রক্তচাপ বাড়ছে মমতার

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২১, ২২:১১

হাতে আর মাত্র ৬৫ দিন। তারপর কি মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী পদে বহাল থাকতে পারবেন? এর উত্তর জানার আগে সার্বিক পরিস্থিতি একটু বুঝে নেওয়া যাক। অনেক সময় পচা শামুকেও মানুষের পা কেটে বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ক্ষেত্রেও তেমন ঘটনা ঘটেছে। তারই হাতে গড়া নন্দীগ্রামের নেতা শুভেন্দু অধিকারী দলবদল করে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। আর বিধানসভা নির্বাচনে জেদবশত সেই নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে নির্বাচনে লড়ে শুভেন্দুর কাছে সামান্য ব্যবধানে হেরে যান মমতা। যদিও এই হার মেনে নিতে পারেননি তিনি। মামলা হয়েছে। মমতা হারলেও তার দল তৃণমূল কংগ্রেস ভূমিধস বিজয় পেয়েছিল। ২১৩ আসনে জয় লাভ করেছিল তৃণমূল, এর বিপরীতে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৭৭টি আসন। সম্প্রতি বিজেপির দুজন বিধায়ক মমতার দলে যোগদান করেছেন, এবং দুজন পদত্যাগ করেছেন। ফলে বিজেপির বিধায়কসংখ্যা এখন ৭৭ থেকে কমে ৭৩ হয়েছে। সুতরাং নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতায় থাকতে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো সমস্যাই হবে না। এদিকে ‘দুয়ারে সরকার’ নামে জন ও গণমুখী সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে তৃণমূল সরকারের জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। কিন্তু এত কিছুর পরও শান্তিতে নেই মমতা ব্যানার্জি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিধানসভা নির্বাচনে হেরেও মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিতে পেরেছেন বটে। তবে ভারতের সংবিধান অনুযায়ী মমতাকে শপথ গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো একটি বিধানসভা আসন থেকে উপনির্বাচন জয়ী হয়ে আসতে হবে। আর এই ছয় মাস শেষ হচ্ছে আগামী ৫ নভেম্বর। অর্থাত্ হাতে মাত্র ৬৫ দিন।

মনে হতে পারে, জটিলতা কোথায়? উপনির্বাচনের মতো আসন কি ফাঁকা নেই? আছে, সাতটি বিধানসভা আসন ফাঁকা আছে। আর ফাঁকা না থাকলেও দলের কোনো বিধায়ককে পদত্যাগ করিয়ে সেই আসনে উপনির্বাচন করা তো কঠিন কিছু নয়। তাহলে সমস্যা কোথায়? মমতা কি আবারও হেরে যাওয়ার ভয় করছেন? না, মমতার হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৃণমূল কেন, বিরোধী দল বিজেপিও করছে না। আর এখানেই সমস্যা দেখছে তৃণমূল।

মমতা তার নিজের কেন্দ্র কলকাতার ভবানীপুর বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনে লড়বেন। সেখানে জিতেছিলেন সিনিয়র বিধায়ক শোভনদেব চ্যাটার্জি। তিনি অনেক আগেই সেই আসন থেকে পদত্যাগ করেছেন। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, সেই আসন থেকে জিতে আসতে মমতার সামান্যতম বেগ পেতে হবে না। এমনকি বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস দল বিজেপিকে ঠেকাতে মমতার ঐ আসনে প্রার্থী না দেওয়ার কথা ভেবেছে। সবই তো ঠিক আছে। তাহলে মমতার রক্তচাপ কেন বাড়বে? তার কারণ তৃণমূল মনে করছে, বিজেপি যে কোনো উপায়ে হোক, উপনির্বাচন ৫ নভেম্বরের পরে অনুষ্ঠানের জন্য সব ধরনের চেষ্টা করে চলেছে। তার প্রমাণও পর্যবেক্ষক মহল দেখতে পাচ্ছে। বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা তথাগত রায় গত ২৯ আগস্ট টুইট করে বলেছেন—পশ্চিম বাংলায় এখন থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কি উপনির্বাচন করা উচিত? না, না, এই অবস্থাতে কোনো ঝুঁকি নেওয়া মোটেই উচিত নয়।

তার এই টুইটের পর পরিষ্কার হয়ে যায়, এখন বাংলায় উপনির্বাচন চায় না বিজেপি। তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘রাজ্যে দৈনিক সংক্রমণ বেড়ে ৭১৭, কলকাতায় বেড়ে ১২০-এর কাছাকাছি। এখন উপনির্বাচন? এরপরে সেপ্টেম্বরে তো বন্যা হবেই! অক্টোবরে দুর্গাপুজো। নভেম্বর মাসের ৪ তারিখে কালীপুজো, ৬ তারিখে ভাইফোঁটা, ১০ তারিখে ছটপুজো, ১৩ তারিখে জগদ্ধাত্রীপুজো। এসব পার করে উপনির্বাচন, পুর নির্বাচন (পৌরসভার নির্বাচন), সব হোক!’

তার মানে সব পরিকল্পনা ঐ ৫ নভেম্বর তারিখকে টার্গেট করে। উপনির্বাচনের ইস্যুতে এই প্রথমবার নয়, আগেও বিজেপির সাবেক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি তথাগত রায় টুইটে লিখেছিলেন—বাংলায় লোকাল ট্রেন, স্কুল-কলেজ বন্ধ। একটা থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে উপনির্বাচন কী করে হবে? উল্লেখ করা যেতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও বলেছেন—‘রাজ্যে শতাধিক পুরসভা ও পুরনিগমে এত দিন কোনো ভোট হয়নি। বিধানসভা উপনির্বাচন নিয়ে এত তাড়া কীসের? কোভিড বাড়লেও তৃণমূল নির্বাচন চাইছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা সচেতন থাকতে বলছেন।’

কিন্তু তৃণমূল বলছে উলটো কথা। আট দফায় বিধানসভা নির্বাচনের সময় করোনার যেই খারাপ পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় এখন অনেক ভালো অবস্থা। সংক্রমণের হার আড়াই শতাংশের কাছাকাছি। সংক্রমণের সংখ্যাও ৫০০-৭০০-এর মধ্যে। কলকাতায় মেয়র ফিরহাদ হাকিম গত সপ্তাহে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বিধানসভা নির্বাচনের সময় আট দফায় কেন ভোট করা হয়েছে? সেই সময় প্রত্যেক সপ্তাহে সপ্তাহে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ প্রত্যেকে পাড়ায় পাড়ায় এসে মিটিং-মিছিল করেছেন। সেই সময় করোনার প্রকোপ ছড়ায়নি? সেই সময় বাংলায় দৈনিক গড়ে ৩০ হাজার করোনার সংক্রমণ ছিল। তাই এখন যখন উপনির্বাচনের কথা হচ্ছে আর যেখানে করোনা বিধি মেনে উপনির্বাচন করার কথা হচ্ছে, তখন বিরোধী শিবিরের কেন এত সমস্যা হচ্ছে! আসলে বিজেপি ভয় পেয়েছে। তুমি মহারাজ সাধু হলে আমি আজ চোর বটে।’

স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছে বিজেপি। না হলে এমন কথা বললেন কী করে বিজেপি নেতা। রাজ্যের সাত কেন্দ্রে যেখানে উপনির্বাচন হওয়ার কথা, সেখানের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। এই অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গে একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে দ্রুত উপনির্বাচনের দাবিতে আবারও দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে যাচ্ছে তৃণমূল। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা সৌগত রায়, সুখেন্দুশেখর রায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল সাংসদদের একটি দল কমিশনে যাবে। উল্লেখ থাকে যে, পশ্চিমবঙ্গে মোট সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট বকেয়া আছে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে জঙ্গিপুর ও শামসেরগঞ্জে বিধানসভা নির্বাচনের সময় ভোটগ্রহণ হয়নি। ভোটে জিতলেও ফল ঘোষণার আগেই করোনায় মারা যান খড়দহের তৃণমূল প্রার্থী কাজল সিংহ। বিধায়ক পদে শপথ নেওয়ার পরে মারা যান গোসাবার তৃণমূল বিধায়ক জয়ন্ত নস্কর। দিনহাটা ও শান্তিপুরের বিধায়ক পদ ছেড়েছে বিজেপি। আবার ভবানীপুর জিতেও মমতার উপনির্বাচনের জন্য বিধায়ক পদ ছেড়েছেন তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।

এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো, যদি ৫ নভেম্বরের মধ্যে উপনির্বাচন না হয়, এবং মমতাকে যদি মুখমন্ত্রী পদ থেকে সরে যেতে হয়, তখন কে হবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী? পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলের মতে, এক্ষেত্রে সামনে উঠে আসছে এক নারী নেত্রীসহ রাজ্যের চার মন্ত্রীর নাম। এবং দলের শুরু থেকেই তারা মমতার সঙ্গী। তৃণমূলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, মমতার বিকল্প মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দাবিদার সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এর পরে রয়েছেন ফিরহাদ হাকিম ওরফে ববি হাকিম। তবে আরেকটি মহল মনে করছে—মমতার সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি হলেন ভবানীপুর থেকে জয়ী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। ঘটনাচক্রে তিনি এবারে জয়ী হয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে। ঐ অংশের মতে সুব্রত, ফিরহাদ বা চন্দ্রিমা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে পারেন বর্ষীয়ান শোভনদেবই। কিন্তু তিনিও তো এখন বিধায়ক নন! সব মিলিয়ে দিন যত যাচ্ছে ততই বেড়ে চলেছে মমতার রক্তচাপ। তবে অনেকেই মনে করেন, এত বিব্রতকর অবস্থা হতো না, যদি এবার হেরে যাওয়ার পরও মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ না নিতেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী, এতে তার স্বকীয় ও আপসহীন ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হতো। বিদ্বজ্জনেরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা এই উপমহাদেশের অতীতের অনেক উত্তাল ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। এজন্য পশ্চিমবঙ্গে কী হচ্ছে—সেটা উপমহাদেশকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি অতিরিক্ত খেলা খেলছে। পাকিস্তানের সময়েও পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে করাচি-ইসলামাবাদ এমনভাবেই খেলেছিল। তার শেষ পরিনাম কিন্তু ভালো হয়নি।

n মাটিভাঙা, পিরোজপুর