প্রাণ ছিল ঐ সদরঘাটেই

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ০৯:২১

দেখতে দেখতে স্কুল ১৩০ বছরে পা দিয়েছে। দেখতে দেখতে তো বটেই। আমার নিজের বয়সই তো ৮৫ পার হলো। ঐ ভাবেই, সচেতনতার বাইরেই। স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম সেই ১৯৪৮ সালে। সে তো প্রায় ৭৩ বছর আগের ঘটনা। এমনই হয়।

এত বছরে কত ছাত্র পার হয়ে গেছে আমাদের সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে। পাঠশালা যেন পান্থশালা, এটা তো কোনো বাড়িয়ে বলা নয়, খুবই সত্য কথা। স্কুল থেকে আমরা পেয়েছি অনেক কিছু, বিনিময়ে কী দিতে পারি, এক কৃতজ্ঞতা ছাড়া, সে কৃতজ্ঞতাই-বা প্রকাশ করবার উপায় কী? একাধিক স্কুলে আমাকে পড়তে হয়েছে, একেবারে বাল্যকালে সূত্রপাত গ্রামের পাঠশালায়, অল্পদিনের জন্য; তারপরে রাজশাহী মিশনারি গার্লস স্কুল, সেও বেশি দিন নয়, এরপরে রাজশাহীরই লোকনাথ হাইস্কুলে, বেশ কয়েক বছর আরো পরে কলকাতার সেন্ট বারনাবাস স্কুলে, তবে পুরো বছর নয়, সেখান থেকে ময়মনসিংহের জেলা স্কুলে, কয়েক সপ্তাহের জন্য, সবশেষে সেন্ট গ্রেগরিজে, সেখানে আমি পড়েছি ক্লাস নাইন ও টেনে। এই শেষ পড়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার জন্য, সর্বাধিক প্রভাবশালী তো অবশ্যই। এখান থেকেই ম্যাট্রিক পাশ করি আমি, ১৯৫০ সালে। ম্যাট্রিক নয়, তখন নাম ছিল হাইস্কুল একজামিনেশন।

ছবি: ১৯৮১ সালের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল

পাশ করলাম। হাইস্কুল ছাড়লাম, আরো উঁচুতে উঠলাম; কিন্তু ছাড়লাম কী? না, ঠিক ছাড়া হয়নি। কলেজে গিয়েও স্কুলেই রয়ে গেলাম। স্কুলে তখন সবেমাত্র কলেজ শাখা খুলেছে, আমার আব্বা নিশ্চয়ই তক্কে তক্কে ছিলেন, নইলে অত দ্রুত, আমার বুঝে ওঠার আগেই সেই কলেজে ভর্তি করে দেবেন কেমন করে? স্কুলের নামই কলেজের নাম, সেন্ট গ্রেগরিজ কলেজ, পরে তার পরিচয় দাঁড়িয়েছিল নটর ডেম কলেজ হিসেবে। কেমন তাই নয়, প্রথম দিকে কলেজের কোনো নিজস্ব ভবন ছিল না, বসত সে স্কুলের কয়েকটি কক্ষেই, প্রতিদিন, স্কুল শুরু হবার আগে, প্রত্যুষে। স্কুল থেকে বের হয়েও তাই বের হতে পারিনি। ব্রাদারদের পরিচালনায় ছিলাম, এবার এলাম ফাদারদের তত্ত্বাবধানে। কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য কলেজ নতুন একটা বাড়িতে উঠে গিয়েছিল; কিন্তু সোটাও ঐ লক্ষ্মীবাজারেই এবং স্কুল থেকে এক দৌড়ে পৌঁছা যায় এমন দূরত্বেই। পরবর্তী সময়ে কলেজটি স্কুল থেকে পৃথক হলো। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল স্থানেরও। মতিঝিলে কলেজ সেই যে গেল আজ অবধি ওখানেই আছে।

বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ

ঢাকায় আমরা এসেছি ১৯৪৭ সালের শেষে, দেশভাগের কারণে। প্রথমে যেতে হয়েছিল ময়মনসিংহে, সেখান থেকে মোটামুটি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য এলাম ঢাকায়। খোঁজ পড়ল স্কুলের। আমার বাবা মিশনারিদের স্কুলের ওপর খুবই আশা রাখতেন, সে জন্য আমার শিক্ষা জীবনের শুরু রাজশাহীর মিশন গার্লস স্কুলে; কিন্তু সেখানে তো শিশুশিক্ষা পর্যন্ত সম্ভব, তারপরে ছেলেদের স্কুল খুঁজে নিতে হয়েছে। রাজশাহীতে মিশনারিরা ছেলেদের জন্য কোনো স্কুল খোলেনি, তাই বোধ করি বাধ্য হয়েই আব্বা আমাদের দুই ভাইকে পাঠিয়েছিলেন সেখানকার লোকনাথ হাইস্কুলে। কলকাতায় গিয়ে মিশনারি স্কুল পেয়ে সেখানে দিলেন ভর্তি করে। ময়মনসিংহে মিশনারি স্কুল নেই, তবে কলেজিয়েট স্কুল সবার সেরা, তাই সেখানে যেতে হলো। ঢাকায় এসে তার চোখ ছিল সেন্ট গ্রেগরিজের ওপর। একে মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত, তাই আবার খুব ভালো বলে উচ্চ প্রশংসিত। সে স্কুলে আব্বার বগলদাবা হয়ে আমরা দুই ভাই গিয়ে হাজির হয়েছি। আমার ভাইটিকে সেভেনে ও আমাকে নাইনে ভর্তি করার পরে মনে হলো তিনি নিশ্চিত হয়েছেন।

May be an image of outdoors

নিশ্চিত আমরাও হয়েছিলাম। বুঝলাম এটি খুব ভালো স্কুল, আগে কয়েকটি স্কুলে পড়েছি সবকটির তুলনায় ভালো। প্রশস্ত ও বিস্তৃত এলাকায়, খোলামেলা। শিক্ষকরা দক্ষ, দায়িত্বশীল ও স্নেহপ্রবণ। দেশ ভাগের প্রথম ধাক্কাতে দুই-একজন শিক্ষক চলে গেছেন, তবে অধিকাংশই রয়ে গেছেন, থাকবেন। ছিলেনও। ঢাকা তখন নিতান্তই মফস্সল শহর। বিদ্যুত্ অপ্রতুল। যাতায়াতের রাস্তাগুলো সরু সরু, গলির মতোই। যানবাহন পেতে ভীষণ কষ্ট। বাস আছে তবে মুড়ির টিন। রিকশা তখন সবে শুরু হয়েছে। ওদিকে বাসগৃহের প্রবল সংকট; কিন্তু স্কুলে এসে ছিল মুক্তি। সেখানে প্রশস্ত একটা জীবন, সুশৃঙ্খল; কিন্তু প্রাণবন্ত।

কিন্তু আরো একটা ব্যাপার ছিল। সেটা হলো বুড়িগঙ্গা নদী এবং সদরঘাট। সদরঘাটই ছিল ফাঁকা শহরের প্রাণ এবং আমাদের স্কুল ছিল সদরঘাটের পাশেই। কেবল আমাদেরটা কেন, অধিকাংশ স্কুলেরই তো ছিল ঐ একই ঠিকানা, সদরঘাট। কলেজিয়েট, মুসলিম হাই, পগোজ, ইস্ট বেঙ্গল, জুবিলি, আলিয়া মাদ্রাসা—কোনটা নয়? মেয়েদের স্কুল সেন্ট ফ্রানসিস, বাংলাবাজার গার্লস, তারাও ঐখানেই। জগন্নাথ কলেজ, ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট, কায়েদে আজম কলেজ—সবই। আমার স্ত্রী নাজমা পড়েছে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ, সেটিও ছিল সদরঘাটের নর্থব্রুক হল রোডে।

