ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ :চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৩২

আগামী ১ অক্টোবর থেকে ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কাছে ভর্তি পরীক্ষা মানেই ভর্তিযুদ্ধ। কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের চিন্তার শেষ নেই। বাবা-মা থাকেন ততোধিক টেনশনে। ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারা মানে লক্ষ্য অর্জনের পথে অর্ধেক এগিয়ে যাওয়া। এদিক থেকে পছন্দের শীর্ষে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববিদ্যা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং, জৈববিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে বহুমাত্রিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। ক্লাস রুমের বাইরে মানবজীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের পথ এখানে অবারিত। সে কারণে শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বছর চারটি অনুষদে সর্বমোট ভর্তি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ জন। এর বিপরীতে ভর্তি হতে পারবেন ৭ হাজারের কিছু বেশি।

পুলিশের তথ্যমতে, বড় ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার দিন ঢাকা শহরে পাঁচ লাখের বেশি অতিরিক্ত মানুষের সমাগম হয়। ইদানীং জেলা শহরগুলি থেকে ভর্তি পরীক্ষার আগের দিন রিজার্ভ বাসে করে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে চলে আসেন। এতে কয়েক হাজার অতিরিক্ত যানবাহন ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। সবকিছু মিলিয়ে ভর্তি পরীক্ষার আগের দিন থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশকে গলদঘর্ম হতে হয়। পরীক্ষার দিন রাত অবধি পুরো ঢাকা শহর তীব্র যানজটে আটকা পড়ে থাকে।

শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের ভোগান্তি অবর্ণনীয়। প্রত্যেকটি পরীক্ষার্থী আমাদের কাছে যেমন নতুন সম্ভাবনার আধার, পরিবারের কাছেও প্রিয়। তাদের প্রিয় সন্তানকে একা ছাড়তে চান না। পরিবারের কয়েক জন সদস্যসহযোগে তারা পরীক্ষা দিতে আসেন। কামিয়াবি হওয়ার জন্য প্রার্থনারত মুরব্বি স্থানীয়রাও আসেন তাদের সঙ্গে। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী আত্মীয়স্বজনও চলে আসেন। আপনজনের এতসব প্রত্যাশা শিক্ষার্থীর দায়িত্বশীলতা যেমন বাড়িয়ে দেয়; বাড়তি মানসিক চাপও তৈরি করে। ভর্তি পরীক্ষার দিন ভর্তি পরীক্ষার্থী আর অভিভাবকদের এই চিত্র প্রতি বছরের। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটি বড় সংখ্যক পরীক্ষার্থী এলাকার পরিচিত কারো সঙ্গে পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে হলে অবস্থান নেন। পরীক্ষার আগের দিন মাঝরাত থেকে পরীক্ষার্থী বহনকারী গাড়ির হাঁকডাকে ক্যাম্পাস মুখরিত হয়। ক্যাম্পাসের হলগুলোর অতিথি কক্ষ, বাথরুম সেদিন আগত শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিছু ভ্রাম্যমাণ টয়লেটেরও ব্যবস্থা করা হয়। আসনবিন্যাস, লোকেশন দেখানো এমনকি মোটরসাইকেলে নির্ধারিত ভবনে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসেন। বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, রেঞ্জার, প্রক্টরিয়াল টিম শৃঙ্খলা রক্ষা ও সার্বিক সহায়তা করে থাকেন। পুলিশ সদস্যরা থাকেন সার্বিক নিরাপত্তায়। এতসব ব্যবস্থাপনার পরে পরীক্ষার্থীদের জন্য একটু স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয় না। পরীক্ষার্থীদের জন্য সারা রাত ভ্রমণের ধকল সয়ে পরীক্ষায় মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরীক্ষা খারাপ করে অনেকে ভেঙে পড়েন। এর সঙ্গে আছে অভিভাবকের চাপ। কেমন দিলে? চান্স পাবে তো? প্রতিবছর এই চিত্র ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টরা প্রত্যক্ষ করেন। এ প্রত্যাশার চাপকে কেন্দ্র করে অসাধু চক্রও সক্রিয় হয়।

এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোভিড-১৯ ও অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায় ভর্তি পরীক্ষা একযোগে আটটি বিভাগীয় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আশা করা যায় এতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হবে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের দেশে জেলা শহর থেকে বিভাগীয় শহরগুলির দূরত্ব দুই ঘণ্টার বেশি হওয়ার কথা নয়। কাজেই শিক্ষার্থীরা সকালবেলা বাড়ি থেকে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরতে পারবে বলে আশা করা যায়। প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষা ১০টায় অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর এসব কথা বিবেচনায় পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ১১টায়। পরীক্ষা বিকেন্দ্রীকরণের এই সিদ্ধান্তকে সংশ্লিষ্ট সকলেই স্বাগত জানিয়েছেন। তবে পরীক্ষার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রেসার একটু বাড়তির দিকে থাকবে। কেননা, প্রথমবারে মতো এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। যে কোনো সংস্কারেই কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে এই মডেল কার্যকর হলে অন্যদের জন্যও দৃষ্টান্ত হবে। অন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও এর সফলতার ভিত্তিতে আগামী বছর এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চান বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। কেননা, পরীক্ষার দিন পুরো ঢাকা নগরী প্রায় অচল হয়ে পড়ে। চাপ সামলাতে পুলিশকে গলদঘর্ম হতে হয়। এ বছর চিত্র ভিন্ন হবে বলে তারা মনে করেন। মাননীয় উপাচার্য রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের সহযোগিতা কামনা করেছেন। পুলিশ প্রধান এ বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পরীক্ষার নিরাপত্তা প্রদানে পুলিশের সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে। প্রথমবার অনুষ্ঠিত এ ব্যবস্থার সফলতার ওপর এই পদ্ধতির ভাগ্য নির্ভর করবে। তবে ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জের বাইরেও বাড়তি কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার প্রয়োজন হয়।

প্রত্যাশা যত বেশি অসাধু চক্রের তত্পরতাও তত বেশি। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কিছু জালিয়াত চক্র সক্রিয় হয়। তারা গুজব ছড়িয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরীক্ষার পর পরীক্ষার্থীরা তাদের ভুল বুঝতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সবচেয়ে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়। এখানে জালিয়াতি করে ভর্তির কোনো সুযোগ নেই। পুলিশের সাইবার ক্রাইম অপরাধ বিভাগ এ বিষয়ে মনিটরিং করে থাকেন। অভিভাবকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। তারা যেন তাদের সন্তানদের গতিবিধি লক্ষ রাখেন। পরীক্ষার আগে তারা প্রত্যাশার চাপে অন্ধকারের চোরাগলির সন্ধান করছে কি না খেয়াল রাখা দরকার। অলীক স্বপ্নে বিভোর না হয়ে পড়ালেখায় মনোযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রকৃত মেধাবীদের লালনকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কাজেই যোগ্যরা আসবেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি গর্ব করে থাকেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে। এটি তার মেধার একটি স্বীকৃতিও বটে। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন অপ্রত্যাশিত ঘটনার নজিরও রয়েছে। ডিজিটাল যুগের আগে কিছু শিক্ষার্থী অসাধু চক্রের সহায়তায় ডকুমেন্টস জাল করে ভর্তি হয়েছিল। শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সেসব জালিয়াতি ধরা পড়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের ছাত্রত্ব বাতিল হয়। সম্প্রতি ডিজিটাল জালিয়াতিতে জড়িত থাকায় কিছু শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে। এমনকি পাশ করে যাওয়ার পরেও এ ধরনের অপরাধীদের সনদ বাতিলের এক্তিয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে। এ ধরনের নজিরও রয়েছে। কাজেই অযথা শ্রম ও অর্থ খরচ করে অবাস্তবের পেছনে না ছুটে নিজের মেধাকে কাজে লাগালে যে কারো ভর্তির সুযোগ রয়েছে এখানে। এখানে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সুযোগ হতো না। বাস্তবতা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রামের প্রান্তিক পরিবারের। এর মধ্যে দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারের সংখ্যাও অনেক বেশি। সেসব অভিভাবকের প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় শ্রদ্ধাশীল ও তাদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেননা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শনই হলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আত্মোন্নয়ন।

গুচ্ছ বা যে নামেই বলি, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে পরীক্ষা সীমিত করার একটি প্রবল চাপ রয়েছে। এটি কি আসলেই শিক্ষার্থীদের অনুকূলে যাবে? ভেবে দেখা দরকার। কেননা, বিকল্প যত বেশি, সম্ভাবনাও তত বেড়ে যায়। যাদের জন্য এত ভাবনা, আমরা কি তাদের মতামত নিয়েছি? বাইরের জগতের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শেখাও তো শিক্ষার অংশ! এছাড়া প্রতিটি স্কুল বা কলেজের শিক্ষাক্রমের মধ্যে একটি সাদৃশ্য বিদ্যমান থাকলেও এক একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে সময়ের প্রয়োজনে ভিন্ন শিক্ষাক্রম, সুনির্দিষ্ট লক্ষ ও উদ্দেশ্য নিয়ে। কাজেই প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভর্তিতে নিজস্ব কিছু চাহিদাও থাকে। আমরা দ্বিতীয় বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগও বন্ধ করে দিয়েছি। কথায় কথায় আমরা উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টানি। সেসব দেশে কি উচ্চশিক্ষার দ্বার সময়ের বার দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়? আমরা কি আমাদের সন্তানদের হাত-পা বেঁধে যুদ্ধের ময়দানে ছেড়ে দিতে চাই?

পাদটীকা :সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে শুনেছি তার কন্যার ইচ্ছে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার। মায়ের কাছে গল্প শুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার স্বপ্ন তার মনে আসন গেড়ে বসে। কিন্তু চান্স না পাওয়ায় তাকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিশাল উন্মুক্ততা। প্রকৃতির অবাধ সান্নিধ্য, দল বেঁধে চলা শিক্ষার্থীর উচ্ছলতা, খোলা মাঠে বসে একাডেমিক আড্ডা, বিশাল লাইব্রেরি ভবন ইত্যাদি। সে বলে, ‘মা আমি গাড়ি থেকে যেখানে নামি সেটাই নাকি আমার বিশ্ববিদ্যালয়, লিফটে যে কক্ষের সামনে নামি সেটাই নাকি আমার বিভাগ, কিন্তু তোমার কাছে শুনেছি তো অন্য কিছু।’ মেয়েটি নাকি অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। মায়ের চোখে পানি দেখে আমারও মনটা ভারাক্রান্ত হয়। যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে চান্স না পেলে সব শেষ হয়ে যায় না। এখনকার দুনিয়ায় অনেক বিকল্প আছে। কম্পিউটার দুনিয়ায় সাড়া জাগানো স্টিভজব তো বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েনি, পড়েছে কলেজে পাসকোর্সে। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনেক ভালো করছে। কাজেই যে কোনো পরিবেশে নিজেকে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মতো মনস্তত্ত্ব শিক্ষার্থীদের গড়ে উঠুক।

n লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়