বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছিষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচনের মাধ্যমে চলমান স্বাধিকার আন্দোলন দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনে রূপ নেয় মূলত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম... যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’ বলে তিনি যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে ২৫শে মার্চের কালরাতের হত্যাযজ্ঞের পর মূলত তা-ই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তার স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ডাকের সেই ঐতিহাসিক অগ্নিঝরা গান আর নিরস্ত্র বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবনদানের ঘটনা তাত্ক্ষণিক উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমা বিশ্বসহ পৃথিবীর সব প্রান্তে।
বাঙালির স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের এই যুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠন, আর্থিক সহায়তাদান এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া লক্ষ-কোটি শরণার্থীর খাদ্য, চিকিৎসার জন্য মানবতাবাদী ব্রিটিশ ব্যান্ড গায়ক জর্জ হ্যারিসন তার দল ‘বিটল্সকে’ নিয়ে নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ১ আগস্ট আয়োজন করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। বাঙালির চিরজনমের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসকারী পণ্ডিত রবিশংকরের প্রেরণায় দুই গুরু-শিষ্য মিলে এর আয়োজন করে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়ে নিজেরাই ইতিহাসের অংশ হয়ে স্থান করে নেন আমাদের হূদয়ে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নাম শুনেছিল সেদিন। জেনেছিল সেদিনের চলমান মুক্তযুদ্ধের কথা, জানতে পেরেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার কথা।
‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর বড় আকর্ষণ ছিলেন জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলান। জর্জ হ্যারিসন আটটি গান গেয়েছিলেন। বব ডিলান গেয়েছিলেন পাঁচটি গান। রিঙ্গো স্টার ও বিলি প্রেস্টন একটি করে গান করেছিলেন। লিওন রাসেল একটি একক এবং ডন প্রেস্টনের সঙ্গে একটি গান করেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে জর্জ হ্যারিসন গেয়েছিলেন তার সেই অবিস্মরণীয় গান ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। গানটি জর্জ হ্যারিসনের নিজের লেখা এবং সুর করা। গানের মূল কথাই ছিল বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। গানের সুরে মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন মানুষ মানুষের জন্য। জর্জ হ্যারিসন পুরো গানটা উচ্চ স্বরে করুণ বিলাপের সুরে গভীর মানবিক ও বিপ্লবী আবেদন নিয়ে গেয়েছিলেন। দর্শক-শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। সেদিনই বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা পাওয়ার আগেই স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে পরিচিত হয়েছিল। যে আমেরিকা পাকিস্তানকে অর্থ ও সমরাস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছিল, সাগরে পাঠিয়েছিল সপ্তম নৌবহর, সেই আমেরিকার লাখ লাখ সাধারণ ছাত্র-জনতা বিটলেসর মানবিকতার গানে সুর মিলিয়ে ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ বলে চিত্কার করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। সেদিনের ভেন্যুতে দর্শকদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় দ্বিতীয়বার আয়োজন করতে হয়েছিল। অর্জিত হয়েছিল প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার।
জর্জ হ্যারিসন ছিলেন সংগীতজগতের মানবিকতার প্রতীক। বিভিন্ন দেশের হতদরিদ্র মানুষের সেবায় অর্থসাহায্যের জন্য তিনি নিজ উদ্যোগে অনেক কনসার্টের আয়োজন করেছেন। পাশাপাশি তিনি উদারনৈতিক রাজনীতির পক্ষেও ছিলেন সচেতন। ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধের বিপক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেছেন। তার এসব অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের ইউনেস্কো তাকে ও রবিশংকরকে ‘চাইল্ড ইজ দ্য ফাদার অব দ্য ম্যান’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। হ্যারিসন ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বিভিন্ন দেশের গরিব অসহায় শিশুদের শিক্ষাসহ বিভিন্ন সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইউনেস্কো। তারই অংশ হিসেবে ২০১১ সালে তার স্ত্রী অলিভিয়া এরিস বাংলাদেশের কার্যক্রম পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন।
জর্জ হ্যারিসন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৪৩ সালে লন্ডনের লিভারপুল এলাকার এক গরিব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাসড্রাইভার পিতার চার সন্তানের সবার ছোট ছিলেন তিনি। মাত্র চার বছর বয়সে হঠাত্ করে ‘একটি মিট বল’ গান গেয়ে পরিবারের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। বালক জর্জের পড়াশোনায় মন বসেনি কখনো। ১২ বছর বয়সে ইলভিস প্রিসলির ‘হার্ড ব্রেক হোটেল’ গান শুনে, বাসায় পড়ার টেবিলে বসে গিটারের ছবি আঁকতেন খাতায়। তা দেখে মা-ও তাকে প্রথম গিটার কিনে দেন। এই একটি গিটারই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নিজের ভাইবোনকে নিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেছিলেন। তারা নিজেরা মিলে গঠন করেছিলেন ‘রিবেল’ নামের নূতন গানের দল। কিছুদিন পর মাকে বুঝিয়ে ভালো একটা গিটার কেনেন। লম্বা চুল ও ফ্যাশনের ড্রেস পরে হয়ে উঠেছিলেন টেডি বয়। ক্লাসমেট বন্ধু ম্যাককার্টনির মাধ্যমে পরিচয় ঘটে তিন-চার বছরের বড় নতুন কিশোর শিল্পী ও গিটারিস্ট জন লেননের সঙ্গে। অতঃপর তিন জন মিলে ১৯৬০ সালে গঠন করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক ব্যান্ড দল ‘বিটল্স’। মাত্র দুই বছরেই লন্ডন ও জার্মানির হট ফেবারিটে পরিণত হয়েছিল বিটল্স। ক্রমশ ইউরোপ ছাড়িয়ে আমেরিকায়ও তাদের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল আজকের কিশোর প্রজন্মের জনপ্রিয় ক্রেজ ‘কেপপের’ মতোই। পরিণত হয়েছিল আমেরিকার ‘রক অ্যান্ড রোল’-এ। এরপর শুধুই ইতিহাস, সাফল্যের ইতিহাস।
১৯৬৫ সালে সেতারের প্রতি আগ্রহী হয়ে পণ্ডিত রবিশংকরের ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন। ইন্ডিয়াও ঘুরে এসেছিলেন কিছুদিনের জন্য। সেতার বাজানোতে তেমন সাফল্য পাবেন না বলে তা বাদ দিলেও রবিশংকরের সঙ্গে তার গুরু-শিষ্য সম্পর্কের পাশাপাশি যে বন্ধুত্বও গড়ে উঠেছিল, তা সমুন্নত রেখেছিলেন। তার জীবনের প্রথম আঘাতটি তিনি পেয়েছিলেন, যখন তার প্রথম স্ত্রী প্যাটি বয়েড তাকে ছেড়ে যান তারই সহকর্মী ক্ল্যাপটনের হাত ধরে; অতিরিক্ত মদ্যপান, নেশা ও ছন্নছাড়া জীবন যাপনের অভিযোগ দিয়ে। ১৯৭৮ সালে সিনেমা প্রযোজক অলিভিয়া প্রিসলিকে বিয়ে করে আবারও নতুন করে শুরু করেন জীবন। অসংখ্য জনপ্রিয় গান এবং ‘অল দোওজ ইয়ারস’-এর মতো যুগান্তকারী এলবাম সৃষ্টি করে সংগীতজগতের কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। কট্টর ক্যাথলিক পরিবারের সদস্য হলেও ধর্মীয় গোঁড়ামিতে তিনি অভ্যস্ত হতে পারেননি। তাই তো কালের পরিক্রমায় তিনি হিন্দুধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। পূজা না করেও আসক্ত হয়েছিলেন কৃষ্ণ, দেবী, গীতা ও শিবের মূর্তিতে। ২০০১ সালের নভেম্বরে লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউসিএলএ মেডিক্যাল সেন্টারে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মানবতার ফেরিওয়ালা, সংগীত কিংবদন্তি ও বাঙালির চিরজনমের এই বন্ধু। পাশে ছিলেন তার স্ত্রী অলিভিয়া এরিস ও একমাত্র পুত্র ধানি হ্যারিসন।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, জর্জ হ্যারিসন,
বায়োগ্রাফি :মি. মাইন
লেখক: প্রবাসী আইনজীবী
ইত্তেফাক/জেডএইচডি

