হারাচ্ছি জীববৈচিত্র্য, ডেকে আনছি মৃত্যু

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২১, ২১:৪৫

প্রতি বছর পৃথিবীর ১৫০টি দেশে পরিবেশপ্রেমীরা পালন করেন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছরের বিষয়বস্তু ছিল বাস্তুতন্ত্র। বাস্তুতন্ত্রের চারটি মূল উপাদান—বায়ু, পানি, মাটি ও জীববৈচিত্র্য। আমরা যে পরিবেশে বেঁচে আছি, সেখানে প্রতিটি প্রাণ ও উপাদান পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলেই আঘাত লাগে প্রকৃতির ভারসাম্যে। বিজ্ঞানীরা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আমরা পৃথিবীর মানুষ এরই মধ্যে তিনটি প্রধান উপাদানের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছি। এগুলো হচ্ছে—জীববৈচিত্র্য, নাইট্রোজেন ও জলবায়ুর পরিবর্তন। ১৭৫০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পৃথিবীর বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ২৮০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) থেকে বেড়ে প্রায় ৪১০ পিপিএম হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় উত্তাপ যদি আরো শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তবে বাস্তুতন্ত্রে প্রবল আঘাত লাগার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে অন্য দৃশ্য অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। পৃথিবীর ঔদাসীন্য অবস্থান অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। আমাদের আজকের পৃথিবীর অভিজ্ঞতাও জানিয়ে দিচ্ছে এমনই চিত্র। আইলা, বুলবুল, আম্ফান, ইয়াস এমনভাবে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে উপকূলে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাপন ও বাস্তুতন্ত্রকে।

লাগামহীন আর অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কৃষিক্ষেত্রে যথেচ্ছ রাসায়নিকের প্রয়োগ, বনাঞ্চলের সংকোচন, যত্রতত্র দূষিত বর্জ্য নিক্ষেপ, নদী-জলাশয় ভরাট আর দখল করার প্রতিযোগিতা আমাদের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করার পথে ধাবিত করছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ) ২০২০ সালের রিপোর্টে প্রকাশ করেছে, ১৯৭০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পৃথিবীর পাখি, মাছ, উভচর প্রাণী ও সরীসৃপের সংখ্যা ৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পৃথিবীর বসবাসযোগ্য  ভূমির তিন-চতুর্থাংশ এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ইতিমধ্যে মানুষ বদলে দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান উত্তাপ, আর্দ্রতার তারতম্য, বনাঞ্চলের সংকোচন, সর্বোপরি কৃষিজমিতে লাগামহীন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মাটিতে বসবাসকারী অণুজীবের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। পুষ্টিচক্রের বিঘ্ন ঘটার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে স্থলভাগের কেঁচো, মৌমাছি, জোনাকি এবং জলাশয়ের শামুক ও নানা ধরনের মাছ।

মানুষ বাস্তুতন্ত্র থেকে নানা উপাদান নিয়ে বেঁচে থাকে। একজন মানুষ বাস্তুতন্ত্রকে যতটা প্রভাবিত করে, তা হিসাব করা হয় ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট থেকে। কোনো দেশের জনসংখ্যা, ভোগ্যদ্রব্যের উত্পাদন, অন্যান্য পণ্যদ্রব্যের আমদানি ও রপ্তানি, বর্জ্যের পরিমাণ ইত্যাদির নিরিখে ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট পরিমাপ করা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, একজন মানুষের ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট ১ দশমিক ৭ গ্লোবাল হেক্টরের মধ্যে থাকলে পৃথিবী তার প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে উত্তর আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, আমেরিকাসহ উত্তর এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় একজন মানুষের ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট ৫ গ্লোবাল হেক্টর অতিক্রম করেছে। অনুন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত—সব দেশ মিলিয়ে বর্তমান পৃথিবীর ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট ২ দশমিক ৮ গ্লোবাল হেক্টর। অর্থাত্, আমরা পৃথিবীর মানুষ ইতিমধ্যে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সীমা অতিক্রম করে বেঁচে আছি।

সম্প্রতি বর্ষার কিছু আগে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলসহ সুন্দরবন বদ্বীপে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঝড়ের আঘাতে বারবার ছিন্নভিন্ন হচ্ছে উপকূল ও সুন্দরবনের বসত এলাকা। এই দুর্যোগকে সাময়িক ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, জীবাশ্ম গ্যাসের নিঃসরণ পৃথিবীর উত্তাপ বাড়িয়ে তুলছে। সেই তাপের ৯০ শতাংশই বাড়িয়ে দিচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলতলের উত্তাপ। আর সেই উষ্ণ হয়ে ওঠা জলতল থেকেই ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করছে ঘূর্ণিঝড়। আরবসাগর, ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগরসহ সব সাগর-উপসাগরের জলতল দ্রুত উষ্ণ হয়ে ঘূর্ণিঝড় উপহার দিচ্ছে, বিশেষ করে দেশের উপকূলবর্তী স্থানগুলোতে। বঙ্গোপসাগর লাগোয়া ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে সুন্দরবনের বদ্বীপ অঞ্চলে। প্রকৃতির এই দুর্বিপাকের কারণেই আজ অস্তিত্বের সংকটে সুন্দরবনের একাধিক দ্বীপ।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও খাড়ি-খালগুলো ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবতা অনেকাংশেই প্রশমন করেছে বারবার। ফলে যেখানে মৃত্যু হওয়ার কথা ছিল অনেক বেশি, সুন্দরবন সেখানে অনেককেই বাঁচিয়ে রেখেছে। সে কথা মাথায় রেখে নিম্নচাপ সৃষ্টির সাধারণ সময়কাল বুঝে কিছু প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আমরা নিশ্চয়ই গড়ে তুলতে পারি। বাইন, কেওড়া, সুন্দরী গাছ ঝড় প্রতিরোধ করতে পারে এবং হেঁতাল, গরান, ধানিঘাস জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে সক্ষম। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নদীপথকে নিরুপদ্রব ও স্বাভাবিক রাখতে হবে। খাড়ি-নদীগুলোর গভীরতা কমানো যাবে না, অরণ্য সংক্ষিপ্ত করা যাবে না। মজবুত ঢালযুক্ত কংক্রিটের বাঁধ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বাঁধের কোল বরাবর গেওয়া, বাইন ও হেঁতাল গাছ লাগাতে হবে। প্রতিদিনের পলিসঞ্চয় বিঘ্নিত হয় বা নদীচরে ম্যানগ্রোভের প্রাকৃতিক বংশবিস্তার বিনষ্ট হয় এমন কাজ থেকে মানুষকে বিরত থাকতে হবে। সারসংক্ষেপ এমনই—প্রথমত, সুন্দরবনের মনুষ্য অধ্যুষিত দ্বীপের নদীবাঁধকে আবৃত করতে হবে এবং জঙ্গলাকীর্ণ দ্বীপগুলোর অভ্যন্তরে প্রচুর সংখ্যায় ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের বিধ্বংসী তাণ্ডব রুখে দেওয়ার জন্য এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যই প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করবে। দ্বিতীয়ত, সুন্দরবনের মনুষ্য অধ্যুষিত দ্বীপগুলোর চারপাশের নদীগুলোতে নিয়মিত ব্যবধানে ড্রেজিংয়ের বন্দোবস্তের মাধ্যমে নদীবক্ষের নব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। 

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা