ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৭
১৪ °সে

সগিরা মোরশেদ হত্যাকাণ্ড মানবিকতার চরম অবক্ষয়

সগিরা মোরশেদ হত্যাকাণ্ড মানবিকতার চরম অবক্ষয়

এ কে এম শহীদুল হক

সগিরা মোরশেদ নিহত হন ১৯৮৯ সালে। তিনি BIDS (Bangladesh Institute of Development Studies)-এর একজন Research Fellow ছিলেন। ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকেলে তিনি রিকশাযোগে রাজারবাগস্থ তার বাসা থেকে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে যাচ্ছিলেন তার মেয়েকে আনতে। পথিমধ্যে মোটরসাইকেলে দুই আরোহী তার রিকশা থামিয়ে তাকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ঐদিনই রমনা থানায় মামলা হয়। মামলা নম্বর ৪৫ ধারা ৩৯৪/৫১১/৩০২ দণ্ডবিধি। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর এ বি এম সুলতান আহমেদ মামলার তদন্ত শেষে ৩/৯/৯০ খ্রি. তারিখে মিন্টু নামে একজন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন।

তখন গণমাধ্যমে এ চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনায় অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকেই এই ঘটনাটি ছিনতাই বলে মেনে নেয়নি। এটা হত্যাকাণ্ড বলে তাদের আশঙ্কা ছিল। ঘটনায় সন্দিগ্ধ ব্যক্তির নামও কোনো কোনো প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়। কিন্তু পুলিশ তদন্ত শেষে ছিনতাইয়ের চেষ্টায় হত্যা হয়েছে মতামত দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ইন্সপেক্টর এ বি এম সুলতান আহমেদ একজন দক্ষ তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। গোয়েন্দা বিভাগে থাকাকালে তিনি অনেক সূত্রহীন খুন ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করেছিলেন। তিনি ভদ্র ও অমায়িক ব্যক্তি ছিলেন। কী কারণে তিনি সগিরা মোরশেদ হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলেন না, সে প্রশ্ন অনেকেরই ছিল। প্রায় ৩০ (ত্রিশ) বছর পর পিবিআই কর্তৃক মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের পর আজ সে প্রশ্নের জবাব পাওয়া গিয়েছে।

মারুফ রেজার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রিমিনাল রিভিশন কেসে গত ২৭/৮/১৯৯২ খ্রি. তারিখে মহামান্য হাইকোর্ট আদেশ দেয় ক্রিমিনাল রিভিশন কেইজ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সগিরা মোরশেদ হত্যা মামলার বিচারকার্য স্থগিত থাকবে। জানা যায়, কোনো কোনো মিডিয়া রিপোর্টে মারুফ রেজা এ ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল বলে সন্দেহ পোষণ করেছিল। ৩০ বছরের মধ্যে মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়নি। পিবিআই সূত্রে জানা যায়, পুলিশ পাঁচ বার হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল মামলার স্থগিত আদেশ প্রত্যাহারের জন্য। কিন্তু সফল হয়নি। প্রায় ৩০ বছরেও হাইকোর্টে ক্রিমিনাল রিভিশন মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসে সাব-ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মোতাহার হোসেন সাজুকে মামলার ব্যাপারে ব্রিফ করেন। মোতাহার হোসেন সাহেব মামলার গুরুত্ব অনুধাবন করেন। এরপর ইত্তেফাকে এ মামলাসংক্রান্ত প্রতিবেদন ও চ্যানেল ২৪-এ টকশোতে আলোচনা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২৬/০৬/২০১৯ খ্রি. তারিখে পিবিআইকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।

১৭/৭/১৯ খ্রি. তারিখে হাইকোর্টের আদেশ পেয়ে পিবিআই তদন্ত শুরু করে। তদন্তে পিবিআই মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়। হত্যাপরিকল্পনাকারীরা সগিরা মোরশেদের নিকট আত্মীয় ছিল। তার স্বামী আব্দুস সালাম চৌধুরীর আপন ভাই ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সৈয়দাতুল মাহমুদা ওরফে শাহীন এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী। অত্যন্ত মামুলি কারণে সগিরা মোরশেদকে হত্যা করা হয়। দুই আপন ভাই অর্থাত্ ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও আবদুস সালাম চৌধুরীর পরিবার একই বিল্ডিংয়ে বসবাস করতেন। সগিরা মোরশেদ ও তার স্বামী আবদুস সালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। জানা যায়, ডাক্তার হাসানের স্ত্রী শাহীন এইচ এসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না। শাহীন সগিরা মোরশেদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঈর্ষা করতেন এবং তার স্বামী ডা. হাসানের কাছে সগিরা মোরশেদ সম্পর্কে নানা রকম নেতিবাচক তথ্য দিয়ে তাকে খেপিয়ে তুলতেন। তুচ্ছ ঘটনা ও রেষারেষির কারণেই হাসান-শাহীন দম্পতি সগিরা মোরশেদকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন।

হত্যায় দুই জন অংশগ্রহণ করে। শাহীনের ভাই রেজোয়ান এবং ডা. হাসানের রোগী ও তার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনকারী মারুফ রেজা। মারুফ রেজা সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদুল হাসানের আত্মীয়। রেজোয়ানের দায়িত্ব ছিল মারুফ রেজাকে সগিরা মোরশেদকে চিনিয়ে দেওয়া। ডাক্তার হাসানের সঙ্গে মারুফ রেজার ২৫ হাজার টাকার চুক্তি হয়। ঘটনার পর ডাক্তার হাসান মারুফ রেজাকে চুক্তি মোতাবেক কোনো টাকা দেয়নি বলে মারুফ রেজা গ্রেফতার হওয়ার পর পুলিশকে জানিয়েছে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তদন্তকালে দেখতে পায় যে, গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত সঠিক ছিল না। ঘটনা ঘটিয়েছে দুই জন। অথচ অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল এক জনের বিরুদ্ধে। তা হলে আরেক জন অপরাধী কে? চার্জশিটভুক্ত আসামি মন্টু প্রকৃতপক্ষে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে তো সে নিশ্চয়ই অন্য আসামির পরিচয় বলে দিত। এতেই প্রমাণিত হয় তদন্তে প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত করা হয় নাই। তদন্তকারী কর্মকর্তা এমন একটি স্পর্শকাতর নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সঠিকভাবে করেন নাই। তদারক কর্মকর্তাদের ভূমিকাও ইতিবাচক ছিল না। তাদেরকেও জবাবদিহিতার মধ্যে আনা বাঞ্ছনীয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর সুলতান কয়েক বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছেন।

পিবিআইয়ের সাফল্য অনেক। পুলিশের অন্য ইউনিট কর্তৃক তদন্ত শেষে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেছিল এমন কিছু কিছু মামলা পিবিআই পুনরায় তদন্ত করে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্ত তদারকির জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মনিটরিং টিমের সভায় সভাপতিত্ব করার সময় আমার মনে হলো সিআইডির পাশাপাশি পুলিশের আরো একটি তদন্ত ইউনিট গঠন করা দরকার। সে চিন্তার ফসলই আজকের পিবিআই। পিবিআই অনুমোদনের সরকারি আদেশ হয় ১৮/১০/২০১২ খ্রি. তারিখে। বিধি হয় ৫/০১/২০১৬ খ্রি. তারিখে। কিন্তু কার্যক্রম ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ থেকেই পুরোদমে শুরু হয়। উন্নত পাঠক্রম তৈরি করে পিবিআই অফিসারদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পিবিআই প্রধানের তদারকিতে এ ইউনিটের কর্মকর্তারা এখন তদন্তে বেশ দক্ষ, পেশাদার ও কর্তব্যনিষ্ঠ। পিবিআইয়ের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

আসামি ডা. হাসান, তার স্ত্রী শাহীন, স্ত্রীর ভাই রেজোয়ান এবং ভাড়াটিয়া খুনি মারুফ রেজাকে পিবিআই গ্রেফতার করেছে। তারা সকলেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

একজন ভাই অপর ভাইয়ের স্ত্রীকে কীভাবে হত্যা করতে পারে? শাহীন তিন সন্তানের মা ছিলেন। সগিরা মোরশেদরও তিন কন্যাসন্তান ছিল। আট বছর, পাঁচ বছর ও দুই বছর। একজন মা কীভাবে অন্য একজন মাকে হত্যা করে তার শিশুসন্তানদের মাতৃহীন করতে পারে। মাতৃহীন শিশুর কান্নাও হত্যাকারী মা শাহীনের হূদয়কে নাড়া দেয়নি। সগিরা মোরশেদের মৃত্যুর পরও ডা. হাসান ও তার স্ত্রী শাহীন শিশু সন্তানদের দেখাশোনা তো করেননি বরং বৈরী সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন, যাতে সালাম চৌধুরী মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে।

অন্য এক মামলায় গাইবান্ধার সাংসদ লিটন হত্যা মামলায় আসামি লে. কর্নেল (অব.) আব্দুল কাদেরসহ সাত জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। লে. কর্নেল আব্দুল কাদের দীর্ঘদিন সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। চিকিত্সক ছিলেন। অবসরের পর বগুড়াতে ক্লিনিক দিয়ে চিকিত্সা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তার স্ত্রীও চিকিত্সক। সংসদ সদস্যও ছিলেন। তিনি কীভাবে একজন এমপিকে হত্যা করে নিজে পুনরায় এমপি হতে চাইলেন?

সগিরা মোরশেদের এবং সাংসদ লিটনের হত্যাকাণ্ড মানবতার চরম অপমৃত্যুর নিদর্শন। তুচ্ছ ব্যক্তিস্বার্থে এ ধরনের নৃশংস ও মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড শুধু জঘন্য অপরাধই নয় এটা মানবতার জন্য কলঙ্ক। সগিরা মোরশেদের স্বামী সালাম চৌধুরীরা তিন ভাই ও দুই বোন। শিশু বয়স থেকেই মা-বাবার আদরে একই সঙ্গে তারা বেড়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে কত স্মৃতি, কত হূদ্যতা, কত স্নেহ ও কত ভালোবাসা ছিল। বিয়ের পরে পৃথকভাবে ঘর-সংসার করে ভাইবোনদের মধ্যকার ভালোবাসা, অনুভূতি, স্মৃতি, আবেগ সব কি হারিয়ে গেল? হূদয় থেকে সবকিছু মুছে গিয়ে কি হূদয় পাষাণ হয়ে গেল? কিন্তু কেন? এর জন্য দায়ী কে? ঘরে আসা অন্য পরিবারের মেয়েটি? আমাদের সমাজে এ ধরনের কথাই প্রচলিত আছে। কিন্তু এটাই কি ঠিক? একজন পুরুষ তার স্ত্রীর কথায় তার নিজের বিবেক-বিবেচনা, জ্ঞানবুদ্ধি, শিক্ষাদীক্ষা ও মনুষ্যত্ব-মানবিকতা, ভালোবাসা-অনুরাগ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে নিজে একজন অমানুষ হয়ে যাবে?

সগিরা মোরশেদ হত্যাকাণ্ডের মামলাটির বিচারকার্য প্রায় ৩০ বছর উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত ছিল। মামলাটির বিচার কার্যক্রম শুরু হলে হয়তো বাদীর আবেদন অথবা বিচারিক আদালতের পর্যবেক্ষণে মামলাটির পুনঃ তদন্তের আদেশ আসত। তাহলে বাদীকে বিচারের জন্য দীর্ঘ ৩০ (ত্রিশ) বছর মানবিক পীড়া নিয়ে অপেক্ষার দুর্বিষহ দিনগুলি কাটাতে হতো না। মামলার বিচারকার্য উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশ দেওয়া হলে নিম্ন আদালত, পুলিশ এবং মামলার বাদী সবাই হতাশ হয়ে পড়ে। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা কঠিন হওয়ায় তারা উদ্যোগ নিতেও আগ্রহী হয় না। মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলা পুরোপুরি আদালতের এখতিয়ারে চলে যায়। বিশেষ প্রয়োজন কিংবা আদালতের নির্দেশ ছাড়া তদন্তকারী সংস্থা তখন আর বিশেষ কোনো দায় নিতে চায় না। কোর্ট পুলিশ আদালতকে সহায়তা করে। মামলার বিচারকার্য স্থগিতাদেশ ও হাইকোর্টে দীর্ঘদিন ডেথ রেফারেন্স মুলতবির বিষয়টি পুলিশের তরফ থেকে আমি তত্কালীন প্রধান বিচাপতি জনাব এস কে সিনহার জ্ঞাতসারে এনেছিলাম। তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে সকল ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারদের কথা শুনেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, বিষয়গুলো তিনি দেখবেন। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি উচ্চ আদালতের বিশেষ নজরদারি আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

n লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন