অনাহারী মানুষের সংখ্যা সহজে জানা গেলেও ক্ষুধার আগুনের তীব্রতা পরিমাপের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে ‘দারিদ্র্যরেখা’ কবিতায় বর্ণিত গরিব আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গরিব তাই মূলগতভাবে অভিন্ন। তবে কবির বর্ণনায় ক্ষুধার আগুনের আঁচ (কাব্যিক!) অল্পবিস্তর পাওয়া যায় বইকি; অন্ন-বস্ত্র জোগাড়ের অসামর্থ্য ছাপিয়ে ফুটে ওঠে গরিবের দুর্বিষহ জীবনের বয়ান। বিপরীতে অর্থনীতির ‘দারিদ্র্যরেখা’ অর্থের হিসাবে নির্দিষ্ট, নির্মোহ। বলাই বাহুল্য, এই মিল-অমিলে গরিবিতে তাত্পর্যগতভাবে কোনো হেরফের ঘটে না।
ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্ট আয় করা মানুষকে গরিব বলে না আধুনিক বিশ্ব। এর বাইরে অবশ্য প্রতিটি দেশেরও একটি জাতীয় দারিদ্র্যরেখা আছে। যেমন শুধু আয়ের ভিত্তিতে নয়, বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতির পরিমাপ হয় মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয়ের ভিত্তিতে। এই মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় পদ্ধতি অনুযায়ী, দৈনিক ২ হাজার ১২২ ক্যালরির খাবার কেনার সামর্থ্য-অসামর্থ্য গরিবির সীমারেখা টেনে দেয়। এই পরিমাণ ক্যালরির খাবার কিনতে না পারলে আপনি দরিদ্র। আর যদি দৈনিক ১ হাজার ৮০৫ ক্যালরির খাবারও কিনতে না পারেন, তাহলে দারিদ্র্যরেখার নিচে আপনার বাস, আপনি তখন হতদরিদ্র।
অন্য অনেক বিষয়ে, অর্জনে, সাফল্যে সবার নজর কাড়ার মতো গরিবিও হয়ে উঠতে পারে পরিচয়চিহ্ন। আবার গরিবি জয়ের কারণেও বিশ্ব-মনোযোগের কেন্দ্রে থাকা সম্ভব। আশার কথা, প্রথম ক্ষেত্রের নেতিবাচক পরিচিতি ছাপিয়ে দ্বিতীয়টিতে সমীহ আদায় করে নিতে পেরেছে বাংলাদেশ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক এখন বলছে, গত দেড় দশকে দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ১৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ জায়গা করে নিতে পারেনি। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তানসহ এই ১৫ দেশের তুলনায় গরিবি হটানোর গতিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গত দেড় দশকে সবচেয়ে বেশি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমিয়েছে আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া। আর ১৫ নম্বরে থাকা আফ্রিকার আরেক দেশ নামিবিয়া কমিয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ হারে। সেখানে বাংলাদেশের অর্জন ১ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অথচ গত ১৫ বছরে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় দুটোই বেড়েছে। সাদা চোখে এই সাফল্যের চিত্র দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমার হিসাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই ধরা পড়ে। তবে ভিন্ন এক জরিপে চোখ বোলালে ভিন্ন এক চিন্তা কপালে ভাঁজ ফেলে। সিপিডির ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৭-২০১৮, প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ অনুযায়ী, দেশে গত ছয় বছরে জিডিপি বৃদ্ধির দিনগুলোয় সবচেয়ে ধনী ৫ ভাগ মানুষের আয় বেড়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা, আর সবচেয়ে গরিব ৫ ভাগ মানুষের আয় কমেছে ১ হাজার ৫৮ টাকা।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ২০১৬ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করে। দেশের সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ বা প্রায় পৌনে ২০ লাখ পরিবারের প্রতি মাসে গড় আয় মাত্র ৭৪৬ টাকা। এর বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় লাখ ছুঁই-ছুঁঁই। এমন ধনাঢ্য ১৯ লাখ ৬৫ হাজার পরিবারের প্রতি মাসে গড় আয় ৮৯ হাজার টাকা। অর্থাত্ দেশের সবচেয়ে হতদরিদ্র পরিবারের চেয়ে সবচেয়ে ধনী পরিবারে আয়ের ব্যবধান ১১৯ গুণের। তাত্ত্বিকেরা বলেন, আয় বৃদ্ধির ফলেই গরিবি দূরীকরণে সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই আয় বৃদ্ধির যাত্রায় ধনীরা এতটাই এগিয়ে যে গরিবদের অন্য কাতারভুক্ত বলেই মনে হয়। বিবিএসের (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশের ৩৮ শতাংশ সম্পদের মালিকানা রয়েছে মাত্র ১০ ভাগ মানুষের কবজায়; এরা সবচেয়ে ধনী। আর সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষ মাত্র ১ শতাংশ সম্পদের মালিক।
সুতরাং মাথাপিছু আয়ের হিসাবে গরমিলের একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। এই হিসাবে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি, দেশের সম্পদ আত্মসাত্কারী, শেয়ারবাজার লুটেরাদের কুক্ষিগত কালো টাকা সমাজের আর-দশজনের গড় সম্পদ বলে দিব্যি চালিয়ে দেওয়া হয়। কৃষক, রিকশাচালক, হকার, সরকারি চাকুরে, ফুটপাতের ব্যবসায়ী, পোশাক কারখানার মালিক, শ্রমিক—সবাই মধ্যবিত্ত এবং সবার মাথাপিছু আয় হয়ে দাঁড়ায় সমান!
বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের মূল্যায়ন, বিশ্বের প্রথম পাঁচ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি বাংলাদেশ। উপরন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের চেয়ে বড়ো ধনীর তকমা নাকি বাংলাদেশের কপালেই আঁকা হবে—এমন আভাসও স্পষ্ট বলা হচ্ছে। আর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস, ২০২০ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। ফলে তখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ হবে বাংলাদেশ। অবশ্য বিবিএসের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
পরিসংখ্যান মতে, ২০০০ সালে দেশে অতিদরিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে এসে তা কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশে। এখনো প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ হতদরিদ্র। একই সঙ্গে দ্য ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮ অনুযায়ী ‘কুইকেস্ট গ্রোইং রিচ পপুলেশন’ তৈরির দেশও কিন্তু আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
দারিদ্র্যরেখার এই দুই পারের বাসিন্দাদের মধ্যে যোগাযোগের সেতু বসবে কবে?
n লেখক :সাংবাদিক

