অকৃত্রিম সৌন্দর্যের এক অপার ক্ষেত্র আমাদের এই বাংলাদেশ। এ দেশের প্রতি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে পর্যটনের নানা উপাদান। তেমনি এক বিচিত্র সুন্দর স্থান বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল। সিলেটকে বলা হয়ে থাকে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। মূলত বিস্তীর্ণ সবুজ মনোরম চা-বাগানের জন্য এই উপাধি পেয়েছে সিলেট। এই জেলার যেদিকে চোখ যাবে, সেদিকেই দেখা যাবে সবুজে ঘেরা চা-বাগান। তাছাড়া ছোটোবড়ো পাহাড়-টিলা, হাওর, নদী, বনাঞ্চল, ঝরনার এক অপরূপ সমারোহ আমাদের এই সিলেট অঞ্চল।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত জেলা সিলেট। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২৭৮ কিলোমিটার দূরে সিলেটের অবস্থান। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর সিলেটের পর্যটন। এই শহরে রয়েছে উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহত্ মালনীছড়া চা-বাগান। এই অঞ্চলে আসা পর্যটকদের মন জুড়ায় সৌন্দর্যের রানি খ্যাত জাফলং, নীলনদ খ্যাত স্বচ্ছ জলরাশির লালাখাল, পাথর-জলের মিতালীতে বয়ে যাওয়া বিছনাকান্দির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, পাহাড় ভেদ করে নেমে আসা পাংথুমাই ঝরনা, সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল, ‘মিনি কক্সাবাজার’ হাকালুকি ও কানাইঘাটের লোভাছড়ার সৌন্দর্য।
চারপাশে সবুজের সমারোহ, নীল আকাশের নিচে যেন সবুজ গালিচা পেতে আছে সজীব প্রকৃতি, সঙ্গে উঁচু-নিচু টিলা এবং টিলাঘেরা সমতলে সবুজের চাষাবাদ। আর এই সবুজ গালিচাই হলো সিলেটের চা-বাগান। সিলেটের চা-বাগানের খ্যাতি রয়েছে সারা বিশ্বে। দেশের মোট চায়ের ৯০ শতাংশই উত্পন্ন হয় সিলেটে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অন্য এক ভালো লাগার ধারক হয়ে আছে সিলেটের চা-বাগান। বাংলাদেশের মোট ১৬৩টি চা-বাগানের মধ্যে ১৩৫টি রয়েছে বৃহত্তর সিলেটে। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট সদর উপজেলায় রয়েছে বেশ কয়েকটি চা-বাগান। চা-বাগানে বসে একটি দিন প্রকৃতির সঙ্গে যে কীভাবে কেটে যাবে, তা টের পাওয়া যাবে না।
সিলেটের পর্যটনের কথা এলে প্রথমেই যে নামটি চলে আসে, তা হলো জাফলং। জাফলং হলো সিলেট বিভাগের একটি হিল স্টেশন এবং অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। সিলেট শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রে সড়কপথে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী খাসিয়া পাহাড়ের কোলে মারি নদীর পাশে অবস্থিত পাহাড়, সবুজ বন ও বাগানের সৌন্দর্যঘেরা একটি পাহাড়ি অঞ্চলের নাম জাফলং। হিমালয় থেকে সৃষ্ট মারি নদী এখানে প্রচুর পরিমাণে পাথরখণ্ড বয়ে নিয়ে আসে। চা-বাগান এবং পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পাথরের বিরল সৌন্দর্যের দেখা মিলবে এখানে।
দেশের একমাত্র এবং বিশ্বের অন্যতম জলাবনের নাম রাতারগুল। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল বন। পর্যটকদের কাছে এটা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট নামেও পরিচিত। প্রায় ৩০ হাজার ৩২৫ একর জায়গা নিয়ে এই বনাঞ্চল গঠিত। রাতারগুল একটি প্রাকৃতিক বন। এরপরও বন বিভাগ হিজল, বরুণ, করচ, মুতাসহ কিছু জলবান্ধব জাতের গাছ লাগিয়ে দেয় এই বনে। এছাড়া রাতারগুলের গাছপালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কদম, জালিবেত, অর্জুনসহ জলসহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছপালা। তাইতো রাতারগুল সিলেট অঞ্চলের সুন্দরবন নামে খ্যাত। ভরা বর্ষায় স্থানীয় হস্তচালিত ডিঙি নৌকায় চড়ে রাতারগুল জলাবনে ঘুরে বেড়ানোর মধুর স্মৃতি ভোলা যাবে না সহজে।
সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুর উপজেলায় স্বচ্ছ নীল পানির নদী ‘লালাখাল’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। প্রকৃতিকে একান্তে অনুভব করার জন্য স্থানটি বেশ উপযোগী। পাহাড়ে ঘন সবুজ বন, নদী, চা-বাগান ও নানা জাতের বৃক্ষের সমাহার লালাখাল জুড়ে। পানি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা একজন পর্যটককে দেবে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। বেশির ভাগ পর্যটক লালাখাল ভ্রমণের জন্য নদীপথ ব্যবহার করে থাকে। নৌপথে যেতে যেতে যেদিকে চোখ যায়, মুগ্ধতায় নেমে আসে কিছুক্ষণের জন্য।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত বিছনাকান্দি মূলত জাফলংয়ের মতোই একটি পাথরকোয়ারি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই পাশ থেকে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। পাহাড়ের খাঁজে রয়েছে সুউচ্চ ঝরনা। ভ্রমণবিলাসীদের জন্য এই স্পটের মূল আকর্ষণ হলো পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানির প্রবাহ। তাছাড়া বর্ষায় থোকা থোকা মেঘ আটকে থাকে পাহাড়ের গায়ে, মনে হতে পারে মেঘেরা পাহাড়ের কোলে বাসা বেঁধেছে।
পাংথুমাই সিলেটের আরেকটি প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয়ের কোলে এক অসম্ভব সুন্দর গ্রাম পাংথুমাই। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পানথুমাই গ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম। মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি পাহাড়, ঝরনা, ঝরনা থেকে বয়ে আসা পানির স্রোতধারা আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ভূমির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনাচার—সবকিছু মিলে এক অনন্য পর্যটনকেন্দ্র এই পাংথুমাই। পাহাড়ঘেঁষা আঁকাবাঁকা রাস্তা পানথুমাই গ্রামের বৈশিষ্ট্য। গ্রামের শেষে পাহাড়ি গুহা থেকে হরিণীর মতোই উচ্ছল ভঙ্গিমায় ছুটে চলেছে ঝরনার জলরাশি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাধারাটি স্থানীয়ভাবে মায়ামতি ও ফাটাছড়া ঝরনা হিসেবে পরিচিত। আর পর্যটকদের কাছে জলপ্রপাতটির পরিচিতি পাংথুমাই ঝরনা নামে।
সমগ্র সিলেট অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে আছে ছোটো-বড়ো অসংখ্য হাওর। এর মধ্যে হাকালুকি হাওর উল্লেখযোগ্য। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলা নিয়ে সিলেটের সর্ববৃহত্ হাওর হাকালুকি। সমগ্র বর্ষাকালে হাকালুকি হাওরকে সাগরের মতো মনে হয় এবং এর মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলোকে মনে হয় একেকটা ছোট্ট দ্বীপ। বছরের প্রায় সাত মাস হাওর এলাকা পানির নিচে অবস্থান করে এবং যাতায়াতের জন্য নৌকাই গ্রামগুলোর প্রধান বাহন। হাকালুকি হাওরে ৮০টি ছোটো এবং ৯০টি মাঝারি ও বড়ো বিল রয়েছে। শীতকালে এসব বিলে অতিথি পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। সারা দেশ থেকে হাজারো পর্যটক ছুটে আসে পাখিদের এই মিলনমেলা দেখতে। শীতের হাকালুকি যেন এক অন্য জগত্, মনোলোভা দৃশ্য দেখে মন হারিয়ে যায় এক পলকে। শীতের প্রকোপ যতই বাড়তে থাকে, অথিতি পাখির আসার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিশাল এলাকা জুড়ে শুধুই কিচিরমিচির আর নানান রঙের ডানা ঝাঁপটানোর দৃশ্য আর হাওড়ের মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো বিলে শাপলা আর পদ্মের বাগান যেন কেউ সাজিয়ে রাখে পর্যটকদের জন্য।
সিলেট জেলায় পর্যটন সম্ভাবনা অপরিসীম। তবে এখনো কিছু কিছু স্থানে যোগাযোগব্যবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। এ কারণে পর্যটকদের পড়তে হয় নানাবিধ দুর্ভোগে। এখানের সব কয়টি পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের রাস্তাঘাট আরো প্রশস্ত ও সুগম হওয়া উচিত। নির্বিঘ্নে পর্যটনকেন্দ্রে বিচরণ করার ব্যবস্থা করে পর্যটকদের নিরাপত্তা আরো বৃদ্ধি করা গেলে সিলেট হয়ে উঠতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকের স্বর্গরাজ্য। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সিলেটের স্থানীয় প্রশাসনের সঠিক পরিকল্পনা সিলেটকে এনে দিতে পারে পর্যটনশিল্পে গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপি খাতে পর্যটনশিল্পের মোট অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। আর এই খাতে কর্মস্থান তৈরি হয়েছে মোট ২৪ লাখ ৩২ হাজার। সুতরাং এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় আমাদের দেশ পর্যটনশিল্পে কতটা পিছিয়ে আছে। মূলত সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচারণার অভাব এই সম্ভাবনার খাতটিকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমান সময়কে বলা হয় বিশ্বায়নের যুগ। এই যুগে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন ক্রেতার চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ করা। আর এজন্য প্রয়োজন সঠিক তথ্যের। কিন্তু আমাদের দেশ পর্যটনক্ষেত্রে তথ্য ব্যবস্থাপনায় বেশ পিছিয়ে আছে। এমনকি বাংলাদেশ প্রতি বছর ভ্রমণের জন্য কী পরিমাণ বিদেশি পর্যটক আসে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। ফলে তাদের আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ ও সঠিক চাহিদা নিরূপণ করা যায় না, যা আমাদের অনেকখানি পিছিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বের মোট পর্যটকের প্রায় ৫০ শতাংশ ভ্রমণ করে ইউরোপে। আর প্রায় ২৫ শতাংশ ঘুরতে আসে এশিয়ায়। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যটক ভ্রমণ করবে এশিয়া মহাদেশে। তাই তো আমাদের লক্ষ্য ও সমস্ত কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা উচিত কীভাবে আমরা নিজেরদের প্রস্তুত করব ভবিষ্যতের জন্য। পর্যটনের যে বিপুল সম্ভাবনা এই অঞ্চলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, তার থেকে কীভাবে আমরা লাভবান হব, তা ঠিক করার এখনই উপযুক্ত সময়। আর এ জন্য পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পক্ষকে নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে।
n লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

