ব্যালটের চেয়ে ইভিএমে ভোট ৩৯ শতাংশেরও কম

১০টি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ
ব্যালটের চেয়ে ইভিএমে ভোট ৩৯ শতাংশেরও কম
ব্যালটের চেয়ে ইভিএমে ভোট ৩৯ শতাংশেরও কম

প্রচলিত ব্যালট পেপারেই ভোটের প্রদত্ত হার বাড়ছে। ব্যালটের চেয়ে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট পড়ার হার এক-তৃতীয়াংশ। ব্যালট পেপার এবং ইভিএমে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মধ্যে ভোট পড়ার হারে বিস্তর ফারাক।

বিগত ১০টি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনের প্রদত্ত ভোটের হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যালটের চেয়ে ইভিএমে ভোট পড়ার হার ৩৯ শতাংশেরও কম। বিগত পাঁচটি সংসদীয় আসনে ব্যালটে প্রতি আসনে গড়ে ভোট পড়েছে ৫৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে বিগত পাঁচটি আসনে গড়ে ইভিএমে ভোট পড়ে ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। ব্যালটের চেয়ে ইভিএমে ভোট কম পড়েছে ৩৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, করোনাভীতি ও ইভিএমের নেতিবাচক প্রচারণার কারণে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, করোনাভীতি, ইভিএমের নেতিবাচক প্রচারণা, ইভিএম থেকে করনো ছড়ানোর আশঙ্কা ইত্যাদি কারণে ইভিএমে ভোট কম পড়ছে। তাছাড়া ফিংগারপ্রিন্ট ছাড়া ইভিএমে ভোট দেওয়ার সুযোগও থাকে না। অন্যদিকে কাগজে করোনা ছড়ায় না—এতে সচেতন ভোটাররা কেন্দ্রে আসছেন। আবার ব্যালটে জাল ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। মূলত কেন্দ্রে প্রতিপক্ষের এজেন্ট অনুপস্থিত থাকলে অন্যের ভোট আরেক জনের দেওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

বিগত সর্বশেষ ১০টি উপনির্বাচনের মধ্যে পাঁচটি ব্যালটে এবং পাঁচটি ইভিএমে অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালটে অনুষ্ঠিত হয় পাবনা-৪, গাইবান্ধা-৩, বাগেরহাট-৪, যশোর-৬ এবং বগুড়া-১। অন্যদিকে ইভিএমে ঢাকা-৫, ঢাকা-১০, নওগাঁও-৬, চট্টগ্রাম-৮ এবং রংপুর-৩ অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালটে সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোট পড়েছে পাবনা-৪ আসনে। সর্বনিম্ন ভোট পড়ে বগুড়া-১ আসনে ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ। একইভাবে ইভিএমে সর্বোচ্চ ভোট পড়ে নওগাঁও-৬ আসনে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ। সর্বনিম্ন ভোট পড়ে ঢাকা-১০ আসনে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সুস্পষ্ট পদক্ষেপের জন্য কমনওয়েলথের প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান

১০টি আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, করোনার মধ্যে সর্বশেষ গত ১৭ অক্টোবর ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনে ইভিএমে ভোট হয়। ইভিএমে অনুষ্ঠিত নওগাঁ-৬ আসনের ভোটের হার কিছুটা সন্তোষজনক। নওগাঁ-৬ আসনে ৩ লাখ ৬ হাজার ৭২৫ ভোটের মধ্যে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পড়ে। তবে ঢাকা-৫ আসনে ভোটের অনেক হার কম। ঢাকা-৫ আসনে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৭১ ভোটের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪৯ হাজার ১৪১ জন। ভোট পড়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে গত ২১ মার্চ ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ১৫ হাজার ৯৯৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম ধানের শীষ প্রতীকে পান ৮১৭ ভোট এবং জাতীয় পার্টি-জাপার প্রার্থীর হাজী মো. শাহজাহান ৯৭ ভোট পান। ঐ আসনের ভোটসংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ২৭৫। ভোট পড়ে মাত্র ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। একইভাবে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইভিএমে অনুষ্ঠিত ঐ ভোটে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৮৫ ভোটের মধ্যে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট প্রদান করেন। এর আগে গত বছরে জাতীয় পার্টি-জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ মারা গলে রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন হয়। গত বছরের ৫ অক্টোবর ইভিএমে অনুষ্ঠিত রংপুর-৫ আসনে ২১ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পড়ে। বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ইভিএমে আসনটিতে ৫২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পড়েছিল।

গত ২১ মার্চ ব্যালটে অনুষ্ঠিত হয় গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনের উপনির্বাচন। ব্যালট পেপারে অনুষ্ঠিত ভোটে যথাক্রমে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ ও ৫৯ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট পড়ে। করোনা সংক্রমণের মধ্যে গত ১৪ জুলাই যশোর-৬ এবং বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচন হয়। এ আসন দুটিতে ভোট হয় ব্যালট পেপারে। যশোর-৬ আসনে মোট ২ লাখ ৩ হাজার ১৮ জন ভোটারের মধ্যে ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৭ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ১ হাজার ৩৭৪ ভোট। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৬৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। একই দিনে অনুষ্ঠিত বগুড়া-১ আসনে ভোট পড়ে ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা-৪ আসনের উপনির্বাচনে ৩ লাখ ৮১ হাজার ১১২ ভোটারের মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার ৬৮৪ ভোট পড়ে। এর মধ্যে ২ হাজার ৭১টি ভোট বাতিল হয়। গড়ে ভোট পড়ে ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ছয়টি আসনে ইভিএমে ভোট হয়, তাতে গড়ে ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোট পড়ে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৯ আসনে ভোট পড়ে ৬২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ঢাকা-৬ আসনে পড়ে ৪৫ দশমিক ২৬ ও ঢাকা-১৩ আসনে পড়ে ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।

ইভিএমের ভোটে চলতি বছর ১৩ জানুয়ারি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া পৌরসভায় সর্বোচ্চ ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ ভোট পড়ে। এ ছাড়া একই দিন পাবনার মালিগাছা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৭৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ঢাকা উত্তরে ভোট পড়ে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ, আর দক্ষিণে পড়ে ২৯ শতাংশ।

ব্যালট পেপার এবং ইভিএমে ভোট পড়ার বিস্তর ফারাক সম্পর্কে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নির্বাচনে প্রভাবশালীদের প্রভাব থাকে। ভয়ভীতির কারণে প্রতিপক্ষরা দুর্বল হয়ে যান। এছাড়াও নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের আস্থাহীনতাও আছে। ইভিএমে ভোটারের উপস্থিত থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিশ্চিত হয়ে ভোটদানের সুযোগ থাকায় ভোট প্রদানের প্রকৃত তথ্য উঠে আসে, যা ব্যালট পেপারের ভোটে সম্ভব নয়।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত