ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬
২১ °সে

জেলে খালেদা জিয়া কেমন আছেন?

জেলে খালেদা জিয়া  কেমন আছেন?

বিএনপির দুই কাণ্ডারি বেগম খালেদা জিয়া জেলে এবং তারেক রহমান বিদেশে কেমন আছেন? প্রশ্নটা উঠত না, যদি দলটি তাদের নেত্রী জেলে গুরুতর অসুস্থ—এই ধুয়া তুলে হুমকি না দিত যে, তারা একদফা অর্থাত্ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে অবিলম্বে আন্দোলন করবে। খালেদা জিয়া এখন অবশ্য জেলে নেই। গত আট মাস ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন।

বিএনপি তার মুক্তি দাবিতে আন্দোল করবে বলে শাসাচ্ছে। কারণ, এটা ছাড়া তাদের হাতে আন্দোলন করার আর কোনো ইস্যু নেই; কিন্তু এই ইস্যুতেও তারা আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারেনি। ভবিষ্যতে পারবে মনে হয় না। গত সাধারণ নির্বাচনে তারা খালেদা জিয়ার মুক্তিকে একটা ইস্যু করেছিল। হুমকি দিয়েছিল, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া না হলে তারা নির্বাচনে যাবে না। সরকার খালেদাকে মুক্তি দেয়নি। কারণ, তিনি রাজনৈতিক বন্দি নন, দুর্নীতির মামলায় আদালতের রায়ে বন্দি। এভাবে তাকে মুক্তি দেওয়া যায় না।

নির্বাচনের সময় বিএনপি ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, এমনকি কাদের সিদ্দিকীকে দলে টেনে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কথা বলিয়েছে। কাদের সিদ্দিকী তো এমন কথা বলেছিলেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি নিজে জেলে গিয়ে তার পুতুলভাবির হাতকড়া খুলে (যদিও বেগম খালেদাকে হাতকড়া পরানো হয়নি) মুক্ত করে আনবেন। আমাদের ‘বঙ্গবীরও’ এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেননি। নির্বাচনে পরাজয়ের পর ঐক্যফ্রন্ট থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন।

মিথ্যা প্রোপাগান্ডা দ্বারা কখনো রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করা যাবে না। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, জন্ম থেকেই বিএনপি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ও ইতিহাস-বিকৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। দেশের মানুষ জানে বেগম জিয়া অসুস্থ; কিন্তু গুরুতর অসুস্থ নন। জেল গমনের আগে থেকেই তিনি অসুস্থ এবং তার চিকিত্সা চলছিল। জেলে গমনের পরই তার অধিকতর উন্নত চিকিত্সা চলছে এবং সেটা চলছে সরকারি খরচে। জেলে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বড়ো কিছু হারাননি। দুই হাঁটুতেই অপারেশনের পরও আর্থ্রাইটিসের প্রকোপ কমেনি। হাঁটাচলা করতে না পারায় বলতে গেলে গৃহবন্দি ছিলেন। তবে সেখানে যখন খুশি যেখানে সেখানে যাওয়ার, যা কিছু বলার স্বাধীনতা তার ছিল। সেটা তিনি হারিয়েছেন।

কিন্তু গত প্রায় দুই বছর জেলে না থেকে বাইরে থাকলে ২০১৮ সালের নির্বাচন-পূর্ব এবং নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক ঝড়ঝামেলা এই বয়সে এবং এই অসুস্থতা নিয়ে কতটা সামলাতে পারতেন তা সন্দেহের বিষয়। পুত্র তারেকের সঙ্গে মাতার মতপার্থক্য ক্রমশ বাড়ছিল বলে বিএনপির সূত্র থেকেই জানা যাচ্ছিল। এটা আরো বেড়ে বিএনপির জন্য রাজনৈতিক সংকট ডেকে আনত। খালেদা জেলে যাওয়ায় মাতা-পুত্রের বিরোধের বিষয়টি সামনে থেকে সরে গেছে। মাতার মুক্তির দাবিটি তারেক ও দলের সামনে চলে এসেছে।

জেলে খালেদা জিয়া ভালোই আছেন। তার চিকিত্সকেরাই বলছেন, স্বাধীনভাবে চলাচল ও কথা বলার সুযোগ হারানোর দরুন যে মানসিক অস্বস্তি ও হতাশা দেখা দেয়, তা বিএনপি নেত্রীর মধ্যেও দেখা দিয়েছে এবং বাড়ছে। এছাড়া তার শারীরিক অসুস্থতা আগে যা ছিল এখনো তাই আছে। মাঝে মধ্যে কমে-বাড়ে, তবে গুরুতর কিছু নয়। বিএনপি বানিয়ে মিথ্যা প্রচার করতে গিয়ে দেশবাসীর মনের আস্থা হারিয়েছে। গুরুতর অসুস্থতার বানানো গল্প না ফেঁদে তারা যদি বলতেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলো বানানো ও মিথ্যা এবং সেজন্য তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে তাকে মুক্তি দিতে হবে—তাহলে তারও একটা অর্থ থাকত।

বাংলাদেশে বড়ো বড়ো রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে স্বাধীনতার আগে থেকেই ‘গুরুতর অসুস্থতা’কে কাজে লাগাবার যে চেষ্টা হয়েছে খালেদা জিয়া পর্যন্ত এসে সেজন্যই তা জনমনে গুরুত্ব হারিয়েছে। একটা উদাহরণ দেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার গোড়ার দিকে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে জাদুমিয়া, কাজী জাফরদের উসকানিতে মওলানা ভাসানী কী একটা দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন। বৃদ্ধ বয়সে মওলানা ভাসানী অনশন করায় বঙ্গবন্ধু উদ্বিগ্ন হন এবং ডা. নূরুল ইসলামকে মওলানা সাহেবের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য পাঠান। অন্যদিকে ভাসানী ন্যাপের নেতা বলে পরিচিত জাদু মিয়া, কাজী জাফর, আনোয়ার জাহিদ মিলে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে (পরে যিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন) মওলানার স্বাস্থ্য পরীক্ষক নিযুক্ত করেন।

ডা. বদরুদ্দোজা তখনই ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের ঘোর বিরোধী এবং ভাসানী ন্যাপের সমর্থক। তিনি এবং ডা. নূরুল ইসলাম স্বতন্ত্রভাবে মওলানার স্বাস্থ্য পরীক্ষার বুলেটিন প্রকাশ করতেন। বিস্ময়ের কথা, ডা. বদরুদ্দোজার রিপোর্টে বলা হতো—মওলানা ভাসানীর দেহের ওজন দ্রুত কমছে এবং তার অসুস্থতা গুরুতরভাবে বাড়ছে। বলা বাহুল্য, এই বয়োবৃদ্ধ নেতা সর্দি-কাশি ও হাঁপানিতে আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন।

ডা. নূরুল ইসলাম তার বুলেটিনে বলেছেন, ‘মওলানা সাহেবের দেহের ওজন স্বাভাবিক আছে। তার অসুস্থতা বাড়েনি।’ ডা. নূরুল ইসলাম ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী দুই জনেই দেশের বরেণ্য চিকিত্সক। মানুষ কার কথা বিশ্বাস করবে? তবে ডা. নূরুল ইসলাম ছিলেন রাজনীতি-নিরপেক্ষ চিকিত্সক এবং ডা. বি. চৌধুরী ছিলেন আওয়ামী লীগের ঘোর বিরোধী এবং তখন ভাসানী-ন্যাপ সমর্থক চিকিত্সক।

ফলে মওলানা ভাসানীর অনশনকালীন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ডা. চৌধুরীর বুলেটিন সাধারণ মানুষের কাছে এতটা গুরুত্ব পায়নি, যতটা পেয়েছে ডা. নূরুল ইসলামের বুলেটিন। জনসমর্থনের অভাবে মওলানা ভাসানীও অনশন অব্যাহত রাখতে না পেরে কয়েক দিনের মধ্যে এক রিকশাওয়ালার হাতে সরবত খেয়ে অনশন ভঙ্গ করেন। বর্তমানেও বেগম খালেদা জিয়ার যেসব ডাক্তার চিকিত্সা করছেন, তাদের কেউ কেউ সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সক হলেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তারা কেন বিএনপি নেত্রীর অসুস্থতা সম্পর্কে মিথ্যা রিপোর্ট দেবেন? বরং বলা চলে বিএনপিই টাকাপয়সা ছড়িয়ে তাদের পছন্দসই চিকিত্সক এনে জেলে বন্দি খালেদা জিয়ার স্বার্থ সম্পর্কে তিলকে তাল করছেন।

জেলে অথবা বন্দি অবস্থায় হাসপাতালে থাকাকালেও বেগম খালেদা জিয়া যে ট্রিটমেন্ট পাচ্ছেন, অতীতে কোনো পপুলার রাজনৈতিক নেতা, যেমন মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবও সেই ট্রিটমেন্ট পাননি। মওলনা ভাসানী এবং শেখ সাহেবকেও তৃতীয় শ্রেণির কয়েদিদের সঙ্গে থাকতে হয়েছে। শেখ সাহেবকে তো পাগলা গারদের পাশে কনডেম সেলেও রাখা হয়েছিল। জেলকক্ষে এয়ারকন্ডিশন, টেলিফোন, টেলিভিশনের সুযোগ পাওয়া তো ছিল রাজনৈতিক বন্দি হিসেবেও কোনো রাজনৈতিক নেতার পক্ষে স্বপ্নেরও অগোচর।

কিন্তু দুর্নীতি মামলার আসামি হয়েও জেলে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ এসব সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। বেগম জিয়া অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছেন নিজের পরিচারিকা সঙ্গে রাখার। তারপরও বিএনপির চিত্কার থামছে না। তারা নেত্রীর মুক্তি চান ভালো কথা; কিন্তু তাদের নেত্রী জেলে গুরুতর অসুস্থ, তাকে ভালো ট্রিটমেন্ট করা হচ্ছে না বলে মিথ্যা প্রচারণা চালান কীভাবে? ফলে তাদের জনসমর্থন বাড়ছে না।

বিএনপির এক নেতা বলেছেন, দেশের মানুষ একদিন জেলের তালা ভেঙে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনবে। এটা দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি জেলে ছিলেন দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত অপরাধী হিসেবে নয়, জননন্দিত রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে। তারপরও তাকে কখনো কখনো থার্ডক্লাস সেলে, কনডেম সেলে এবং পাগলাগারদের পাশে রাখা হয়েছে। দেশের মানুষ তার মুক্তির দাবিতে শুধু গণঅভ্যুত্থান ঘটায়নি, জেলের তালা ভেঙে তাকে মুক্ত করে এনেছে।

এর পাশাপাশি বেগম জিয়া দুর্নীতির দায়ে আদালত কর্তৃক দণ্ডিত বন্দি। তার ওপর জেলেও থাকার ও চিকিত্সার অভাবনীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। এই অবস্থায় তার মুক্তির দাবিতে মানুষ কি আন্দোলন করবে, না জেলের তালা ভেঙে তাকে মুক্ত করবে? এটা কি বিএনপি নেতাদের দিবাস্বপ্ন নয়?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, খালেদা জিয়া জেলে রাজার হালে আছেন। তার হাঁটাচলার শক্তি না থাকায় কে তার হুইলচেয়ার ঠেলে তিনি তারও নাম উল্লেখ করেছেন। এই ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে জানাই, জেল জেলই। তাতে যতই সুযোগ-সুবিধা থাকুক, মানুষ চলাফেরা, কথা বলার স্বাধীনতা হারিয়ে সুখী থাকে না। দ্বিতীয়ত কে বা কারা বেগম জিয়ার হুইলচেয়ার ঠেলত, তার উল্লেখ না করলে তার মহত্ত বাড়ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সেনা-শাসকেরা এক গোপন জেলে বন্দি রেখেছিলেন, বাইরের লোক তার খবর জানত না, তখন এক ফরাসি সাংবাদিক জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু কোথায়? ইয়াহিয়া ধৃষ্টতার সঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তানের সব চোর-ডাকাত কোন জেলে আছে, তার খবর তো আমি রাখি না।’ এই উক্তি করে ইয়াহিয়া বিশ্বময় ধিক্কার লাভ করেছিলেন।

শেখ হাসিনা এখন নিজের গুণেই বিশ্বময় নন্দিত এবং প্রশংসিত নেতা। মানুষ তাকে দক্ষিণ এশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ নেতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। এই অবস্থায় তার নিচে শকুনের ভাগাড়ের দিকে দৃষ্টি নামানো উচিত নয়। তাতে তার মর্যাদা নষ্ট হবে।

[ লন্ডন, ৭ ডিসেম্বর, শনিবার, ২০১৯ ]

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন