাপা কান্না

তবুও চাপা কান্না
গরু বিক্রি করতে এসেছেন এক বিক্রেতা। ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কোরবানির একদিন এক রাত আগেই গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর পশুর হাট প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে। ক্রেতাদের তীব্র চাপ থাকলেও হাটগুলোতে গরুর সংখ্যা ছিল খুবই কম। যে কয়েকটি গরু ছিল তা নিয়ে রীতিমতো ক্রেতাদের মাঝে ছিল কাড়াকাড়ি। দাম কোনো ব্যাপার ছিল না গরু পাওয়াটাই ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই অবস্থা শুক্রবার রাতে আরও তীব্র আকার ধারণ করে। রাজধানীর আফতাবনগর, মেরাদিয়া, খিলগাঁও রেলগেট, জুরাইন ও গাবতলীসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা নগরীর অধিকাংশ পশুর হাটে এই চিত্র দেখা গেছে।

বড় এই সিটিগুলো ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি জেলায় গরুর ব্যাপারী ও খামারিরা বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পশু বিক্রি করে তারা ভালো দাম পেয়েছেন।

তবে গরুর দাম ও চাহিদা স্বাভাবিক ছিল সিলেট ও বরিশাল নগরীর হাটগুলোতে। কিন্তু উলটো চিত্র ছিল অনেক জেলার তৃণমূল খামারিদের ক্ষেত্রে। গরু বিক্রি করতে না পেরে অনেক তৃণমূল খামারির মধ্যে চাপা কান্না বিরাজ করছে।

তবে বৃহস্পতিবারের আগের দিন বুধবারও অনেক ব্যাপারী মহামারি করোনার কারণে বিক্রি নাও হতে পারে এই আতঙ্কে কম দামে গরু ছেড়ে দিয়েছেন। এমনই একজন হলেন মো. কালাম হোসেন। তিনি ১২টি গরু নিয়ে এসেছেন গাবতলীর হাটে। জানালেন সব ব্যাপারী ও খামারির চেহারায় গরু বিক্রি না হওয়ার চাপা আতঙ্ক। আমিও ভয় পেয়ে গেলাম। মহামারি করোনার কারণে যদি বিক্রি না হয় তা হলে ফেরত নিতে আবার টাকা লাগবে। এতগুলো গরুকে খাওয়াতেও অনেক খরচ। তাই বেশিরভাগ গরু লসে ছেড়ে দিয়েছি। তবে যারা বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার গরু বিক্রি করেছেন তাদের মুখে ছিল চওড়া হাসি।

আরও পড়ুন: ত্যাগী নেতাদের যথার্থ সম্মান করা নৈতিক দায়িত্ব: এমপি নিক্সন চৌধুরী

কোরবানির আগে বেসরকারি টেলিভিশনসহ প্রায় সকল পত্র পত্রিকার খবরে মোটামুটি একটি চিত্রই ফুটে ওঠে। ক্রেতা নেই। এবার করোনার কারণে গরু অবিক্রিত থাকার আশঙ্কা। এসব কারণে ব্যাপারীরা গ্রাম থেকে গরু সংগ্রহ কম করেছেন। যা করেছেন তাও আবার কম দামে কিনেছেন। কোনো কোনো গ্রামে ব্যাপারীরা যাননি। গরুর দামও জিজ্ঞেস করেনি কেউ। কোনো গ্রামে ব্যাপারীরা গেলেও এতো কম দাম বলেছেন যে ছোট খামারিরা বড় লোকসানের মুখে বিক্রি করেননি। তারা মনে করেছেন হয়ত কোরবানির আগে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের এসব খামারির গরু অবিক্রিত রয়ে গেছে।

এ রকম কয়েকজন ছোট খামারি মাগুরার শালিখা উপজেলার দেশমুখপাড়া গ্রামের নিজামউদ্দিন, গুনাগাটির মোস্তফা ও উত্তম বিশ্বাস। নিজামের একটি ও অন্য দুই জনের দুটি গরু ছিল। ব্যাপারীরা পানির মতো দর বলায় এরা কেউ গরু বিক্রি করতে পারেননি। মাগুরার বিভিন্ন উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের চিত্র এরকমই।

ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুণ্ডু উপজেলার বাসিন্দা জাহাঙ্গির আলম ডালিম। প্রতিবছরই তিনি বেশ কয়েকটি গরু লালন পালন করে কোরবানি মৌসুমে বিক্রি করেন। কিন্তু প্রতিবছর কম বা বেশি দামে বিক্রি করতে পারলেও মহামারি করোনার এই কোরবানিতে তার দুটির একটি গরুও বিক্রি হয়নি।

ডালিম জানালেন, কোনো ব্যাপারীই তার বাড়িতে আসেননি। এখন অবিক্রিত এসব গরুর খাবার জোগাতে যে টাকা দরকার তা কোথায় পাবেন তাই দিয়ে চিন্তিত তিনি। শুধু ডালিম নয় তার মতো গুড়পাড়াভাতুরিয়ার এই গ্রামে ভরত, নূর আলম, আক্কাস, সুখ দেবসহ বহু কৃষকের একটি গরুও বিক্রি হয়নি। এ চিত্র ছিল জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই।

সবচেয়ে বড় দুই গরু বিক্রি ১৫ লাখ টাকায়। এবছর কোরবানিতে সবচেয়ে বড় দুই গরু ছিল যশোরের মণিরামপুরের গুরগাতি গ্রামের হাসমত আলীর। তিনি গরু দুটির নাম দেন বাংলার বস ও বাংলার সম্রাট। তিনি এলাকায় বিক্রি করতে না পেরে ঢাকা নিয়ে আসেন।

বৃহস্পতিবার বিকালে গাবতলী পশুর হাটে ‘বাংলার বস’ ১০ লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে আসমত আলী গাইন গরুটির দাম হেঁকেছিলেন ৩০ লাখ টাকা । এটির ওজন ছিল ১ হাজার ২৯৫ কেজি। অপরটি বাংলার সম্রাটের ওজন ছিল ৯৭৭ কেজি (লাইফ ওয়েট)।

২০ লাখ টাকা দাম চাওয়া বাংলার সম্রাট বিক্রি করেন ৫ লাখ ১০ হাজার টাকায়। তবে হাসমত আলী জানান, গরু বিক্রি করে তার মোটা অঙ্কের লস গুণতে হয়েছে।

বিক্রির পর হাসমত জানান, গত বছর কোরবানির ঈদের কয়েক দিন আগে যশোরের নিউমার্কেট এলাকার হাইকোর্ট মোড়ের খামারি মুকুলের কাছ থেকে তিনি ‘বাংলার বস’ কেনেন ১৭ লাখ টাকায়। আর ‘বাংলার সম্রাট’ কেনা হয় ৮ লাখ টাকা দিয়ে। প্রথম অবস্থায় দুটি গরুর দাম হেঁকেছেন ৮০ লাখ টাকা।

এর মধ্যে বাংলার বসের দাম নির্ধারণ করেছিলেন ৫০ লাখ টাকা। গরু দুটি বিক্রির আগে বৃহস্পতিবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গরু দুটির ব্যয় তিনি আর বহন করতে পারছেন না। তিনি গরু দুটি বিক্রিতে প্রধানমন্ত্রীরও সাহায্য চেয়েছিলেন।’

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত