বাতাসের মান নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় গত সোমবার (১৯ নভেম্বর) থেকে এক নম্বরে রয়েছে ঢাকা। এয়ার ভিজ্যুয়ালের তথ্য অনুযায়ী গত মঙ্গলবার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) ঢাকার স্কোর ২১২, যা ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’। আর দিল্লির স্কোর ১৯৬, যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে। উল্লেখ্য, প্রতিদিনের বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা একিউআই সূচক একটি শহরের বাতাস কতটুকু নির্মল বা দূষিত সে সম্পর্কে তথ্য দেয় এবং তাদের জন্য কোন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে তা জানায়। একিউআই সূচকে ৫১ থেকে ১০০ স্কোর পাওয়ার মানে হলো বাতাসের মান ‘গ্রহণযোগ্য’। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর পাওয়ার অর্থ হচ্ছে বাতাসের মান ‘দূষিত’। দীর্ঘদিন ধরেই দূষিত বাতাস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা। শুষ্ক মৌসুমে এই শহরে বায়ুদূষণ চরমে উঠলেও বর্ষায় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা উল্লেখযোগ্য। ধুলার কারণে এই দূষণের মাত্রা এখন আরো ভয়াবহ। মাত্রাতিরিক্ত ইটভাটা, যানবাহন, নির্মাণকাজ ও কলকারখানার ধোঁয়ার কারণে ঢাকা শহরের প্রায় দেড় কোটি মানুষ এক অবিশ্বাস্য বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে বাস করছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা গত ১০ বছরে ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা কমানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সম্প্রতি (গত এক সপ্তাহে) একাধিকবার বায়ুদূষণে বিশ্বের এক নম্বর শহরের জায়গা দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। পরিস্থিতি দিনে দিনে ভয়াবহ হচ্ছে। এখন ঢাকা শহরের বাতাস সবচেয়ে বেশি দূষিত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গড় বায়ুদূষণের পরিমাণ ৯৭ দশমিক ১০, যেখানে পাকিস্তানের ৭৪ দশমিক ২৭, ভারতের ৭২ দশমিক ৫৪, আফগানিস্তানের ৬১ দশমিক ৮০ এবং বাহরাইনের ৫৯ দশমিক ৮০ পিএম২.৫। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায়, ২৪ নভেম্বর ঢাকার বায়ুর মান ছিল ২৯৮, যা খুবই অস্বাস্থ্যকর।
ঢাকা সিটিতে বায়ুদূষণের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। ইউটিলিটি সার্ভিসের কাজের জন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। এলিভেটেট এক্সপ্রেস-হাইওয়েসহ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ভবন নির্মাণের সময় পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র ফেলে না রাখা এবং এগুলো নির্ধারিত বেষ্টনীর মধ্যে আছে কি না, সেটি দেখতে হবে।
গত ৩ মার্চ বিশ্বের বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের বিশ্ব বায়ু মান প্রতিবেদন-২০১৮ অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের কবলে থাকা রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। ঢাকা শহরের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বেঁধে দেওয়া মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের মতে, বায়ুদূষণ মোকাবিলার প্রথম কাজ হচ্ছে দূষণের উত্স বন্ধ করা। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং জলাশয়গুলো রক্ষা করা। এই দূষিত বায়ুর মাধ্যে নগরের মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে, সেই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তবে সবার আগে বায়ুদূষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে দেখতে হবে।
চুলায় প্রাকৃতিক গ্যাস বা কাঠ পোড়ানোর সময় পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে তা ভালোভাবে পোড়ে না। ফলে কার্বন মনো-অক্সাইড উত্পন্ন হয়। উত্পন্ন কার্বন মনো-অক্সাইড বেশ বিষাক্ত। কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোই বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির কারণ। আবার কয়লা পোড়ালে এতে মিশে থাকা সালফার পুড়ে বায়ুতে সালফারের অক্সাইড উত্পন্ন হয়। সালফারের অক্সাইড বৃষ্টির পানিতে মিশে বৃষ্টির পানিকে অ্যাসিডযুক্ত করে। অ্যাসিডযু্ক্ত বৃষ্টি সব জীবের জন্য ক্ষতিকর। যারা ধূমপান করে, তাদের বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া বায়ুকে দূষিত করে। এতে অন্য মানুষেরও ক্ষতি হয়। বিশেষ করে কেউ বদ্ধ ঘরে ধূমপান করলে সেই ঘরে থাকা মানুষের আরো বেশি ক্ষতি হয়। বায়ুদূষণের প্রধান উত্সসমূহ হচ্ছে গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, বিদ্যুত্ ও তাপ উত্পাদনকারী যন্ত্র থেকে উত্পন্ন ধোঁয়া, শিল্পকারখানা এবং কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট ধোঁয়া। বায়ুদূষণের আরো একটি কারণ অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তরে ক্রমবর্ধমান ফাটল সৃষ্টি হওয়া। মানব জাতি, উদ্ভিদরাজি, পশুপাখি এবং জলজ প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর অ্যাসিড বৃষ্টি সংঘটনের মাধ্যমেও বায়ুদূষণ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে আসছে।
এসব দূষক মাথাধরা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি করছে। ধূলিকণা থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণ হাঁপানিসহ শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য রোগ সৃষ্টি করে থাকে। বায়ুদূষণের কারণে সর্বাধিক ক্ষতির শিকার হয় শিশুরা। বায়ুতে অতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি শিশুদের মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। প্রতি বছর ঢাকা মহানগরীর বায়ুতে প্রায় ৫০ টন সিসা নির্গত হচ্ছে। শুষ্ক ঋতুতে, অর্থাত্ নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে বায়ুতে সিসার পরিমাণ সর্বোচ্চে পৌঁছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে সম্প্রতি শিশুদের দেহে সিসাদূষণের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষাকৃত শিশুদের রক্তে প্রায় ৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল থেকে ১৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল সিসা পাওয়া গিয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৭ থেকে ১৬ গুণ বেশি। অন্নদিকে বায়ুদূষণের কারণে উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোকের ঝুঁকি, শুক্রাণুর ক্ষতি, কিডনির রোগ, জন্মগত ত্রুটি, হাড়ের ঘনত্ব কমে ফ্র্যাকচার হওয়া, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব, হার্ট অ্যাটাক ইত্যাদি রোগ দেখা দিতে পারে। আবার যক্ষ্মা ও বসন্ত রোগীদের হাঁচি-কাশি থেকে জীবাণু মিশে বায়ুকে দূষিত করে। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেললে এবং পায়খানা-প্রস্রাব করলে বায়ুতে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এভাবেও বায়ু দূষিত হয়। আবার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি বানানোর সময় ছোটো ছোটো ধূলিকণা বায়ুতে মিশে দূষিত করে। দূষিত বায়ু মানুষের শ্বাসকার্যে ব্যাঘাত ঘটায় এবং দেহে নানা রোগ সৃষ্টি করে। দূষিত বায়ুর কারণে মানবদেহে এলার্জি, কাশি, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, উচ্চরক্তচাপ, মাথাব্যথা, ফুসফুসে ক্যানসার ইত্যাদি মারাত্মক রোগ হতে পারে। আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যত্। তাই আগামী দিনের ভবিষ্যেক বাঁচাতে হলে দূষণের কবল থেকে বাঁচাতে হবে পরিবেশকে।
n লেখক :ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