বইয়ের দোকানের প্রায় সবই সদরঘাটে। স্থানীয় দোকান তো অবশ্যই, কলকাতার দোকানের শাখাও ছিল। কাগজ-কলম কিনতে হলেও ওখানেই যেতে হবে। ঘড়ি বলি, চশমা বলি, চাই যদি অনুষ্ঠানের জন্য মাইক্রোফোন, ভালো কোয়ালিটির লেখা কাগজ, দরকার পড়ে যদি সিঙ্গার মেশিনের কিংবা স্বর্ণালংকারের, তবে সদরঘাট ছাড়া গতি কী? কাপড়ের দোকান, সিনেমা হল, ছাপাখানা, কাঁচি ধারানোর দোকান, স্টেশনারির নতুন শপ—সব পাওয়া যাবে সদরঘাটে। ব্যাংকগুলোও ঐখানেই। প্রধান পোস্ট অফিস সেটিও। আমরা তখন পড়ি নিয়মিত পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকা, তার অফিস ও ছাপাখানা ঐখানেই। মিষ্টির প্রসিদ্ধ দুই দোকান, কালাচাঁদ গন্ধবণিক ও সীতারাম গন্ধবণিক, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সদরঘাটে যাবার এক প্রবেশ পথের কাছে। জুতার দোকান, খাবার রেস্টুরেন্ট, রামমোহন লাইব্রেরি, নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি—সবাই সদরঘাটের অনুরাগী; আশপাশে অবস্থান।

আর ঢাকা থেকে বাইরে যাবার যানবাহন? তার জন্যও তো যেতে হবে ঐ সদরঘাটেই। লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা, বজরা—কোনটা নেই। মানুষ আসছে, যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে যারা বাসে করে যাবে তাদেরকে আসতে হবে ভিক্টোরিয়া পার্কে, যার এখনকার সংগত নাম বাহাদুর শাহ পার্ক বটে। ঐ পার্কের কাছ থেকেই টাউন সার্ভিসের যাত্রা শুরু ও সমাপ্তি। রাজনৈতিক সভা ঐ পার্কে হয়, আর হয় বুড়িগঙ্গার গা ঘেঁষে করোনেশন পার্কে, সেই পার্ক মনে হয় এখন অবলুপ্ত। হবেই তো, সদরঘাটই তো নেই, আর তার পার্শ্ববর্তী পার্ক! থাকবে কী করে প্রাত কি সান্ধ্য ভ্রমণের ব্যবস্থা। আর কোর্ট-কাচারি সেও তো ছিল সদরঘাটের কাছেই।

সব রাস্তাই মনে হতো সদরঘাটমুখী। আমরা স্কুলে যেতাম পায়ে হেঁটে। স্রোতের মতো, দলবেঁধে। যেভাবেই যাওয়া সেভাবেই ফেরা। গল্প করতে করতে, ঝগড়া করতে করতেও, তবে বেশির ভাগ সময়ই নীরবে। যাবার সময় উত্কণ্ঠা থাকত সময় মতো পৌঁছাতে পারব কি না, ফেরার সময় অস্থিরতা থাকত বাসায় পৌঁছার, সেখানে মা অপেক্ষা করছেন খাবার নিয়ে।

আমরা জানতাম কি কোন দিকে যাচ্ছি? কোন লক্ষ্যে? না, তা জানা ছিল না। মনে করতাম উন্নতির পথের যাত্রী আমরা, যেতে হবে সামনের দিকে, পিছনে পড়লে বিপদ আছে; কিন্তু সদ্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতা যে আমাদেরকে অত্যন্ত উত্ফুল্ল করেছিল এমন নয়। উর্দু রাষ্ট্র ভাষা হবে, বাংলার জন্য মর্যাদাপূর্ণ স্থান লাভ সম্ভব হবে না, এমন আশঙ্কা শুরুতেই দেখা দিয়েছিল। আমরা পীড়িত বোধ করছিলাম। খুব বড় একটা দুঃখ পেয়েছি ৫০ সালে যখন দাঙ্গার কারণে সহপাঠীদের বেশ কয়েক জন তাদের পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে বলে জানতে পারলাম।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন গড়ে উঠছে, আমরা অংশ নিচ্ছি। একদিন সকালে ক্লাসরুমে হঠাৎ দেখি কমিউনিস্ট পার্টির সাইক্লোস্টাইল করা ইশতাহার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে। বোঝা গেল ছাত্রদের ভেতর থেকেই দুঃসাহসী কাজটা করা হয়েছে। দুঃসাহসীই বলতে হবে, কারণ কমিউনিস্ট পার্টি তখনো সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হয়নি ঠিকই, তবে কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা-বিরোধী কংগ্রেস ছিল ঐ বিপদ থেকে মুক্ত। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একদিন নিজের চোখে দেখলাম করোনেশন পার্কে কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য সভা করার একটি আয়োজনকে কলতাবাজার এলাকা থেকে কয়েক জন চিহ্নিত মুসলিম লীগপন্থি ছুটে এসে ভেঙে ফেলল। আরেক দিন দেখি আরমানিটোলা পার্কে মওলানা ভাসানী বক্তৃতা করছেন। জগন্নাথ কলেজের একজন অধ্যাপককে দেখেছি সদরঘাটে ফরওয়ার্ড ক্লকের সাপ্তাহিক পত্রিকা বিক্রি করছেন, পরে শুনেছি তিনি ছিলেন সমর গুহ।

অনেক কিছু ঘটছিল; কিন্তু ভেতর ভেতর একটা বড় ব্যাপারও সংঘটিত হচ্ছিল। সেটা হলো সদরঘাটের পতন। অবিভক্ত বাংলায় ঢাকা ছিল মফস্সলের বড় শহর, সদরঘাট ছিল সেই শহরের রাজধানী। ৪৭ সালের পরে ঢাকা শহর পূর্ববঙ্গের রাজধানী হয়েছে; কিন্তু সেই রাজধানী সদরঘাটে থাকতে সম্মত হয়নি। ছুটেছে সে উত্তরমুখী, যেদিকে সেক্রেটারিয়েট বসেছে, রয়েছে ক্যান্টনমেন্ট, আর আছে এয়ারপোর্ট, যার সঙ্গে বিশ্বের যোগাযোগ। নতুন ঢাকার বৃদ্ধিতে পরিত্যক্ত হয়েছে পুরাতন শহর। আমাদের সেই সেন্ট গ্রেগরিজ কলেজ, সে যখন নটর ডেম কলেজ হলো তখন তার জন্যও তো স্থান পাওয়া যায়নি পুরাতন ঢাকায়, তাকেও সরে আসতে হয়েছে উত্তর দিকেই। উত্তরের নিউ মার্কেট জব্দ করেছে দক্ষিণের পাটুয়াটুলি ও ইসলামপুরকে। ঢাকাতে এসে আমার বাবা প্রথমে বাসা খুঁজে পেয়েছিলেন নাজিরা বাজারে, সেখান থেকে সরে এসেছিলাম বেগম বাজারে, দুটোই পুরাতন রেললাইনের দক্ষিণ পাড়ে; কিন্তু যখন স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছি তখন সরে এসেছি উত্তরে।

আমাদের পুরাতন স্কুলকে ধন্যবাদ এসব চিন্তা উদ্রেক করার জন্য। ঐ স্কুল আমার কাছে স্মৃতি নয় শুধু, সে আমার নিত্যসহচর, সে আরো আমার ভেতরেই এমনভাবে রয়েছে যে তাকে বিচ্ছিন্ন করব কী চিহ্নিতই করতে পারব না।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন