সাংবাদিকতায় হাসান শাহরিয়ার ছিলেন একজন সরব, সতেজ ও টগবগে মানুষ। আমুদে এই মানুষটি যেখানেই যেতেন—তার কর্মস্থল বা সামাজিক সমাবেশ—সেখানেই নিজেকে মধ্যমণি করে তুলতেন। তার বিচরণভূমি ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। উচ্চকিত এই সদা-হাসিমুখ-মানুষটি যখন চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন অসীমের পথে তখন যেন এক অন্য হাসান শাহরিয়ার। অনেকটা নীরবে ও নিঃশব্দে তার প্রস্থান। তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ কয়েক জন সাংবাদিক যারা তাকে আপনার চেয়েও আপন ছিলেন তারা ছাড়া আর কাউকে তিনি বিব্রত করেননি। সারা জীবন যে মানুষটি নিজের জন্য কারো কাছে হাত বাড়াননি, মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও তিনি কাউকে বিরক্ত করতে চাননি। তিনি পরলোকগমন করেছেন ১০ এপ্রিল শনিবার রাজধানীর একটি হাসপাতালে।
হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে। জানা গেছে বেশ কদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন—প্রোস্টেট কর্কট রোগে আক্রান্ত, তদুপরি শ্বাসকষ্ট। জুনায়েদ বলছিল, মামাকে বারবার বলেও হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে যখন রাজি হলেন, তখন তাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল—সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি ঘোরাঘুরি। কোনো শয্যা শূন্য নেই, তাই ভর্তি করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত আরেক ডাক্তার ভাগনে তাকে নিয়ে আসেন তার কর্মস্থল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। এখানেও রোগীর জন্য কোনো শয্যা নেই। অগত্যা ডাক্তারের ঘরে রেখেই তাকে দেওয়া হলো অক্সিজেন। এই অক্সিজেন পেলেও যে তিনি বাঁচবেন না। এটা মোটেই যথেষ্ট ছিল না। তাঁকে বাঁচাতে হলে আইসিইউ সেবা অতি জরুরি। মধ্যরাত সমাগত। কোনো হাসপাতালেই প্রথিতযশা এই সাংবাদিকের জন্য একটি আইসিউ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে তার পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। আপনজনদের উত্কণ্ঠা ও উদ্বেগ বাড়ছে। ঘনিষ্ঠজনদের অক্লান্ত চেষ্টাই অবশেষে ইমপালস হাসপাতালে একটি আইসিউ পাওয়া গেল। সেখানে নিয়ে ভর্তি করাতে আরো সময় ব্যয় হলো। তখন শুক্রবারের প্রথম প্রহর শুরু হয়ে গেছে। ততক্ষণে সিটি স্ক্যানে পাওয়া গেল একটি দুঃসংবাদ। করোনা ভাইরাস তার ফুসফুসের ৮০ শতাংশ সংক্রমিত করেছে। দিনের আলো মধ্যসকালে পা রাখতে না রাখতেই তিনি চলে গেলেন।
চির অকৃতদার হাসান শাহরিয়ার আমাদের সকলের অতিপ্রিয় শাহরিয়ার ভাই ২৫ এপ্রিল তার জন্মদিন পালন করতেন বেশ বড় আয়োজনে। অতিথির সংখ্যা ২০০ থেকে ৩০০। সাংবাদিক বটেই, রাজনীতিবিদ শিক্ষাবিদ আইনজীবী ব্যবসায়ী কূটনীতিক সকলের জন্যই থাকত আমন্ত্রণ। এই আয়োজন এতটাই জনগ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল যে, কোনো বছর তিনি কোনো কারণে আয়োজন অক্ষম হলেও তার ঘনিষ্ঠজনরা তার সম্মানে আয়োজন করত। গত বছর করোনার কারণে কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। এবার করোনার ভয়াবহতা সত্ত্বেও হয়তো মনে ক্ষীণ আশা ছিল, ক্ষুদ্র পরিসরে আয়োজন হবে। তার ৭৫তম জন্মদিনে তাকে ‘শুভ জন্মদিন’ শুভেচ্ছা জানাতে পারব। বলতে পারব, শতবর্ষী হোন শাহরিয়ার ভাই।
প্রায় ছয়টি দশক তিনি দীপ্ত স্বাক্ষর রেখেছেন সাংবাদিকতায়। খবরের পেছনের যে খবর তা সংগ্রহ করেছেন অক্লান্ত প্রচেষ্টায়, নিজে লিখেছেন, পরবর্তী সময়ে অন্য সাংবাদিকদের লিখতে সহায়তা করেছেন। খবর কোথায় লুকিয়ে থাকে তা খুঁজে বের করার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বয়স বেড়েছিল শাহরিয়ার ভাইয়ের, কিন্তু মনে ছিলেন চিরসবুজ ও তারুণ্যে ভরপুর। তিন দশকের বেশি কাজ করেছেন নিউজ উইক সাময়িকীতে। সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন ষাটের দশকের শুরুতে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার হাত ধরে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কয়েক বছর আগে করাচি গমন, সেখানে ডন পত্রিকায় চাকরি। করাচিতে অবস্থান, ইত্তেফাক ও ডন পত্রিকায় কাজ করার সূত্রে তত্কালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক স্বনামধন্য রাজনীতিবিদের সঙ্গে পরিচয়; তাদের সাক্ষাত্কার, খবর সংগ্রহ; তত্কালীন রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিস্থিতি; পশ্চিমাদের শাসন ও শোষণের জাঁতাকলে পূর্ব বাংলার মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার কথা তিনি তার পাঠকদের জানিয়েছেন একজন সত্যিকার পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে।
স্বাধীনতার পর আটকে পড়া আরো অনেক বাঙালিদের সঙ্গে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর ইত্তেফাকের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন ২০০৮ সাল অব্দি। অনুকরণীয় পেশাদারিত্ব, মেধা ও দক্ষতা তাকে নিয়ে গেছে দেশের বাইরে, খালিজ টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য ডেকান হেরাল্ড—এসব নামিদামি পত্রিকায় কাজ করেছেন, সুনাম অর্জন করেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় থাকার কালে সাক্ষাত্কার নিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে জেনারেল জিয়াউল হক, বেনজির ভুট্টো ও মাদার তেরেসার মতো রাষ্ট্রনায়ক ও সমাজসেবীদের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলি। ২০০৩-’০৪ মেয়াদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি থাকাকালীন তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল সার্ক প্রেস ক্লাব ফোরাম। কমনওয়েলস সদস্যভুক্ত দেশসমূহের সাংবাদিকদের সংগঠন কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন পরপর দুবার। তার প্রেরণাদায়ী নেতৃত্বের স্বীকৃতিতে তাকে সংগঠনটির আজীবন প্রেসিডেন্ট এমিরেটাস নির্বাচিত করা হয়। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে তিনি বৈদেশিক সাংবাদদাতা সমিতির সভাপতিও ছিলেন।
হাসান শাহরিয়ারের সান্নিধ্যে আমরা যারা আসতে পেরেছি, ধন্য হয়েছি। চির আশাবাদী এই মানুষটিকে কখনো কোনো বিষণ্নতা আচ্ছন্ন করেছিল, মনে পড়ে না। জীবনসায়াহ্নে এসেও তিনি এই জীবনের প্রভাবকালের সংগীত গেয়েছেন। সাংবাদিক শাহরিয়ার হিসেবেই শুধু নন, একজন প্রশস্ত-চিত্ত মানুষ হিসেবে তাকে আমরা মনে রাখব। তাকে মনে রাখবে দেশ ও দেশের বাইরে তার অগণিত গুণগ্রাহী ও বন্ধুগণ।
n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক

