বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

করোনা মহামারি

খাদ্য নিরাপত্তায় টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণে করণীয়

খাদ্য নিরাপত্তায় টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণে করণীয়
প্রতীকী ছবি

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে মানবিক দুর্যোগ। ইতোমধ্যে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সারাবিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা এক কোটি অতিক্রম করেছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ভাইরাসটিতে মারা গেছেন। করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী। নিজ নিজ দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রফতানি সীমিত অথবা বন্ধ করে দিতে পারে রফতানিকারক অনেক দেশ। ফলে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলো খাদ্যপণ্যের সংকটে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা (এফএও) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের সংকট তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের যৌথ উদ্যোগে ১৫ জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। দেশে করোনা ভাইরাসজনিত রোগ এর বর্তমান পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। এর একটি হচ্ছে ‘খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। অধিক ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার করতে হবে। কোন জমি যেন পতিত না থাকে।’

খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি। বর্ধিত ফসল উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা ও উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনার একটি অঙ্গ হচ্ছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, ফসলের উৎপাদন খরচ ও ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর বিপরীতে কমছে কৃষি জমি। এছাড়াও কৃষি শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান হারে শিল্প, পরিবহন, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে স্থানান্তরের ফলে কৃষি শ্রমিকের হার ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৫১.৬৯ শতাংশ; ২০১০ অর্থবছরে ৪৭.৩০ শতাংশ; ২০১৩ সালে ৪৫.১০ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ সালে ৪০.৬২ শতাংশতে নেমে এসেছে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৯)। এই ক্রমহ্রাসমান কৃষি শ্রমিকের জন্য ফসল উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রমিক স্বল্পতার অভাব দূর করা আবশ্যক। এছাড়াও জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে আকস্মিক বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মত দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। এর ফলে শস্যহানির ঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এ সকল সমস্যা উত্তরণে দেশে খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য।

বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার নিকট অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে বাজার মূল্যের ৬০ ভাগ ছাড়ে বারি ও ব্রি উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- হাইস্পিড রোটারি টিলার, বীজ বপন যন্ত্র, বেড প্লান্টার, জমি নিড়ানি যন্ত্র, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, শস্য মাড়াই যন্ত্র, ধান-গম কর্তন যন্ত্র ও শস্য ঝাড়াই যন্ত্র প্রদান করেছে। হাওড় ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় ৭০ শতাংশ ও অবশিষ্ট এলাকায় ৫০ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তা/ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে কম মূল্যে পাওয়ার টিলার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার টিলার চালিত সিডার, পাওয়ার থ্রেসার ও ফুটপাম্প কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদান করেছে যা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

কৃষি যন্ত্রের কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, মাঠ প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেকানিককে কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে সেই সাথে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুত কারকদেরও মানসম্পন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে দেশে জমি চাষ, আগাছা দমন, কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ এবং ফসল মাড়াই এর কাজে যথাক্রমে শতকরা ৯০, ৬৫, ৮০, ৯৫ এবং ৭০ ভাগ যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব হয়েছে। তবে চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, ফসল কর্তন, ফসল ঝাড়াই, ফসল শুকানো ও গুদামজাতকরণের ক্ষেত্রে এখনো তেমন যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব হয়নি।

সরকার করোনা ভাইরাসজনিত আপদকালীন সময়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং বোরো মৌসুমে বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশেষভাবে ধান কর্তনের সময় কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার যন্ত্র ব্যবহারের ফলে বোরোর সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে। করোনা পরবর্তী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের লক্ষ্য অর্জনে নিম্নরূপ কর্মকৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে:

১. সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ কৃষি কাজের বিভিন্ন স্তরে দেশীয় উপযোগী ও লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নের কাজ করা। এক্ষেত্রে চারা রোপন যন্ত্র, বীজ বপন যন্ত্র, শস্য কর্তন যন্ত্র, কম্বাইন হার্ভেস্টার, সুগারক্রপ প্লান্টার, হারভেস্টার ও ক্রাসার, শস্য শুকানো যন্ত্র, শস্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার ও সেন্সর বেইজ গবেষণার উপর জোর দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে রোবোটিক্স এর ব্যবহার প্রয়োজন হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি প্রকৌশল বিষয়ক সিলেবাস সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

২. দেশে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আমদানি নির্ভরতা হ্রাসকরণে দেশীয় কৃষি জমি উপযোগী খরচ সাশ্রয়ী যন্ত্র প্রস্তুতের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ ও শ্রম ও সময় সাশ্রয়ী কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, যন্ত্র ক্রয়ে মূলধন প্রাপ্তি সহজলভ্যকরণ এবং যন্ত্র প্রস্তুতকরণ শিল্প উদ্যোক্তাদের মূলধন সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা। ইঞ্জিন, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, চারা রোপণ যন্ত্র, রিপার ও কম্বাইন হার্ভেস্টার প্রস্তুতের জন্য নিজস্ব অথবা যৌথ উদ্যোগে দেশীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টির পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অনুকূল আমদানি ও রফতানি শুল্ক হার নির্ধারণ করা এবং পাশাপাশি আধুনিক কৃষি যন্ত্র প্রস্তুত সুবিধা সম্বলিত জোন ভিত্তিক হিট ট্রিটমেন্ট, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মেশিন সুবিধা সরকারিভাবে স্থাপন করা। বিভিন্ন এগ্রো ইকোলজিক্যাল জোনে মাঠ পরীক্ষণ ও যন্ত্রের ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধনের মাধ্যমে দেশীয় উপযোগী করে তা সম্প্রসারণ করা।

৩. ব্যাপক আকারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত/উন্নয়নকৃত দেশীয় প্রস্তুতকৃত ও আমদানিকৃত লাগসই কৃষি যন্ত্রের কার্যকারিতার মাঠ প্রদর্শনী, মাঠ দিবস, উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ, মেলা, কর্মশালা, কৃষকের অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রচার মাধ্যমে সম্প্রচার এবং কৃষক ও কৃষক সংগঠন এর মাঝে প্রচারপত্র বিলিকরণ কার্যক্রমসমূহ সরকারি সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিরবিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক কৃষি যন্ত্র জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা।

৪. দেশে প্রস্তুতকৃত ও আমদানিকৃত যন্ত্রের মান উন্নয়নের নিমিত্ত সরকারি ও বেসরকারিভাবে মান পরীক্ষা ও প্রত্যয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৫. কৃষি যন্ত্র ও প্রযুক্তি কৃষকের দোড় গোড়ায় পৌঁছানোর জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কৃষি প্রকৌশলীদের জন্য আলাদা উইং তৈরি করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ ও ভৌত সুবিধা বৃদ্ধি করা। একই সাথে নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমুহে জনবল বৃদ্ধি করে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা।

৬ কৃষক, চালক, মেকানিক, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, প্রস্তুতকারী, গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী ও নীতি নির্ধারকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কৃষি যন্ত্র ব্যবহার ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

৭. কৃষি যন্ত্র সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী চালু করা।

৮. জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষকের মালিকানাধীন জমি ক্রমশ: খণ্ড খণ্ড হয়ে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছে। পূর্ণ দক্ষতায় কৃষি যন্ত্র ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে নানাবিধ ও স্থানীয় উপযোগী কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে চাষযোগ্য জমির সমন্বয়, ফসলের সমন্বিত বপন ও কর্তন করা।

৯. যেসব এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-পরিস্থ সেচ পানির অপর্যাপ্ততা রয়েছে এবং বিভিন্ন কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে সেসব এলাকায় সমন্বিতভাবে সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা।

১০. দেশের কৃষি জমিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্র চলাচলের জন্য সমন্বিতভাবে সরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগে টেকসই রাস্তা তৈরি করা।

১২. দেশীয় কৃষি যন্ত্র প্রস্তুতকরণ শিল্প স্থাপনকারীদের এবং মাঠ পর্যায়ের যন্ত্র ক্রয়কারী কৃষক/উদ্যোক্তাদের সহজশর্তে ও সরকারি বিশেষ সুবিধার আওতায় ন্যুনতম সুদের হারে ঋণ প্রদান করা।

১৩. নিরাপদ কৃষি যন্ত্র চালনার জন্য প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা করা।

১৪. যন্ত্রনির্ভর আধুনিক ও ঝুঁকিমুক্ত পেশা হিসাবে গড়ে তুলতে কৃষি যন্ত্রের সংশ্লিষ্ট চালক, কৃষি যন্ত্র সেবাপ্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বীমা চালু করা।

উল্লেখিত কর্মকৌশল যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত হবে। ফলে করোনা মহামারীর কারণে কৃষি ক্ষেত্রে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনসহ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হবে।

লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কৃষি প্রকৌশল), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ঢাকা

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত