সম্প্রতি তানভীর তারেকের সঞ্চালনায় ‘গৃহসন্ধি আড্ডা’ অনুষ্ঠানে বরেণ্য গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দকে উত্সর্গ করে এক আলোচনার আয়োজন করা হয়। সে পর্বে শমী কায়সার তার দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি থেকে উল্লেখ করেন সদ্যপ্রয়াত এই গুণী মানুষটিকে। ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য আজ তা গ্রন্থিত হলো—
দু’জন মানুষের মৃত্যু আমার ব্যক্তিজীবন ও অভিনয়জীবন নিয়ে ভাবিয়েছে। প্রথমজন সেলিম আল দীন। সেলিম আল দীন যেদিন মারা যান, তার ১ বছর আগে ঢাকা থিয়েটারে দেখা। তিনি বললেন, ‘শমী তোমার ওপর আমার ভীষণ রাগ, কেন যে মঞ্চে অভিনয়টা করলে না তুমি? অথচ আরও কতকিছু করতে পারতে!’
তার মৃত্যুর পরেই মনে হলো যে, আমার মঞ্চে কাজ করার উচিত এবং তার পরপরই ‘যৈবতি কন্যার মন’ মঞ্চে এলো। কয়েকটা শো হলো। অনেকগুলো বছর পরে আমি মঞ্চে কাজ করলাম।
আর দ্বিতীয় গভীর শোকের নাম মোস্তফা কামাল সৈয়দ। বছর তিনেক আগে এনটিভি ভবনে একটা কাজে এসেছিলাম ভিন্ন একটি অফিসে। কাজ শেষে বের হয়েছি মাত্র। দেখি মোস্তফা কামাল আংকেলও নামছেন। তিনি প্রথমে আমাকে খেয়াল করেননি। আমিই তার কাছে দৌড়ে গেলাম। আমাকে দেখে বললেন, ‘শমী তুমি এত বড় বড় জায়গায় কাজ করছো। আমার খুবই ভালো লাগে। আবার খারাপ লাগে যে, তুমি অভিনয়টা আর করলে না। তুমি অভিনয়টা করো।’
এই যে এভাবে অভিনয়ের জন্য মঞ্চে বা টিভিতে এই দুটো মানুষই আমাকে খুব বলতেন। কামাল আংকেল বললেন, ‘শমী, তুমি কী জানো তোমার অভিনয় এখনও কত মানুষ দেখতে চায়! অন্তত আমার জন্য হলেও আরেকটা করো।’
আহা! কী সস্নেহ উপদেশ আমার জন্য! এটা একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা।
মোস্তফা কামাল সৈয়দ আসলে এনটিভির আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনেই তিনি ছিলেন আমার আমাদের কাছে ঈশ্বরের কাছাকাছি মানুষ। তার ব্যক্তিত্ব, কাজের দর্শন এসব কিছুর মোহমুগ্ধতায় আমি, বিপাশাসহ আমাদের সমসাময়িকরা মুগ্ধ থাকতাম। হয়তো অনেকের মনে আছে, আগে বিটিভি থেকে টিভি গাইড বের হতো। এই প্রকাশনীটা খুব জনপ্রিয় ছিল। আমি কালেক্ট করতাম। সেখানে ছোট ছোট করে নাটকের নাম নির্মাতার পাশে অভিনয় কলাকুশলীদের নাম ছাপা হতো। খুবই ইচ্ছে ছিল মোস্তফা কামাল সৈয়দ আংকেলের কোনো প্রযোজনায় কাজ করার। সেই গাইডে নির্মাতা মোস্তফা কামাল সৈয়দের পাশে শিল্পী হিসেবে আমার নামটিও ছাপা হবে! কারণ তখন দেখতাম তার নাটকে আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফারা কাজ করতেন।
একজন মোস্তফা কামাল সৈয়দের যে অবয়ব, কথাবার্তা, পরিপাটি পোশাক, সবকিছুই অনুকরণীয়। আমি বলবো একেবারে চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ এবং কোন বিষয়ে তিনি খোঁজ রাখতেন না? রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা আর সংস্কৃতি অঙ্গনে তো তিনি ছিলেন আমাদের সুখপাঠ্যের মতো। অথচ আমার আক্ষেপের একটা জায়গা হলো—সেই মানুষটির সঙ্গে বিটিভিতে কোনো কাজ হলো না। শেষ অবধি তার সঙ্গে কাজ হলো এনটিভিতে এসে।
আমার সঙ্গে বিটিভির করিডোরে দেখা হতো কথা। বলতেন, ‘শমী, আমি ভাবছি তোমাকে নিয়ে।’ আমি বলতাম, ‘আমিও অপেক্ষায় আছি কবে আপনার ক্যামেরার সামনে আমি দাঁড়াবো।’
আমার সেই আক্ষেপটা রয়েই গেল। এরপর অনেক অভিমানেই আর কাজ করা হয়নি। টিভি নাটক থেকে সরে এসেছি। আর আমাদের দেশে তো এক ধরনের বাজে সংস্কৃৃতি ছিল যে, শিল্পীদেরও কালো তালিকা করা। তো বিএনপি আমলে কামাল আংকেল কিন্তু আমার জন্য এনটিভিতে ফাইট করলেন। তিনি বললেন, ‘শমীর মতো এত মেধাবী অভিনেতা আমাদের প্রয়োজন। এ রকম একজন প্রথমসারির অভিনেত্রীকে ব্ল্যাক লিস্টেড করার কোনো মানে নেই। ওকে লাগবে আমাদের।’
মানুষটার কাছে তাই এসব স্মৃতিঋণ অমূল্য। এগুলো অনেক বড় আশীর্বাদ আমার কাছে। এরপর এনটিভির সকল কর্মকর্তারা আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘আপনি অভিনয় শুরু করেন।’ আমি বললাম, ‘না, আমি অভিনয়ের বাইরে কিছু করতে চাই।’ সেই বছর ৮ মার্চে কামাল আংকেলকে বললাম, ‘আমি নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কিছু করতে চাই।’ তখন বললেন, ‘তাহলে একটা নাম ঠিক করো।’ নাম চূড়ান্ত হলো ‘জয়িতার জয়যাত্রা।’ আমি বলবো ২০০৪ সালে সেটা ছিল আমার আরেকটা টার্নিং পয়েন্ট এবং এই শো’টার কথা অনেকেরই মনে থাকবে। মনে আছে প্রথম পর্বটি করা হয়েছিল আইন পেশায় সফল নারীদের নিয়ে। কামাল আংকেলই বলেছিলেন,‘ তুমি একটা পেশা বাছাই করো এবং সেই পর্বে তারানা আপাও এসেছিলেন।’
এমন টুকরো টুকরো অনেক দামি দামি স্মৃতি আমার কামাল আংকেলকে নিয়ে। শুধু এটুকু বলতে চাই—কামাল আংকেল জানতেন কখন কাকে কোথায় কোনটা করানো উচিত। এই যে সময় ও পরিমিতি বোধের সমন্বয় এটা কিন্তু সবাই পারেন না। কামাল আংকেল ছিলেন এমন এক দৃঢ় ব্যক্তিত্বের সফল মানুষ।
সবাই কিন্তু সবার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ নন। কিন্তু একজন মোস্তফা কামাল সৈয়দ অনেকের জীবন, ক্যারিয়ারের জন্য ভীষণ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কর্মজীবনে অনন্য উচ্চতার সফল মানুষের বেলাতেই এসব ঘটনা ঘটে। তাই একজন মোস্তফা কামাল সৈয়দকে হারানো মানে আমাদের সংস্কৃৃতি জগতের এক বড় হাহাকারের জায়গা তৈরি হওয়া। আর নিজের দিক থেকে বললে বলতে হয় কামাল আংকেলের মৃত্যু আমার জীবনের গভীর এক ক্ষতের নাম। বিরহী স্মৃতিবেলার নাম। বিনম্র শ্রদ্ধা। আংকেলে আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। ভালো থাকবেন আপনি।
লেখক:বরেণ্য অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও নারী উদ্যোক্তা

