বিসিজি টিকার ১০০ বছর ও বাংলাদেশ

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:২২

এ বছর ১৮ জুলাই বিসিজি টিকার ১০০ বছর পূর্ণ হলো। বিসিজি টিকা প্রধানত যক্ষ্মা বা টিবি রোগের প্রতিষেধক। আজকের পৃথিবীতে সর্বাধিক ব্যবহূত এই বিস্ময়কর টিকা প্রথম প্রয়োগ করা হয়েছিল প্যারিসের শারিতে হাসপাতালে। আজ তা প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবন। এই ভবনের দেওয়ালে একটি স্মারক ফলক লাগানো আছে, যা মনে করিয়ে দেয় বিস্ময়কর এবং লক্ষ-কোটি প্রাণ রক্ষাকারী এই টিকা উদ্ভাবনের কথা। আরো মনে করিয়ে দেয় দুজন মানুষের কথা, তারা হলেন ডাক্তার আলবার্ট ক্যালমেট (১৮৬৩-১৯৩৩) এবং পশুচিকিত্সক ক্যামিল গুয়েরিন (১৮৭২-১৯৬১)। এই দুজন বিজ্ঞানীর দীর্ঘ ১৩ বছরের নিরলস গবেষণার ফল এই টিকা। গরুর যক্ষ্মা রোগ সৃষ্টিকারী জীবিত অণুজীব মাইকো ব্যাকটেরিয়াম বোভিসের সংক্রমণক্ষমতা খর্ব করে তারা এই টিকা প্রস্তুত করেন। তাদের সম্মান জানিয়ে এই টিকার নামকরণ করা হয় ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুয়েরিন (বিসিজি) টিকা।

১৯২১ সালের গ্রীষ্মে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার উইল-হালে একটি নবজাতককে নিয়ে বেশ একটু সমস্যায় পড়েন। শিশুটির জন্মের সময় যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত তার মা মারা যান। জন্মেই বাবা-মাহীন শিশুটির নানা-নানি দুজনেই যক্ষ্মা রোগী। তারা তাদের দৌহিত্রকে অন্যের হাতে তুলে দিতে নারাজ। ডাক্তার উইল-হালে প্রমাদ গুনলেন। শিশুটির ফুসফুস মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার দখলে চলে যাবে, যক্ষ্মা শিশুটিকে রেহাই দেবে না। অথচ এভাবে শিশুটিকে মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি শিশুটিকে বিসিজি টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং শিশুটিকে ক্যালমেট ও গুয়েরিনের টিকার দ্রবণ খানিকটা খাইয়ে দেন। সেই দিনটি ছিল ১৮ জুলাই ১৯২১ তারিখ, প্রথম বিসিজি টিকাটি দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি শিশুটিকে তার মাতামহের জিম্মায় দিয়ে দিলেন। তবে সব সময় তিনি শিশুটির খোঁজখবর রাখছিলেন। কয়েক মাস পর তিনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলেন, শিশুটির দেহে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠেছে, শিশুটি মোটেই সংক্রমিত হয়নি। সেই শুরু, মানুষের হাতে এসে গেল আরেকটি মহৌষধ। এই ১০০ বছরে পৃথিবীর ৩০০ কোটি মানুষকে এই টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ১৮৫০ থেকে ১৯৫০—এই ১০০ বছরে যক্ষ্মার সংক্রমণে বিশ্বব্যাপী প্রাণ হারিয়েছে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ। মানুষের হাতে যক্ষ্মার বিরুদ্ধে লড়াই করার এমন কার্যকর টিকা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর পৃথিবী জুড়ে ১ কোটির মতো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রাণ হারায় ১২ লাখ মানুষ। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি বাংলাদেশসহ যক্ষ্মা ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি দেশের নাগরিক। আমাদের দেশে প্রতি ১ লাখে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয় প্রায় ২২১ জন এবং এর মধ্যে প্রাণ হারায় ২৪ জন। আর প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে হলো ফুসফুসের যক্ষ্মা। যক্ষ্মাকে বাংলায় ‘ক্ষয়রোগ’ বা ‘রাজরোগ’ও বলে।

তবে আশার কথা, আগামী ২০৩০-এর মধ্যে বিশ্বকে যক্ষ্মামুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।

বিসিজি টিকার শতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়, এই টিকার উদ্ভাবক ফরাসি বিজ্ঞানী আলবার্ট ক্যালমেট ও ক্যামিল গুয়েরিনকে। সেই সঙ্গে আরেক জন মনীষীর নাম উল্লেখ না করলেই নয়, তিনি হচ্ছেন জার্মান বিজ্ঞানী, ব্যাকটেরিয়াবিদ্যার জনক রোবের্টকখ (১৮৪৩-১৯২০)। তিনিই প্রথম অ্যানথ্রাক্স, কলেরাসহ যক্ষ্মা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেন।

 n লেখক :ফ্রান্সপ্রবাসী গবেষক

ছবি পরিচিতি

১) বিসিজি টিকার উদ্ভাবক, বামে ক্যামিল গুয়েরিন এবং ডানে আলবার্ট ক্যালমেট। ছবি :পাস্তুর ইনস্টিটিউট, প্যারিস

২) যক্ষ্মা রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব ‘মাইকো ব্যাকটেরিয়াম টিউবার কিউলসিস’। ছবি :তাতিয়ানা শেপেলেভা