ভোটের আগেই ইউপি চেয়ারম্যান ২৭ জন!

৩৭১ ইউপিতে ২০ হাজার ৪৯০ জনের মনোনয়ন দাখিল, চেয়ারম্যান পদে ১৭৫২ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ১০৯৯ জনের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী
ভোটের আগেই ইউপি চেয়ারম্যান ২৭ জন!
নির্বাচন কমিশন। ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১১ এপ্রিল ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট। অথচ ভোটের আগেই ২৭ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। গত ১৯ মার্চ মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে ২৭টি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী ছাড়া অন্যরা কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি। ফলে ঐ ২৭টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ভোট হচ্ছে না। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং অফিসাররা সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করবেন। ইসি সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত সদস্য এবং সদস্য পদে মোট ২০ হাজার ৪৯০ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে সাধারণ সদস্য পদে (মেম্বার) ১৪ হাজার ৪৩৫ জন ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৪ হাজার ৩০৩ জন প্রার্থী হয়েছেন। চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ১ হাজার ৭৫২ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৯ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। বাকি ৬৫৩ জন আওয়ামী লীগসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের মনোনীত। বিএনপিসহ নিবন্ধিত বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল দলীয় প্রতীকে প্রথম ধাপের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রতীকে অংশ না নেওয়ার ঘোষণায় সরকারি দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। যদিও বিএনপির প্রার্থীরাও স্বতন্ত্রভাবে এবারের ইউপি ভোটে অংশ নিচ্ছেন।

বিনা ভোটের ২৭ চেয়ারম্যান

২৭টি ইউনিয়ন পরিষদে একটি করে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। সেই ইউপিগুলো হলো—বাগেরহাটের ফকিরহাটের বেতাগা, পিলজংগ; মোল্লাহাটের চুনখোলা, কোদালিয়া, আটজুড়ি, গাওলা, কুলিয়া; চিতলমারীর শিবপুর, সন্তোষপুর; কচুয়ার রাড়ীপাড়া, মোংলার সোনাইলতলা, শরণখোলার সাউথখালী, সদরের বিঞ্চুপুর, বরিশালের বাকেরগঞ্জের দুধল, গৌরনদীর বাটাজোড়, খানজাপুর, চাদশী, মাহিলারা, নলচিড়া, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার তেলিখালী, ঝালকাঠি সদরের কেওড়া, ভোলার বোরহানউদ্দিনের গঙ্গাপুর, চরফ্যাশনের এওয়াজপুর, চট্টগ্রাম সন্দ্বীপের বাউরিয়া, সারিকাইত, মগধরা, হারামিয়া।

২০১৬ সালের ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের ৭৩৮ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫৪ জন ভোটের আগেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। গতবারের তুলনায় এবার ইউপির সংখ্যাও কম। ভোটের আগেই চলমান ইউপি নির্বাচনে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সব রেকর্ড ভেঙে যাবে বলে ধারণা করছেন ইসির কর্মকর্তারা। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ৪ হাজার ইউপির মধ্যে প্রায় ২ শতাধিক ইউপিতে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেটিই এখনো পর্যন্ত যে কোনো নির্বাচনে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড।

ইসি থেকে থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা জানা গেছে, অতীতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের রেকর্ড ছিল ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে। এরশাদ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ঐ ইউপি নির্বাচনে ১০০ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ঐ সময় ঐ নির্বাচনকে সেই সময়ে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর কোনো স্থানীয় নির্বাচন, বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে বিনা ভোটে জয়ের সংখ্যাটা তেমন ছিল না। ১৯৯২ সালের ইউপি নির্বাচনে মাত্র চার জন চেয়ারম্যান বিনা ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ৩৭ জন। ২০০৩ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হয়েছেন ৩৪ জন। ২০১১ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা দুই অঙ্কে পৌঁছেনি বলে ঐ সময় দায়িত্বে থাকা ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রচারণা শুরুর আগেই সহিংসতা

প্রথম ধাপে দেশের ১৮ জেলার ৩৭১টি ইউপিতে প্রচারণা শুরু হবে ২৫ মার্চ থেকে। প্রচারণা শুরুর আগেই কয়েকটি নির্বাচনি এলাকায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বাগেরহাট সদরের ডেমা ইউনিয়নে গত বৃহস্পতিবার রাতে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলিতে উভয় পক্ষের ১৬ জন গুলিবিদ্ধসহ এই জেলায় মোট ৭৩ জন আহত হয়েছেন। বাগেরহাটের শরণখোলায় পৃথক দুটি সহিংসতায় ৯ নারীসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। বরগুনার বেতাগীতে ইউপি নির্বাচন ও পূর্বশত্রুতার জের ধরে সরিষামুড়ি ইউনিয়নের দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত হয় প্রায় ১০ জন।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৩৭১টি ইউপির মধ্যে ৩০টিতে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। আগামী ১১ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর-২ আসনের উপনির্বাচন এবং ১১ পৌরসভায়ও ভোটগ্রহণ হবে ইভিএমে। পৌরসভাগুলো হচ্ছে—কুমিল্লার নাঙ্গলকোট, ঝালকাঠির সদর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, ফেনীর সোনাগাজী, নোয়াখালীর কবিরহাট, কক্সবাজারের মহেষখালী ও চকরিয়া, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ও যশোরের নওয়াপাড়া (অভয়নগর)।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, গত শুক্রবার থেকে মনোনয়পত্র যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। এরপর বাতিল বা বৈধ ঘোষণা করা মনোনয়নপত্রের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। এসব নিষ্পত্তি এবং ২৪ মার্চ প্রত্যাহারের শেষ তারিখের পর প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমে আসবে এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যা বাড়তে পারে।

ইত্তেফাক/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x