শুরুটা এভাবে হতে পারত :বিজ্ঞ কৌঁসুলি একটি ধর্ষণের মামলা জিতে ভিকটিমের মুখে হাসি ফুটিয়ে বাসায় আদরের সোনামণি কোলে নিয়ে বউকে সারা দিনের সফলতার গল্পটা শেষ করে নিশ্চিন্তে টানটান সন্ধ্যাঘুম দিতে পারতেন। কিন্তু বানভাসি সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে রাতে গভীর ঘুমের ঘোরে পরকালের জেরার দুঃস্বপ্নে একাকী তাপানুকূল কক্ষে ও জবুথবু ঘামে ধারে-ভারে কাঁদতে-কাঁপতে থাকা সর্বহারাদের ক্ষীণকণ্ঠের ভয়ার্ত আর্তনাদ যখন ছায়ামানব হয়ে ভেসে বেড়াতে দেখে, তখন ভালো কিছু করার চৌম্বকীয় ইচ্ছাশক্তি, সুযোগ ও পরিস্থিতি কোনোটাই থাকে না।
দারোগা হয়ে ওসি, এসপি, ডিসি ব্যাংক, ম্যাজিস্ট্রেট জজ-ব্যারিস্টার, ডাক্তার, তহশিলদার, কাস্টমস ভ্যাট হয়ে রাজনীতির অসংখ্য মেধাবী কনস্টেবল যদি তাদের অহর্নিশ রোজনামচা প্রতিদিন লিখে রাখতেন; দেশে অকাট্য নষ্টদের ধারে-ভারে থাকা হায়েনাদের হাতে দেশের সদা জাগ্রত কনস্টেবলকে কাঁদতে-কাঁপতে দেখতে হতো না।
ভীষণ হায়েনা দলের ধারে-ভারে দেশপ্রেমের সব জাগ্রত কনস্টেবল কখনো কাঁদছে, কখনো কাঁপছে। নষ্টদের কাছে কেজি-সের দরে নিজের মেধা-মনন-বুদ্ধি-বিবেক বিক্রি করে কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত রেখে আমুদে বাসনা নিয়ে নিজেকে বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার ভেবে কখনো খাবারের হোটেল, সভা-সমাবেশ, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম অফিস পেরিয়ে ধারে-ভারে বুক ফুলিয়ে আমি-তুমি-সে বলি ‘আমি এমন জেরা করেছি, ভিকটিম সাক্ষী কিছুই বলতে পারেনি। শুধু কাঁদছে-কাঁপছে। ধর্ষণের ঘটনা সত্য! জমি-স্কুল-কলেজ-বাড়ি দখল হয়ে অন্দরমহলের সুন্দরী নারী ভাগিয়ে নেওয়ার ঘটনাও সত্য। তবে আমার অভিজ্ঞতার সনদের কারণেই আমার মক্কেল ‘doubt of benefit’ সুবিধাভোগী হয়ে বেকসুর খালাস পেয়েছে। তবে আপিলের দরজা খোলা আছে।
মধ্যযুগের সামন্তপ্রভুদের হাত ধরে এক ধাপ এগিয়ে ব্রিটিশ বিস্তারবাদের থাবায় লন্ডভন্ড এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নতুন নতুন কৌশল চালে মধ্যযুগের সব হেরেমখানার বন্দিনীকে রাজনন্দিনী করে ভোগের উপচারে উদ্দাম উদ্বাহু বাহুডোরে শাসন শোষণ করেছে। শাসন ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রহসনে পরিবার-সমাজ জাতিকে প্রজন্মান্তর মিথ্যার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে সমৃদ্ধ করে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ মাই লর্ড সংস্কৃতি চালু করে একটি দুর্ভেদ্য ব্যক্তিত্ব, বর্ণচোরা কুম্ভিল, স্ববিরোধী উত্তরসূরি প্রজন্মচেতনা তৈরি করে গোঁফের আড়ালে ‘অর্ধহাসি’ উপহার দিয়ে চলে গেছেন।
ঐ যে চাঁদ মামার বিদায় :এ উপমহাদেশের বিপ্লবীরা ব্রিটিশ চাঁদমামাদের বিদায়ে কী পেয়েছে? ব্রিটিশদের পশ্চাদ্দেশে বিপ্লবীরা চাবুক মেরে হাত-পা-চোখ হারিয়ে আন্দামান দ্বীপের বনের রাজা হয়ে, ফাঁসির দড়িতে ঝুলে সর্বস্ব হারিয়ে মনের আনন্দে গান ধরেছে :
‘মনের সুখে গাইব গীত
বাজাইব সারিন্দা, গাইব আউল-বাউল
জারি সারি গান, লালন ফকিরে বাঁধিব
বন্দনা সঙ্গীত।’
