দ্বিতীয় দফার করোনার শুরু হয়েছিল ১৭ মার্চ ২০২১। সেদিন সারা ভারতে আক্রান্ত হয়েছিল ৬০ হাজার মানুষ। গত কয়েক দিনেই ভারতে ১০ লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার ভারত সরকার বিগত ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণ শনাক্তের যে হিসাব দিয়েছে, তাতে আগের দিনের চেয়ে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। এ দিন ৩ লাখ ২৩ হাজার ১৪৪ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানানো হয়। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৯১, যা এক দিনে একক কোনো দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোগী শনাক্তের রেকর্ড। এখন পর্যন্ত দেশটিতে ১ কোটি ৭০ লাখের মতো করোনা রোগী শনাক্ত এবং ১ লাখ ৯২ হাজার জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতিতে সারা ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শুরু করে রাজ্য সরকারগুলোর হাতের বাইরে চলে গেছে সবকিছু। এর ওপর নতুন করে দেখা দিয়েছে পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা। ভারত সরকারের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত উপদেষ্টা তথা এইমস-এর ডিরেক্টর রণদীপ গুলেরিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘শিশুদের ওপর এই সংক্রমণের ব্যাপারে আমরা দৃষ্টি রাখছি।’ তিনি নিজেই বলেছেন, ১. শ্বাসবায়ু-সংকট (অক্সিজেন), ২. ওষুধের সংকট, ৩. হাসপাতালের শয্যার অভাব, ৪. ভ্যাকসিনের অভাব। তিনি একাই নন, গত তিন দিন ধরে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও চিকিত্সকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, গত বছর ঠিক ১৭ মার্চ যখন প্রথম পর্যায়ের করোনা শুরু হয়, তখন ভারত সরকার দেশবাসীকে দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাপারে সতর্ক তো করেইনি, বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি। ফলে শ্বাসবায়ু-সংকটের মোকাবিলায় যে অক্সিজেন দরকার, সে ব্যাপারে কোনো হিসাবনিকাশই করেনি। তারই মধ্যে সারা দেশেই দেখা যাচ্ছে, করোনা বিধি মানছে না সাধারণ মানুষ।
করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় বেসামাল দেশ। হাসপাতালে কোনো বেড নেই। হাসপাতালগুলোতে ঠিক সময়ে করোনা পরীক্ষাও করানো যাচ্ছে না। আমরা কলকাতায় বসে টিভির পর্দায় ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। টিভি চ্যানেলগুলো পেশাদারিত্বের জন্যই এই দৃশ্যগুলো দেখাচ্ছে। কিন্তু আমরা তা দেখে শিউরে উঠছি। আমরা দেখছি, মৃতদেহগুলো শ্মশানে এবং কবরস্থানে স্তূপীকৃত। মৃতদেহগুলো সত্কার করার কোনো ব্যবস্থাই করা যাচ্ছে না।
ইতিমধ্যে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে গত চার দিনে দিল্লি, কলকাতাসহ আরো চারটি রাজ্যের হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ শ্বাসবায়ু-সংকট নিয়ে সরকারের কৈফিয়ত তলব করেছে। দিল্লি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ শনিবার এক রায়ে বলেছে, যারা অক্সিজেন চুরি করছে, তারা মারাত্মক অপরাধ করছে। এই অপরাধের জন্য তাদের ফাঁসি দেওয়া উচিত। দিল্লি হাইকোর্ট আরো বলেছে, দুই দিনে অক্সিজেন না পেয়ে রাজধানী দিল্লিতেই মৃত্যু হয়েছে ৫০ জনের। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুধু ঢেউ নয়, সুনামি। মে মাসে তা চরম আকার নেবে। সেই সুনামি প্রতিরোধে দিল্লির চিকিত্সা-পরিকাঠামো যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ হাইকোর্টের।
দিল্লি, কলকাতাসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের হাইকোর্টে অক্সিজেন-সংকট নিয়ে ইতিমধ্যে জনস্বার্থে মামলা হয়েছে অনেকগুলি। স্বাধীনতার আগে থেকেই কলকাতা ও বর্ধমানে দুটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট ছিল। এর মধ্যে একটি প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যটিতে উত্পাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কী কারণে এটা করা হলো সে ব্যাপারে কোনো কথা বলেনি রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর।
আমেরিকার মেরিল্যান্ড হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডা. ফেম ইনুস এক টিভি সাক্ষাত্কারে বলেছেন, বর্তমানে ভারতের যা অবস্থা, মে মাস নাগাদ সংক্রমণ আরো দ্বিগুণ হবে। তিনি বলেছেন, অবিলম্বে ‘অক্সিজেন ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করা হোক।
দিল্লির অ্যারিমাস হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং কোভিড বিশেষজ্ঞ ড. দেবলীনা চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারের পরিকল্পনার অভাবেই গোটা দেশে এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি মনে করেন, সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে বাঁচাতে হবে। আর এই বাঁচানোর দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই। কারণ মানুষের বাঁচার অধিকার আছে ভারতীয় সংবিধানে। ড্যাং ল্যাবরেটরিজের প্রতিষ্ঠাতা ডা. নবারুণ ড্যাং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চিরকালের জন্য লকডাউন হতে পারে না। সরকার যদি মনে করে থাকে লকডাউন করেই সমস্যার সমাধান হবে, তা হবে না বলেই তার ধারণা।
শনিবার কলকাতার ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ শ্বাসবায়ু-সংকট নিয়ে সম্পাদকীয়তে লিখেছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে অক্সিজেন সরবরাহকে বিপর্যয় মোকাবিলা আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অর্থাত্ আন্তঃরাজ্য অক্সিজেন পরিবহনে কোনো প্রকার বাধা দেওয়া যাবে না। তার আগেই অবশ্য দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, প্রয়োজনে আধাসামরিক বাহিনী নামিয়েও অক্সিজেন সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে হবে। দেশ জুড়ে অক্সিজেনের অভাব প্রকট। এই সংকটের মধ্যেই নাশিকের এক হাসপাতালে অক্সিজেন লিক হয়ে বেঘোরে প্রাণ হারালেন ২২ জন করোনা রোগী। আবার শ্বাসবায়ুর হাহাকারের মধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের অমৃতবাণী—অক্সিজেনের বেহিসাবি খরচ চলবে না। কিছু জায়গায় অক্সিজেনের অপচয় হচ্ছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য, গত শতকের গোড়ার দিকে তিনটি মহামারি রোগ দেখা দিয়েছিল। একটি হলো কালাজ্বর, একটি যক্ষ্মা এবং একটি ম্যালেরিয়া। অবিভক্ত বাংলার ঘরে ঘরে এই রোগগুলো দেখা দিত। ম্যালেরিয়ার ওষুধ আবিষ্কার করেন ডা রোনাল্ড রস। তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেছিলেন। এসএসকেএম (তত্কালীন পিজি) হাসপাতালে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি এই আবিষ্কার করেন। আর বাঙালি ডা. উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী আবিষ্কার করেছিলেন কালাজ্বরের ওষুধ। যক্ষ্মা ও জলবসন্তের ওষুধ আবিষ্কার করেন পশ্চিমবঙ্গের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বর্তমান আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে ভারতের করোনা পরিস্থিতি বিশ্বে এক নম্বর স্থান অধিকার করেছে। ভারত কী করে এই সংকটকে মোকাবিলা করবে? আরো বিধ্বস্ত হবে, নাকি দ্রুত ঘুরে দাড়াবে ভারত? ভবিষ্যত্ই দেবে এর উত্তর।
n লেখক : ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

