অরুণ কুমার বিশ্বাস
নেতা কিংবা অভিনেতা। ভেবে দেখলাম, এদের দুই জনকেই আমার বেশ পছন্দ। শুধু পছন্দই বা বলি কেন, ব্যাপক ভালো লাগে আমার এই দুই শ্রেণির পাবলিককে। বস্তুত, এদের ছাড়া আমার চলেই না। একটু ভেবে দেখুন, অভিনেতা না হলে এখন চলে! সেই কবে ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র বলে গেছেন, জীবন নাকি স্রেফ একটা নাট্যমঞ্চ, সেখানে চাই বা না-চাই, প্রত্যেককে কিছু না কিছু একটা ভূমিকায় অভিনয় করতেই হয়। অভিনয় ছাড়া জীবন চলে না। সোজাসাপটা কথা যারা বলে, তারাই মূলত ফাঁসে। বউয়ের জালে বা বসের চালে। যারা এই জিনিস জানে না, তারা ধরা খায়, হুমদো হাতির মতো যেখানে-সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তারপর আর উঠে দাঁড়াবার মতো তাগত পায় না। প্রপাত চিতপটাং! গেম ফিনিশ!
আবার ধরুন, নেতাদের কথা বলি। নেতারা বেজায় ক্ষমতাধর। তাদের বয়ান ও বয়নে নানা কিসিমের প্রতিশ্রুতি লুকিয়ে থাকে। তারা লোক পটাতে পটু। নেতাদের কথা অগ্রাহ্য করে এমন মানুষ বিশ্বে এখনো পয়দা হয়নি। তারা কেবল সব্যসাচী নয়, সবজান্তা শমসেরও বটে। আবার নেতা মানেই অভিনেতা। অভিনয় না জানলে তার পক্ষে নেতা হওয়া মুশকিল বইকি। লাজলজ্জা থাকলেও নেতা হওয়া কঠিন। চিবিয়ে চিবিয়ে জ্ঞানের কথা বলবেন, কিন্তু আদতে একটাও মানবেন না, এও নেতাদিগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বটে। নেতার আবার রকমফের হয়। পাতি নেতা, জাতিনেতা (মানে জাতীয়), হাফনেতা, ফুলনেতা, গুলনেতা (মানে গুলবাজ), হাতানেতা, চামচে নেতা, স্বল্পনেতা, গল্পনেতা, গুরুনেতা, বুড়োনেতা, গরুনেতা—সে মেলা কিসিমের নেতা আজকাল আমাদের চারপাশে পরিদৃশ্যমান হয়। এদের না যায় গেলা, না ফেলা।
সে যাক গে, যা বলছিলাম—নেতা হতে গেলে অভিনয় জানতে হয়। তবে অভিনেতার ক্ষেত্রে নেতা হওয়াটা জরুরি নয়। মঞ্চে উঠে কিঞ্চিত নাচন-কুঁদন বা হাহা, হিহি, মিউ মিউ কান্না করতে পারলে একরকম চলে যায়। ইদানীং বাংলা নাটক মানেই গোপাল ভাঁড়ের নাতিদের বিস্তর ভাঁড়ামো। ইন্ডিয়ান নাটকে কুটনামি ভরপুর, আর আমাদের ‘দেশি নাটক’ দেখে কুতকুতে হাসির ফোয়ারা ছুটবেই। আবারও বলি, নেতা এবং অভিনতা, এদেরকে আমার ব্যাপক লাগে। উহারা রঙেঢঙে অসাধারণ, রুচিবৈচিত্র্যে ভরপুর, বাক্পটু এবং লোকের মেজাজ ফেরাতে পারঙ্গম। এরা এমনভাবে কথা বলেন, যেন সব মুশকিলের আসান তাদের জানা। যেখানে নদীই নেই, সেখানেও হয়তো তারা সাঁকো নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসবেন। বলতে নেই, আম পাবলিক এদেরকে বেশ ভালোও বাসে। কেউ তাদের খুঁত খুব একটা খোঁজেন না। তেঁতুল হেসে বলেন, নেতামানুষ, জনগণের শেষ ভরসাস্থল। নে, এবারকার মতন ছেড়ে দে বাছা! আসছে বার দেখা যাবে।
বেকায়দা বুঝলে তখন নেতারাও পাবলিকের মনমর্জি বুঝে চলেন। এরা বড়োই উদার এবং মহান টাইপ ব্যক্তি। যখন-তখন কথা ফিরিয়ে নিতেও কোনো কসুর করেন না। তাড়া খেয়ে ঝেড়ে দৌড় দিতেও তাদের কুণ্ঠা নেই। কখনো-বা কিল খেয়ে কিল চুরি করেন। ভাবখানা এমন, যেন কিচ্ছু হয়নি। কানে ধরে তালগাছের মগডালে তুললে অ্যাদারতে হেসে বলেন, কতদিন তালের গুড় থুক্কু রস খাই না। তাই নিজে থেকে একটু ‘তালে উঠলাম’ আর কি!
আপনি তাকে যেচেপড়ে অপমান করলেও তিনি গায়ে মাখবেন না। বরং গদগদ স্বরে বলেন, আমরা হলুম গিয়ে জনগণের সেবক। তাই আপনাদের হাত, পা কিংবা লেজুড় ধরতে আপত্তি থাকবে কেন! সুতরাং তারা মহান ও জনসেবায় অদ্বিতীয়। বারবার হেরেও তাদের মনোবল কমে না। মনে মনে বলে, এক মাঘে শীত যায় না, এবার ভোট দাওনি তো কী হয়েছে, আসছে বছর আবার...! তাই নতুন বছর সবার জন্য শুভ হোক, নেতা এবং অভিনেতা দুই জনেই ভালো থাক, এই প্রত্যাশা করি। তারা ভালো থাকলে আমরা মানে আমজনতাও ভালো থাকব। নেতা ছাড়া কি দুনিয়া চলে, বলুন! তারা কথায় কথায় রাজা-উজির মারেন। মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে হালুম সুরে আওয়াজ দেন, রক্ত যত লাগে তত দেব, তাও দাবি আদায় না করে পিছু হটব না। ওদিকে জনান্তিকে বলেন, রক্ত দেব বটে, তবে নিজের না। এরা নানামাত্রিক জ্ঞানের অধিকারী। ব্যক্তিত্বও বহুবর্ণিল। অনেকটা যেন সেই ‘মি. জেকিল অ্যান্ড হাইডের’ মতো। চরিত্রের গাছপাথর নেই। প্রয়োজন বুঝে হালের নেতারা সব বেশ বদল করেন এবং চিত্রবিচিত্র ভেক ধরে নিজের চামড়া বাঁচান। পাবলিক এসব যে একেবারেই বোঝে না, তা তো নয়। কিন্তু কী করবেন বলুন, পলটিবাজ নেতাদের নিয়েই তো বর্তমান পলিটিকস বেঁচে আছে। এরা পটাপট পলটি খান, মানে বিপদ বুঝে লেজমুড়ো একখানে করে ফেলেন। ফলে বোঝার উপায় থাকে না যে, কে আসলে কোন দল করেন! নাকি উভয় দল অর্থাত্ কোন্দল এড়াতে ঝড় বুঝে ছাতা ধরেন আর কি! কিন্তু মহাশয়, ঝড় কি সব সময় বলেকয়ে আসে! যদি এমন হয়, আপনি দিক-দিশে খুঁজে পাবার আগেই সুনামি এসে গেল, তখন কী করবেন! ছাতা ধরবেন, নাকি পাতলুন গোটাবেন! ভাবুন, মন দিয়ে ভাবুন, তারপর না হয় পলিটিকসে নামবেন।
n লেখক : কথাসাহিত্যিক

