মতিন-উল হক
বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন, ১৮৮৫-এর বিধান অনুসারে ১৮৯০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মোট ৫০ বছরে সমগ্র বাংলাদেশে (সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত) ভূমি জরিপ কাজ সমাপ্ত করা হয়, যা জরিপের ইতিহাসে সিএস জরিপ নামে অভিহিত। জেলাভিত্তিক পরিচালিত এই জরিপ কোনো কোনো এলাকায় ডিএস নামে অভিহিত। অত্যন্ত শুদ্ধ এই জরিপে প্রস্তুতকৃত স্বত্বলিপি (নকশা + রেকর্ড) আজ পর্যন্ত প্রামাণিক রেকর্ড হিসাবে আদালতসহ সর্বমহলে প্রায় অবিতর্কিত স্বত্বলিপি হিসাবে সমাদৃত। জেলাভিত্তিক পরিচালিত এই জরিপে কার্যক্রম এক জেলায় সমাপ্ত হলে অন্য জেলায় লোকবল স্থানান্তর করা হতো এবং জরিপের কাজ পরিচালনা করা হতো। সার্কিট পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপ কার্যক্রম গড়ে প্রতিটি জেলায় পাঁচ বছরে শেষ করা হতো।
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৪ ধারার বিধান মোতাবেক বর্তমান জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৪৪ (১) উপধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার প্রয়োজনে কোনো জেলায়, বা জেলার অংশে অথবা কোনো স্থানীয় এলাকায় জরিপ পরিচালনা করতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৮৪ সালে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে দেশের প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় সার্কিট জরিপ পদ্ধতির পরিবর্তে একটি স্থায়ী জরিপকাঠামো সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দিয়ারা ও আরবান সেটেলমেন্ট ঐ একই প্রজ্ঞাপন দ্বারা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের উল্লিখিত প্রজ্ঞাপনের সিদ্ধান্তের আলোকে অনেকগুলো সেটেলমেন্ট জোন সৃষ্টি করা হয়।
জরিপ কার্যক্রম প্রধানত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০, এসএস ম্যানুয়েল ১৯৩৫, EBT Rules, ১৯৫৫; টেকনিক্যাল Rules, ১৯৫৭ ইত্যাদি আইন/বিধিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশেষভাবে এসএস ম্যানুয়েল ১৯৩৫-এর ২৯৪ নম্বর বিধির আলোকে যে কোনো বড়ো ধরনের সেটেলমেন্টের সব ধরনের জরিপ কাজ সাধারণভাবে পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে সমাপ্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর সময় অতিক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত ১৯৮৫-৮৭ সালে সৃষ্ট ১০টি স্থায়ী জোনাল সেটেলমেন্টের জরিপ কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ হয় নাই। এত দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রস্তুতকৃত স্বত্বলিপির প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জরিপ কার্যক্রমের এই অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণসমূহ নিম্নরূপ :
১। প্রকৃতপক্ষে জরিপ কাজের ধরনই হচ্ছে সার্কিট পদ্ধতি। সার্কিট পদ্ধতিতে এক জেলায় জরিপের কাজ সমাপ্ত হলেই স্বত্বলিপি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকসহ অনান্য কর্তৃপক্ষ বরাবর হস্তান্তরের পর ঐ জেলায় জরিপ কর্তৃপক্ষের আর কোনো কাজ থাকে না। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩ ধারার বিধান মোতাবেক জেলা প্রশাসক তথা কালেক্টর জরিপ বিভাগ প্রণীত স্বত্বলিপি হালনাগাদ করেন। একটি জেলার জরিপের কাজ সমাপ্ত হওয়ার ২৫/৩০ বছর পর পুনরায় ঐ জেলায় জরিপ কার্যক্রম শুরু করতে হয়। কিন্তু জোনাল জরিপ পদ্ধতিতে কোনো কোনো জেলায় জরিপ কার্যক্রম সমাপ্ত হলেও যেহেতু পদ্ধতিটি স্থায়ী, তাই বিনা কাজে ঐ সকল জেলায় জরিপ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়িত থাকেন এবং যথারীতি বেতন- ভাতা গ্রহণ করেন।
২। বৃহত্তর জেলাভিত্তিক স্থায়ী জোনাল জরিপ ব্যবস্থায় এক থেকে ছয়টি জেলা সমন্বয়ে স্থায়ী জোন সৃষ্টি করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪(১)-এর ধারার বিধান মোতাবেক জেলা বা জেলার অংশ বা স্থানীয় এলাকার ভিত্তিতে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। একাধিক জেলা নিয়ে জোন গঠন করার কোনো বিধান আইনে নেই। অধিকন্তু জোনাল পদ্ধতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে ১ জেলার জোন আবার ২/৩/৪/৫/৬ জেলা সমন্বয়ে জোন সৃষ্টির কারণে এক অসদৃশ্য তদারকি ও ব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে। অধিক জেলা নিয়ে গঠিত জোনে তদারকি দুর্বলতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। সম্ভবত এ কারণে ঢাকা জোনের অধীন ‘ঢাকা সিটি জরিপ’ যথাযথ মানসম্পন্ন হয়নি মর্মে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪(১) ধারার বিধান অনুসারে জেলাভিত্তিক সার্কিট জরিপ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা অত্যাবশ্যক।
৩। জোনাল জরিপ পদ্ধতির দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ হলো SAT Act-এর ১৪(৫) উপধারার বিধান সীমাহীনভাবে লঙ্ঘন করা। এই উপধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, কেবল খসড়া প্রকাশনা চলাকালীন আপত্তি মামলা দায়ের করা যাবে। খসড়া প্রকাশনা সমাপ্ত হওয়ার পর আপত্তি মামলা গ্রহণের কোনো আইনগত সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন জোনে বছরের পর বছর ‘বিশেষ’ বিবেচনায় লক্ষ লক্ষ আপত্তি মামলা গ্রহণ করা হয় এবং বছরের পর বছর ধরে ঐ সকল আপত্তি মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি করা হয়। এ ধরনের বেআইনি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিভাগীয় ব্যবস্থার আওতায় দণ্ড প্রদানের ব্যবস্থা করা হলে অন্যেরা এ ধরনের বেআইনি কাজে উত্সাহী হবে না।
৪। EBT Rules ১৯৫৫-এর ৩০ বিধির বিধান মোতাবেক আপত্তি মামলাসমূহ নিষ্পত্তি না করায় অহেতুক দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়। উক্ত বিধিমালার ৩০ বিধিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আপত্তি মামলাসমূহ সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করতে হবে। অর্থাত্ সংশ্লিষ্ট পক্ষ বা পক্ষগণের প্রতিনিধিকে নোটিশ প্রদান নিশ্চিত হলে কোনোরূপ সময় নষ্ট না করে তাত্ক্ষণিকভাবে মামলাসমূহ নিষ্পত্তি করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় একটি মৌজার আপত্তি কার্যক্রম ১/২ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু আপত্তি মামলাসমূহ তাত্ক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি না করে তারিখের পর তারিখ দিয়ে বছরের পর বছর সময় লাগিয়ে নিষ্পত্তি করা হয়। এই ধরনের বেআইনি প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে জরিপ কার্যক্রম তার গুরুত্ব হারাতে বাধ্য।
৫। অন্যান্য বিধিবিধানের সঙ্গে এসএস ম্যানুয়েল ১৯৩৫-এর ২৯৪ নম্বর বিধির বিধানসমূহ অনুসারে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থতা জরিপকাজের দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ। এই বিধিতে একটি বড়ো ধরনের জরিপ কার্যক্রম পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে শেষ করার ক্ষেত্রে বছরওয়ারি কী কী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু এ বিধানের প্রতি সুবিচার না করার কারণে পাঁচ বছরের জরিপকাজ ৪০ বছরে গড়াচ্ছে। জোনাল পদ্ধতিতে গতানুগতিক জরিপকাজ সমাপ্ত না করে একই সঙ্গে কোনো কোনো এলাকায় ডিজিটাল জরিপকাজ শুরু করা হয়েছে। উভয় পদ্ধতির জরিপ একত্রে পরিচালিত হওয়ার কারণে ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম থেকেও কোন ধরনের আশানুরূপ অগ্রগতি ও সময় নির্ধারিত পদ্ধতিতে জরিপকাজ সমাপ্ত করা যাচ্ছে না। জরিপ কার্যক্রম যে তিমিরে আছে সে তিমিরেই থেকে যাবে।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক,
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর

