প্লাস্টিক বর্জ্য জৈব প্রক্রিয়ায় সহজে মাটিতে মিশে যায় না বলে এগুলো পরিবেশের জন্য দিন দিন আরো বেশি হুমকি হয়ে উঠছে। তবে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে অপরিশোধনযোগ্য প্লাস্টিককে পরিবেশে মিশিয়ে দেওয়ার উপায় খুঁজে হয়রান হলেও দৈবক্রমে এমন এক ধরনের ছত্রাক সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্লাস্টিককে আক্ষরিক অর্থেই ‘খেয়ে ফেলছে’।
‘বায়োহোম’ নামক একটি বায়ো-ম্যানুফ্যাকচারিং ফার্মের প্রধান বায়োটেক প্রকৌশলী সামান্থা জেংকিন্স অন্য এক বিষয়ে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে দৈবক্রমে এ প্লাস্টিক-খেকো ছত্রাকটি আবিষ্কার করেন। পলিইথাইলিন টেরেপথালেট বা পিইটি এবং পলিইউরিথেন প্লাস্টিকের ওপর তিনি সর্বপ্রথম ছত্রাক দ্বারা প্লাস্টিক কনজিউমিং ঘটনার পরীক্ষাটি করেন।
তবে ছত্রাক ব্যবহার করে প্লাস্টিক কনজিউম করার পর ঐ ছত্রাক আবার পরিবেশের জন্যে অন্য কোনো দিক দিয়ে ক্ষতি বয়ে আনে কি না সেটা ছিল অন্যতম চ্যালেঞ্জ। স্বস্তির কথা এই যে, ভক্ষণকৃত প্লাস্টিক এবং ছত্রাককে বিভিন্ন খাবার তৈরির জন্য, এন্টিবায়োটিক তৈরির কাজে এবং পশুর জন্য ফিডস্টক তৈরিতে কাজে লাগানো যায়।
পলিইথাইলিন টেরেপথালেট বা পিইটি থেকে পাওয়া টেরেপথ্যালিক অ্যাসিডকে ভেঙে ভ্যানিলিন তৈরি করতে ছত্রাক ছাড়াও ই-কোলাই নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া ল্যাবরেটরিতে তৈরি বিশেষ সংস্করণ সম্প্রতি ব্যবহার হচ্ছে। এই ভ্যানিলিন আবার আমাদের খাবারের সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহূত হয়।
জার্মানির স্থানীয় একটি আবর্জনা ফেলার ভাগাড় থেকে ‘লাইপজিগে হেলমহোল্টত্স সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ’ নামক একটি গবেষক দল আরেকটি ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন, যা প্লাস্টিকের কিছু অংশ খেয়ে ফেলে এবং বাকি অংশকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড হিসেবে বাতাসে মিশিয়ে দেয়। গবেষক দলটি মূলত ‘সিউডোমোনাস এসপি টিডিএ-১’ নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থেকে উদ্ভূত এনজাইমকে পলিইউরিথেন জাতীয় প্লাস্টিককে ভাঙার জন্য ব্যবহার করেছেন।
‘কারবিওস’ নামে একটি ফরাসি কোম্পানি জৈব প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিককে পরিবেশে মিশিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে। তারা সম্প্রতি ল’রিয়েল এবং নেসলের মতো দুটি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। কোম্পানিটি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পিইটি ভাঙতে সক্ষম এমন একটি এনজাইম আবিষ্কার করেছে। এ এনজাইমটি মূলত কম্পোস্টের মধ্যে থেকে পাওয়া যায়।
এছাড়া কোম্পানিটি ফেলে দেওয়া অকেজো প্লাস্টিক থেকে বিশ্বে প্রথমবারের মতো ‘ফুড গ্রেড’ পিইটি প্লাস্টিক বোতল তৈরি করেছে, যা বিশ্বে এই প্রথম। তবে এতসব সাফল্যের পরেও প্রশ্ন থেকে যায় যে, এ প্রক্রিয়া বাণিজ্যকভাবে পরিচালনা করা কতটুকু লাভজনক হবে এবং এসব অণুজীব ব্যবহারের ব্যাপকতায় প্লাস্টিক জাতীয় জিনিসের স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়বে কি না সে বিষয়ে।
‘কারবিওস’ বলছে, জৈব প্রযুক্তি দিয়ে যে কোনো পিইটি বর্জ্যকে যে কোনো রকম পিইটি পণ্য হিসেবে রিসাইকল করা সম্ভব হলেও এভাবে উত্পাদিত প্লাস্টিক বোতলের দাম প্রচলিত উপায়ে তৈরি বোতলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেশি। এর পেছনে কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা এনজাইম প্রয়োগের আগে এই বোতলকে প্রি-ট্রিটমেন্ট করে গলিয়ে ফেলার জন্যে যে বাড়তি খরচ হয়, সেটাকে উল্লেখ করেছেন।
আবার বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি পলিয়েস্টার রিসাইকেল করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পেরেছেন। অন্যদিকে সারা বিশ্বে বছর জুড়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টন প্লাস্টিকপণ্য উত্পাদিত, যার মাত্র ৩৫ কোটি টন পণ্যের রিসাইকেলিং সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। অনেক দেশে প্লাস্টিক পণ্যের ‘শূন্যে’ ব্যবহারনীতি গ্রহণ করা হলেও হুট করে প্লাস্টিক পণ্যকে প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম এমন বিকল্প ব্যবস্থাও নেই আমাদের। সেই সঙ্গে আরেক প্রস্তাবিত বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের ব্যবহারের উপকারিতার পাশাপাশি অনেক অপকারিতাও রয়েছে। বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিককে কার্যকরীভাবে পচানোর জন্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে কম্পোস্টের মাধ্যমে করতে হয়। আবার এ প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে যে মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, তা পরিবেশকে অন্যদিক দিয়ে আরো মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম।
তবে বিজ্ঞানী ও প্লাস্টিক পণ্য রিসাইকেল প্রজেক্টে বিনিয়োগকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাবি, জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্ছিষ্ট প্লাস্টিক থেকে নিকট ভবিষ্যতে স্বল্প দামের বোতল বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা সম্ভব হবে। এ প্রযুক্তি সফলতার মুখ দেখলে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অকেজো প্লাস্টিককে নবায়ন করে পুনরায় ব্যবহার করা যাবে।
ন্যানো পার্টিকেল হিসেবে খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ায় প্লাস্টিকের কারণে আমাদের দেহে যেসব রোগ দানা বাঁধত, সেসব রোগ থেকে পাওয়া যাবে পরিত্রাণ। আগামী প্রজন্মের জন্যে গড়ে তোলা সম্ভব হবে প্লাস্টিক-দূষণমুক্ত সু্ন্দর এক ধরণি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

