যাত্রা শুরুর এক যুগপূর্তিতে এহেন শিরোনাম দেখে পাঠক মাত্রই আত্মসমালোচনা করার ও আরো দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেবেন। কেননা এক যুগ যে কত লম্বা সময় তা কবি সৌগত বর্মণ বা অভিজিত্ দাসের প্রেম ও বিরহের কবিতা পড়লেই উপলব্ধি করা যায়। আর মূলত যুগপূর্তিকে কেন্দ্র করে এবার এটিই আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে।
হ্যাঁ, এবারই আমাদের তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তথ্য কমিশনের যুগপূর্তি হয়েছে। এখনো সাধারণের ধারণা, তথ্যের মালিক রাষ্ট্র বা সরকার তথা আইনের ভাষায় কর্তৃপক্ষ। এটা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বিষয়, সর্বসাধারণ জানবে ততটুকুই, কর্তৃপক্ষ দয়া পরবশে যতটুকু যেভাবে জানাবে। আবার অনেকের ধারণা, এগুলো উন্নত বিশ্ব বা পশ্চিমাদের বিষয়। ২০০২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ২৮ সেপ্টেম্বর তথ্য জানার অধিকার হিসেবে দিবসটি পালিত হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ইউনেসকো এবং ২০১৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক দিবসটিকে ‘আন্তর্জাতিক সার্বজনীন তথ্যে অভিগম্যতা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে দেশে দেশে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ আইনটি পাশের মাধ্যমেই সব নাগরিকের তথ্য চাওয়া, পাওয়ার, প্রয়োজনীয় সব তথ্যে সাবলীল প্রবেশের এবং এর প্রয়োগে উপকারভোগী হওয়ার আবশ্যিক ও আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে।
তথ্য জানার ধারণাটি মানবসভ্যতার উষাকাল থেকেই পৃথিবীতে বিরাজমান। সভ্যতার ক্রমবিকাশের যে পর্যায়ে সমাজে শ্রেণি বিভাজন হয়েছে, সে পর্যায়ে ক্ষমতাবানরা সাধারণ মানুষকে অন্ধ করে রেখেছে। পঞ্চদশ শতকে যান্ত্রিক প্রেস আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে যেন বিপ্লব ঘটল। পুস্তক, সংবাদপত্র ও অন্যান্য প্রকাশনার বিস্তার ঘটতে থাকল। ছাপানো পুস্তক হাতে হাতে চলে গেল। ফলে বিভিন্ন ধারণা, চিন্তা, ভাব, বিশ্বাস ও অনুভূতিরও দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকল।
তত্কালীন ব্রিটিশ একটি আইনে শর্ত দেওয়া হলো যে, কোনো বই প্রকাশের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি নিতে হবে। আন্দোলন শুরু হলো। তথ্য অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে ১৬৪৪ সালেই বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি ও বুদ্ধিজীবী John Milton Zvui Areopagitica বইতে কালজয়ী উক্তি করলেন : ‘Give me the liberty to know, to utter and to argue freely according to conscience, above all liberties.’ এভাবে ইউরোপ জুড়েই তথ্য ও প্রেসের স্বাধীনতার আন্দোলন চলতে থাকল।
আজ থেকে প্রায় আড়াই শ বছর আগে ফিনল্যান্ডের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও ফিনিসীয় যাজক Anders Chydenius তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিয়ে রীতিমতো আন্দোলন শুরু করেন। ফিনল্যান্ড তখন সুইডেনের আওতাভুক্ত ছিল। Anders Chydenius সুইডেনের সংসদে বিল উপস্থাপন করেন। পাশ হয় সুইডেনের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আইন ১৭৬৬ সালে। এ আইনের মাধ্যমে সুইডিশ জনগণকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সৃষ্ট অথবা প্রাপ্ত দলিল-দস্তাবেজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। নাগরিকের তথ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে এটাই বিশ্বের প্রথম আইন। তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফরাসি বিপ্লবের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তথ্য জানার অধিকারকে প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি দেয় ফ্রান্স, ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবে।
পুরো ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে যখন এভাবে মানুষের তথ্যে অভিগম্যতা ও তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল তখন পাক-ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশের উপনিবেশে পরিণত হয়। শাসকরা ঢোল পিটিয়ে দয়া পরবশে যেটুকু তথ্য জনগণকে দিত, সেটুকুই তার পাওনা বলে সাধারণ মানুষের সন্তুষ্টি ছিল। অধিকন্তু ব্রিটিশ ভারতবর্ষে ১৯২৩ সালে ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ জারির কারণে তথ্য গোপনের সংস্কৃতি পাকাপোক্ত হয়ে গেল। পাকিস্তান আমলেও এর তেমন উন্নতি ঘটল না।
এদিকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলো। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৪ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে রেজল্যুশনের মাধ্যমে তথ্য অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বলা হলো, ‘Freedom of information is a fundamental right and is the touchstone of all the freedom to which United Nations is consecrated.’ পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR) জারি হয়। ঘোষণা পত্রের ১৯ অনুচ্ছেদে তথ্যের স্বাধীনতাকে সর্বজনীন মানবাধিকার হিসেবে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এটি অন্যতম ঘটনা। এরপর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৬৬ সালে গৃহীত জাতিসংঘের ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তির (ICCPR) অন্তর্ভুক্ত করে তথ্য অধিকারকে আরো সুসংহত করা হয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে জাগ্রত করে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেন। সংবিধানে মানুষের সব মৌলিক অধিকারের সঙ্গে ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার অধিকার তথা তথ্য অধিকারকে নাগরিকের অন্যতম মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। ২০০৮ সালেই জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তত্কালীন বৃহত্ দলগুলোর মধ্যে কেবল আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার করে। ২০০৯-এর ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তথ্য অধিকার আইনটি পাশ করে, গেজেট প্রকাশ ও কার্যকর করে এবং কমিশন গঠন করে।
বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ একটি আধুনিক, অনন্য ও প্রাগ্রসর আইন। এই আইনে, জনগণ কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে; কর্তৃপক্ষের কাজের, সেবার ও বাজেটের হিসাব চায়; অন্যান্য আইনে কর্তৃপক্ষ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে। আরো একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা শতাব্দীপ্রাচীন। সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ মতে উভয় বিচারের ক্ষেত্রে যিনি আদালতে বিচার প্রার্থী, Burden of proof তারই। ফৌজদারি ব্যবস্থায় যতক্ষণ আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হবে ততক্ষণ আসামি নির্দোষ বলে গণ্য হবেন। তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার আইন মতে, একটি Quasi-Judicial Court. কর্তৃপক্ষের নিকট তথ্য চেয়ে সংক্ষুব্ধ কোনো নাগরিক তথ্য কমিশনে অভিযোগ করলে কমিশন কর্তৃপক্ষ বা তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যক্রম গ্রহণ করবেন, এই আদালতে Burden of proof কর্তৃপক্ষ বা ক্ষেত্রমতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার, আবেদনকারী বা অভিযোগকারীর নয়। অন্য কথায় বিচারপ্রার্থীর নয়। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেই-বা কর্তৃপক্ষকে, না পারলে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের আদেশ বা বিভাগীয় মামলার সুপারিশ তার বিরুদ্ধে হতে পারে। এই যে জনগণ তথা নাগরিককে আইনি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষের ওপর, সে ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য সাধারণ মানুষ কি সেভাবে প্রস্তুত হয়েছে? অন্যদিকে শত বছরের গোপনীয়তার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত কর্তৃপক্ষের কি রাতারাতি সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে চাহিবামাত্র তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সব তথ্য সুর সুর করে দিয়ে দেওয়ার বা অবারিত করে দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে পুরোপুরি তৈরি আছে? তদুপরি যার দুর্নীতির অভ্যাস মজ্জাগত, তিনি তথ্য গোপনের বা বিকৃতির প্রাণান্ত চেষ্টা করে থাকেন, ধরা পড়ার ভয়ে ঢাকঢাক গুড়গুড় পরিবেশ তৈরি করে রাখেন। এমনকি সত্ বলে কথিত এমন অনেক কর্মকর্তার মধ্যেও দেখা যায় চিরাচরিত ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবল বাসনা, তথ্য গোপনের উদগ্র প্রচেষ্টা।
তবে জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠিত আইনটির বাস্তবায়নে যথেষ্ট ইতিবাচক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। অর্জনও নেহাত কম নয়। সারা দেশে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষে ৪২ হাজার ৪৫০ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তথ্য কমিশন হতে কেন্দ্র ও সব জেলা ছাড়াও শুধু উপজেলা পর্যায়েই জন-উদ্বুদ্ধকরণ অনুষ্ঠান ৫০৪টি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ৫০৬টি এবং যথেষ্ট সংখ্যায় মতবিনিময় সভা, সেমিনার সম্পন্ন হয়েছে। তথ্য প্রাপ্তি, সহজ ও নিশ্চিতকরণে ওয়েবসাইট স্থাপন ও সিটিজেন চার্টার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন তাই বিশ্বের সর্ববৃহত্ ওয়েবপোর্টাল রয়েছে।
করোনা সংকটের শুরুতেই তথ্য কমিশন ভার্চুয়াল শুনানি কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। কোনো পক্ষকেই ঢাকায় তথ্য কমিশনে সশরীরে হাজির হওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। এতে অর্থ বা সময় যেমন সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি বিড়ম্বনা এড়ানো যাচ্ছে। সর্বশেষ সচিব সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে বিভিন্ন অনুশাসন দিয়েছেন।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্য অধিকার আইন একটি বিশেষ হাতিয়ার। সম্প্রতি মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী কয়েকটি অনুষ্ঠানে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিকল্পে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ এবং তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। এভাবে তৃণমূল থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের সম্মানিত জনপ্রতিনিধিগণ কর্তৃক সব শ্রেণি-পেশার লোকজনকে নিয়ে জনগণের তথ্য অধিকার বাস্তবায়নকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারলে তথ্যে সর্বজনীন অভিগম্যতা দ্রুত নিশ্চিত হবে। সব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে; রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ রচিত হবে, আস্থার সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান আরো সুসংহত হবে।
n লেখক :প্রধান তথ্য কমিশনার, তথ্য কমিশন

