ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
২৮ °সে


‘মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ’

‘মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ’

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল

বিষণ্নতার কারণে মনে যাতনা বাড়ে। উদ্বেগের কারণেও। নেতিবাচক চিন্তার দুষ্টচক্রে (vicious cycle) আটকে যাওয়ায় এ যাতনাবোধ তীব্রতর হতে থাকে। গোলকধাঁধায় সেঁটে যায় মানব মন। ভুক্তভোগী এই ফাঁদ থেকে বেরোনোর চেষ্টা করারও সুযোগ পায় না। ভুগতেই থাকে। অনেক সময় আত্মহত্যার চিন্তা জাগে মাথায়। চিন্তা থেকে আসে পরিকল্পনা। পরিকল্পনা থেকে নিজেকে হননের প্রচেষ্টায় ঝাঁপ দেয় বিশ্বের বিরাট জনগোষ্ঠী—প্রতি বছর প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে; প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে চলে যাচ্ছে পরপারে। ১৫ থেকে ২৯ বছরের কিশোর-তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল হেলথ অবজারভেটরি সর্বশেষ রিপোর্ট (২০১৮) অনুযায়ী বাংলাদেশের আত্মহত্যার হার ২০১৬ সালে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রতি লাখে ৬.১, শুধু নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ৬.৭, পুরুষের ক্ষেত্রে ৫.৫। অর্থাত্ দেশেও বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে। নেতিবাচক চিন্তার জালে জড়িয়ে বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি করছে। ভেঙে পড়ছে সর্বত্রই। কষ্টে ভুগছে, ভুগেই চলেছে।

না। কেবল ভুগলেই চলবে না। চ্যালেঞ্জিং মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে। নেতিবাচক চিন্তার ফাঁদ থেকে বের হতে হবে—মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। মনের স্বাস্থ্যের উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। এবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে এ ডাক এসেছে। এর জন্য প্রয়োজন দুষ্টচিন্তার ধাঁধা থেকে নিজেকে বের করে আনা। কীভাবে? বাজে চিন্তা চ্যালেঞ্জ করতে হবে, বিকল্প চিন্তার শক্তি বাড়াতে হবে—এভাবে নেতিবাচক চিন্তা ধীরে ধীরে ইতিবাচক হতে বাধ্য। মনের যাতনাও তখন কমে আসতে বাধ্য। এভাবে মনে শান্তি আনা যায়, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো যায়। প্রথমে নেতিবাচক চিন্তা শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে শনাক্ত করার প্রশিক্ষণের জন্য মনোচিকিত্সার মনোথেরাপি গ্রহণ করতে হবে। চারটি প্রশ্ন করে নেতিবাচক চিন্তার যথাযথ জবাব পাওয়া যেতে পারে :১. নেতিবাচক চিন্তার পেছনে কী প্রমাণ আছে, খুঁজে দেখতে হবে এভিডেন্স। মনে প্রশ্ন জাগাতে হবে। প্রশ্ন জাগানোর অর্থ হচ্ছে ঘটনার সত্যতার সঙ্গে নিজের মনে জেগে ওঠা চিন্তার যোগসূত্র ও সত্যতা যাচাই করা। চিন্তাটি কি ঘটনার সত্যতার সঙ্গে মিলছে? নাকি মিলছে না। যাচাই করে দেখতে হবে।

২. বিকল্প মতামত বা মূল্যায়ন কী হতে পারে? একই ঘটনাকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, মূল্যায়ন করা যায়, ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়, উত্তর পাওয়া যায় না। মন যা ভাবছে সেটিই কী সত্য? নাকি ঘটনার সঙ্গে বিকল্প কোনো সত্য লুকিয়ে আছে? প্রশ্ন করতে হবে নিজেকে। নেতিবাচক চিন্তাটি প্রশ্নের মুখোমুখি হলে মূল সত্য নিজের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেগে উঠবে। থেরাপিস্ট বা অন্য কেউ মনের ওপর আসল সত্য চাপিয়ে দিলে মন বুঝবে না, তা মেনে নেবে না, মনের মধ্যে নতুন বোধ বা ধারণা তৈরি হবে না। পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ দাঁড় করিয়ে পুনরায় ঘটনাটি মূল্যায়ন করতে হবে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে মূল সত্য উদ্ঘাটনের পদক্ষেপ নিলে নেতিবাচক চিন্তার বিকল্প চিন্তা—ইতিবাচক সত্য প্রমাণসাপেক্ষে উপলব্ধি করতে বেগ পেতে হবে না। সহজে বোধে চলে আসবে সঠিক উত্তর। বাস্তবতার দরজা ধীরে ধীরে নিজের সামনে খুলে যাবে।

৩. নিজে যা চিন্তা করছি, সেটির ফলাফল কী? পরিণামটি একবার খুঁজে দেখতে হবে। যা অনুভব করছি কিংবা যে কাজ করছি সেটি কীভাবে নিজেকে প্রভাবিত করছে? এভাবে চিন্তা করার ভালো দিক কী কী, খারাপ দিকই বা কী, উপকার ও অপকার খুঁজে দেখতে হবে। নিজের জন্য মঙ্গলজনক, এমন বিকল্প কিছু কী খুঁজে পাওয়া যায় না?

৪. কী কী যৌক্তিক ভুল করছি নিজে? যখন সবসময় রোগী একই ভুল করতে থাকে, প্রশ্নটি সেই ভুল ধরিয়ে দিতে সহায়তা করবে।একটিমাত্র ঘটনার আলোকে কী নিজেকে মূল্যায়ন করছি? (Overgene-ralization) কেবল কী নিজের দুর্বলতার দিকে নজর দিচ্ছি? দুর্বলতাটুকুই দেখছি কেবল? নিজের সামর্থ্যের কথা কী আমলে আনতে পারছি না? নিজের দক্ষতা বা ইতিবাচক শক্তির কথা কী ভুলে যাচ্ছি? (Selective Abstraction) ১০০ ভাগ না পেলে কী কিছুই পাওয়া হলো না—এমন চিন্তায় কী বিভোর আছি? (Dichotomous Reasoning) এমন কোনো দায়দায়িত্ব কী কাঁধে নিচ্ছি, যেটির জন্য নিজে মোটেই দায়ী নই? (Personalization) পুরো ঘটনা বিচার না করে জাম্প করে কী কোনো সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে নিচ্ছি? (Arbitrary Inference)। উপরোক্ত চারটি মূল ইস্যু সামনে রেখে নেতিবাচক চিন্তা চ্যালেঞ্জ করার ২০টি প্রশ্নের দিকে এখন নজর দেব আমরা। এসব প্রশ্ন মূল নেতিবাচক চিন্তার দৃঢ় অবস্থান থেকে আমাদের সরিয়ে আনতে সাহায্য করবে, বিকল্প উত্তর খুঁজে পেতে শক্তি জোগাবে। মনে রাখতে হবে, উদাহরণগুলো সম্ভাব্য সত্যটি এনে দেবে। নিজের জন্য কোনিট প্রযোজ্য, সেটি নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।

নেতিবাচক চিন্তা ১ : আজ বিকালে লাইফ অ্যান্ড লাইট হসপিটালের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। আনন্দ সিনেমা হলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে রিকশায় উঠল বন্ধু সাজ্জাদ। সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ডাকলাম তাকে। সে তাকাল কিন্তু হাসল না। নিশ্চয়ই আমি ওর মনখারাপের মতো কোনো কাজ করেছি।

সম্ভাব্য উত্তর : সাজ্জাদ হাসেনি সত্য। সে মনঃকষ্ট পেয়েছে এ কারণে হাসেনি, এমন চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। হতে পারে ছবির কাহিনি তার মনে যাতনা তৈরি করেছে অথবা সে অনেক কাজের চাপে ব্যস্ত ছিল।

নেতিবাচক চিন্তা ২ : নিজের হাতে খিচুড়ি রেঁধেছি আমি। স্বামীকে খেতে দিয়েছি। খেল না সে। নিশ্চয় ভাবছে, আমি বাজে রান্না করেছি।

সম্ভাব্য উত্তর : সে খায়নি। এটা সত্যি। কিন্তু সে যে আমার রান্নার ব্যাপারে বাজে ধারণা করছে, তা তো আমি জানি না। এমনো হতে পারে, তখন তার খিদে ছিল না। তাকে না খাওয়ার কারণ আমি জিগ্যেস করতে পারি।

নেতিবাচক চিন্তা ৩ : ঐ কাজটি করা ছিল ভয়াবহ ভুল। জীবনে আর কখনো সঠিকভাবে কাজটি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

সম্ভাব্য উত্তর : বিষণ্ন না থাকলে কাঁধ উঁচিয়ে চলতে পারতাম আমি। এমন ভুল হতো না। তুড়ি মেরে সব উড়িয়ে দিতে পারতাম। সঠিকভাবে কাজটি আমি আবার করতে পারব। ভুল থেকে শিক্ষা নেব। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষ লাভবান হতে পারে। আমিও হব। সেদিন বন্ধু দেবাশিসও একই ভুল করেছিল। ওর গার্লফ্রেন্ড গ্রোলির কাছে হাসতে হাসতে মহা বড়ো ভুল স্বীকার করেছে। বলেছে ভুলই তাকে শুদ্ধতম জীবনের শিক্ষা দিয়েছে। আর ভুল করবে না সে। আমিও আমার ভুলটি দেখেছি। ভুল আবার শুধরে নেব। জয় করব।

নেতিবাচক চিন্তা ৪ : একদম হতাশাজনক, যা করেছি একদম নৈরাশ্যজনক। এখন আমার আরো ভালো করা উচিত।

সম্ভাব্য উত্তর : ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা বড়ো কাজ এখন। যা ভেবেছি তাতে আমার কোনো লাভ হবে না। এভাবে ভাবলে আমার মনের অবস্থা আরো খারাপ হবে। এখন আমাকে আরো ভালোভাবে কাজটি করতে হবে। আমাকে প্র্যাকটিস করতে হবে। নিজেকে নেতিয়ে রাখলে তা করা সম্ভব নয়। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস (২০১৯)-এর মূল কথা ‘মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ’। এজন্য প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা—সমাজে বিদ্যমান অজ্ঞতা ও ভুল ধারণা দূর করা। কুসংস্কারের বাধা অতিক্রম করা। নেতিবাচক চিন্তার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা। তাহলে উন্নতি ঘটবে মনের স্বাস্থ্যের। প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে আত্মহত্যার মতো বেদনাদায়ক ঘটনা।

n লেখক : কথাসাহিত্যিক, বাংলা একাডেমি ফেলো। পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন