করোনায় নড়বড়ে বিশ্ব অর্থনীতি। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দীর্ঘমেয়াদি এই মহামারির উত্পত্তিস্থল অর্থনীতির মোড়ল ও পরাশক্তি চীন প্রভাব কাটিয়ে নতুন উদ্যমে হাঁটছে। প্রভাবশালী অনেক দেশ করোনার প্রভাব কাটিয়ে নতুন পথ চলার পথে। বাংলাদেশ দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত হলেও অর্থনীতি এখনো সঠিক পথেই। বিশেষজ্ঞদের মতামত, বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের অর্থনীতির সূচকগুলো ভালোই বলা যায়। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক ও মানবিক মনোভাবের জন্য সরকারের নেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজ এবং নীতিসহায়তার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে।
মহামারি কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার ২৩টি আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে সরকার, যা জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রেকর্ড পরিমাণ রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স আহরিত হয়েছে। নতুন উচ্চতায় রিজার্ভ। শেয়ারবাজারও ভালো করছে। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস দেশের অর্থনীতি খুব একটা ভালো যায়নি।
একসময় সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হওয়ায় সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রমের ব্যয় মিটে যেত। ফলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের প্রয়োজন হতো না। সাম্প্রতিক কালে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবং রাজস্ব আশানুরূপ না হওয়ায় সরকারকে বাধ্য হয়েই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই ও আগস্ট) ঋণ করেছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরের জন্য ব্যাংক থেকে নির্ধারিত ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত অর্থবছরে সরকারের ঋণরে চাহিদা ছিল খুব কম। অর্থবছরের শুরুর দিকে ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল, বছর শেষে পরিশোধ করতে হয় আরও বেশি। অবশ্য শেষ দিকে ২৬ হাজার ৭৮ কোটি টাকা বেড়েছিল। গত অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে সরকার রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল। ঐ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। আগের বছরটি যেখানে বড় অঙ্কের ঘাটতি দিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে নগদ উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০৩.০৯ কোটি টাকা। করোনা মহামারির মধ্যেও সরকারের উদ্বৃত্তপত্রে এই উদ্বৃত্ত পাওয়া গেছে। অথচ এর আগের অর্থবছরের এই সময়ে দেশের ঘাটতি ছিল ৪৪৮৬ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা।
২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে। প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে রেমিট্যান্স তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেড়ে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয়ে ভর করে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ২৪ আগস্ট দিন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এ পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এটিই সর্বোচ্চ। এর আগে চলতি বছরের ২৯ জুন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৪৬ বিলিয়ন অতিক্রম করে।
গত বছর রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সেবা খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ছিল ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে পণ্য খাতে ৩৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সেবা খাতে ৬ দশমিক ১৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। লক্ষ্যমাত্রার ৯৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) রপ্তানি আয় গেল অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এই সময়ে ৬৮৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ কম। গত বছরের এই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৬৮৮ কোটি ডলারের পণ্য।
দেশে নিরাপদ খাদ্য মজুতের ন্যূনতম পরিমাণ হওয়া উচিত ছিল চাল-গম মিলিয়ে ১১ লাখ টন। বৈশ্বিক মহামারির মধ্যেও দেশ খাদ্য মজুতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ পর্যন্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী খাদ্যশস্যের সরকারি মোট মজুত ১৭ দশমিক ৭০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১৫ দশমিক ৭০ লাখ মেট্রিক টন, গম ১ দশমিক ৫৫ লাখ মেট্রিক টন, ধান শূন্য দশমিক ৭০ লাখ মেট্রিক টন।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের অর্থনীতি ভালো করেছে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত সচল ছিল। ভোক্তাদের ভোগ যতটা বিপর্যন্ত হবে বলে মনে করা হয়েছিল, তা হয়নি। ফলে অর্থবছরের শেষে ভ্যাট আহরণ বেড়েছে। করোনার মধ্যেও রাজস্ব আহরণ, রপ্তানি আয়, কৃষি উত্পাদন বেড়েছে। তা ইতিবাচক। তিনি আরো বলেন, দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ভূমিকা রেখেছে। আমেরিকায় রপ্তানি বেড়েছে। যদিও করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়ে গেছে!
n লেখক :প্রাবন্ধিক