বন্দনাসংগীত বিপ্লবীদের বেশি দিন গাইতে হয়নি। বিপ্লবীরা সর্বহারা হয়ে অনেক কষ্টে নিজের ভিটেমাটিতে পৌঁছে দেখে ওখানে নিকটাত্মীয় বলতে কেউ নেই। ব্রিটিশদের রোষানলের আগুনে বাপ-দাদার ভিটেমাটিও রক্ষা পায়নি; বিপ্লবীদের ভিটেমাটি নিলামের টাকায় বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি, সুবিধাভোগী নিজের স্বগোত্রের গুপ্তচরদের ইংরেজ সরকার মাইনে দিয়েছে। বিপ্লবীরা তখন হয়ে এখনো ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচতে পেরেছে, বোমা বানিয়ে নিজের হাত উড়িয়ে ব্রিটিশদের মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে; কিন্তু স্বগোত্রের সুবিধাভোগী গুপ্তচর পাষণ্ডদের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। বিপ্লবীরা দেখে স্বদেশি আন্দোলন সত্যাগ্রহ হয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগ নির্মম হত্যাকাণ্ড, নবাব সিরাজউদ্দৌলা হয়ে সেনাপতি মোহনলালের দেশপ্রেমের রেখে যাওয়া অবশিষ্ট বারুদ ইংরেজ সরকার নষ্ট করেনি, করেছে তাদের স্বগোত্রের আপনজন। বিপ্লবীর যেদিকে চোখ যায়, যেদিকে তাকিয়ে দেখে :সবাই ‘মাই লর্ড’ সংস্কৃতি নিয়ে ব্যস্ত। সারিন্দা-ঢোল-করতাল নেই, বন্দনাসংগীতও কেউ গাইছে না :গিটার-ড্রামে সবাই মশগুল তিড়িংতিড়িং নেচে হেঁড়ে গলায় বারবার সবাই তেড়ে আসছে।
ভিটেমাটি ফেরত পেতে আকুতিভরা প্রার্থনায় স্বগোত্রের হয়ে বহু গোত্রের দরজায় কড়া নেড়ে চেয়ারম্যান, থানার পুলিশ হয়ে কূল-কিনারা না পেয়ে অবশেষে আবার সেই ‘মাই লর্ড’। যে ‘মাই লর্ড’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে হাত-পা হারিয়ে ব্রিটিশদের থানায় রাখা ভিসিএনবি (village crime note book) বই, দাগি ফেরারি রাষ্ট্রদ্রোহী তালিকা এখনো স্বদেশি স্যারদের হাতে লেখা হয় :থানায় লাল কালিতে যখন সংরক্ষণ হয়, বিপ্লবীদের বুঝতে আর বেশি কিছু বাকি থাকে না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করে বিপ্লবীদের ভাগ্যের বন্ধ কপাট হয়ে ললাটে চুল পরিমাণ সরে আসেনি। সংস্কৃতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি, কুম্ভীল বর্ণসংকর সংস্কৃতি ভাবনার পরিবর্তন আসুক কেউ চায়নি। বিপ্লবীরা এখন দেখছে ঘরে ঘরে তাদের স্বগোত্রে সবাই চরম ধোঁকাবাজ, গুপ্তচর, চরম মিথ্যুক, ভণ্ড-প্রতারক নারীলোভী। ভাবছে :ব্রিটিশদের তাড়িয়ে এ জাতির কী-ই লাভ হলো! বরং ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। আগে সাদা চামড়া দেখে অনুমান করা যেত, এখন যায় না; মনে হচ্ছে এখন সবাই ইংরেজদের উত্তরসূরি। সারা জীবন ইংরেজদের পদলেহন গাত্রলেহন করে রাতারাতি নাইট, চোর-ডাকাত রায়বাহাদুর খানবাহাদুর হয়ে দিকে দিকে সবাই এখনো ইংরেজ সাহেব। বিপ্লবী কনস্টেবল এবার সবহারা সর্বহারা হয়ে ব্রিটিশ উত্তরসূরিদের অকাট্য নষ্টের ধারে ভারে ভয়ে ভাবছে কাঁপছে। কেঁদে কেঁদে বলছে ‘দেশমাতা, চাই না তোমার আশীষ, শক্তি-সাহসের প্রমাণ...
নষ্টদের সাধুবেশে করেছ মহীয়ান আমাকে দিয়ে বলিদান।
নষ্টদলের এখনো আতঙ্ক আমি
তোমার পাহারার কনস্টেবল বলে জানি।
n লেখক :প্রাবন্ধিক ও কবি

