বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭
২৮ °সে

লকডাউনে কেমন কাটছে রমজান

লকডাউনে কেমন কাটছে রমজান
লকডাউনে কেমন কাটছে রমজান।ছবি: ইত্তেফাক

মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বের প্রায় সবাই নিজ গৃহে আবদ্ধ হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মাঝে এসেছে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে প্রিয় মাস রমজান। বিশ্বের অন্যান্য মানুষের ন্যায় আমারও গৃহের চার দেয়ালে আজ প্রায় ৪৯ দিন চলছে।

চার দেয়ালে বললে ভুল হবে, কেননা প্রায় প্রতিদিনই কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ছাদে যাওয়া হয়। যেহেতু ছোটখাটো একটা ছাদবাগান করেছি, তাই গাছগুলোর পরিচর্যা জন্য কিছুটা সময় ছাদে অতিবাহিত করি। এছাড়া বাকী সময়টা ঘরেই পরিবার নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে। সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে অবস্থান করার ফলে ইবাদতের প্রতি এবার মনোযোগও কিছুটা বেশি দেওয়া যাচ্ছে। লকডাউনের এই দিনগুলোতে কেমন কাটছে রমজান। তা জানার জন্য কথা বলি কয়েকজন নারীর সাথে। জানতে চাই তাদের অভিব্যক্তি।

এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিনিয়র অফিসার মিসেস আরিফা রহমান বলেন, ‘লকডাউন নিয়ে আমার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে হলে প্রথমেই বলতে হয়, এতো প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু জিনিস ভীষণ রকমের ভালো লাগছে। পরিবারের সাথে সুন্দর একটা সময় কাটছে। প্রতিদিন ঘরেই সন্তানদের নিয়ে বাজামাত নামাজ আদায় করার সুযোগ হচ্ছে। এছাড়া দোয়া শেখার প্রতিনিয়ত যে চেষ্টা, কোরআন তেলাওয়াত, হাদিস ও ইসলামী বই-পুস্তক পাঠ, ছোট ছোট সুখের স্মৃতি চারণ, মোটকথা সময়গুলোকে ভালোভাবে কাটানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করে চলেছি। এছাড়া ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেকটি কাজ করারও চেষ্টা করছি। সর্বোপরি, দেশের ও বিদেশের এই প্রতিকূলতার জন্য দোয়া চেয়ে আল্লাহতায়ালার কাছে সর্বক্ষণ সাহায্য যাচনা করছি, যাতে এই পরিস্থিতি থেকে বিশ্বকে উদ্ধার করেন।’

লকডাউনে কেমন কাটছে রমজান এমন প্রশ্ন রেখে জানতে চাইলে স্নাতক ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী সিদ্দিকা আহমেদ বলেন, ‘এমন প্রশ্নে আংশিক ধারণা করা যায়, অন্য যেকোন সময়ের থেকে এই রমজান অনেকটাই ভিন্ন রকম অবস্থার মধ্যে এসেছে। বর্তমান সময়ে সারা ব্শ্বিব্যাপী মহামারির প্রকোপ চলছে। এই প্রকোপ থেকে বাঁচতে সবাইকে ঘরের মধ্যে অবস্থান করতে হচ্ছে। আর এতে আমাদের স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে। আর এই সময়ে আমরা পেয়েছি পবিত্র রমজান মাস। ইবাদতের বসন্তকাল হচ্ছে রমজান। দীর্ঘ লকডাউনের সময়টাতে ইবাদতের জন্য বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। দিনের অনেকটা সময় কোরআন-হাদিস পড়তে পারছি। আর এই দীর্ঘ বিরতিতে পরিবারের সাথে সময় দেয়া এবং পরিবার থেকে বিভিন্ন কাজ শেখারও সুযোগ পাচ্ছি। এক কথায় লকডাউনে আমার রমজান বেশ ভালোই কাটছে।’

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোহিনুর বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লকডাউনে ভালোই কাটছে রমজান। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ তাই তারা এই সময়টুকু ইবাদতের কাজে লাগাচ্ছে। ঘরে সময়মতো পরিবারের সবাই মিলে বাজামাত নামাজ আদায় করছি, কোরআন পাঠ করছি। তবে একটাই কষ্ট মসজিদে যেতে পারছে না কেউই। তাই দোয়া করি হে আল্লাহ! করোনা ভারাইরাস মহামারি থেকে আমাদেরকে হেফাজত করুন। হে আল্লাহ! আমাদের পাপের কারণে মসজিদে বাজামাত নামাজ থেকে বঞ্চিত কর না। হে আল্লাহ! মুসলিম উম্মাহকে সব ধরনের মহামারি ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন। হে আল্লাহ! আমাদের তাওবা কবুল করুন। তুমি ছাড়া আমাদের ফরিয়াদ শোনার আর কেউ নেই। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া আর কে আছে? যার কাছে আমারা সাহায্য চাইবো? তবে রমজানের এই দিনগুলোতে বেশ ভালোভাবেই অতিবাহিত করার সুযোগ পাচ্ছি, আলহামদুলিল্লাহ।’

আরো পড়ুন: শুরু হল মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে মধ্য দশক

ঢাকায় কর্মরত শিক্ষক সুলতানা নুসরাত জাহান ডালিয়ার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৫ মার্চ তখন পুরো দমে স্কুল চলছে। আমরা ব্যস্ত ১ম সাময়িক পরীক্ষার সিলেবাস শেষ করা নিয়ে। তখন গুঞ্জন শুরু হলো স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে এবং সত্যি ১৭ই মার্চ থেকে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের জন্য স্কুল বন্ধ করে দেয়া হলো, তা এখন অব্দি বন্ধ রয়েছে। এমন ছুটি কারো কাম্য হতে পারে না। একটা উৎকণ্ঠা সারাক্ষণ চারপাশে ঘিরে রেখেছে। একটা নির্বাসিত জীবনে আমরা সবাই আঁটকে গেছি। তবে রোজা এসে আমাদের মনটাকে অনেকটা শান্ত করেছে। মুসলমানদের জন্য এবারের রোজা দোয়া করার এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। অফিস নেই, ঈদের কেনাকাটা করার সুযোগ ও বাহানা নেই, সুযোগ রয়েছে শুধু পরিবারের সবাইকে নিয়ে আল্লাহকে ডাকার। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা যাতে আল্লাহর নৈকট্য, ক্ষমা আর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এই দোয়া নিজের ও সবার জন্য।’

এ বিষয়ে ঢাকা খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা বিএসসি ২য় বর্ষে পড়ুয়া ছাত্রী রাহিলা রহমত তুতুল বলেন, ‘আজ আমার গৃহবন্দীর ৪৫তম দিন চলছে! এর মধ্যে রোজার প্রবেশ! সত্যি বলতে কি এমনভাবে রোজার মাসের আগমনে অনেকটা অবাকই হয়েছিলাম। অদ্ভুত এক অনুভূতির মধ্যে কাটছে দিনগুলো। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, সাহরির সময় দেখা মুখগুলোকে ইফতারেও দেখতে পাই, যার অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ। অন্যান্য সময় এক এক জন এক এক জায়গায় থাকতাম। অনেক সময়তো বাসে বসেই ইফতার করেছি, নিজ কর্মস্থল ও ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসকে মিস করছি ঠিকই। কিন্তু, এটাও বুঝতে পেরেছি যে কাছের মানুষগুলোর সাথে গৃহে বন্দী হওয়াটও অদ্ভুত স্বর্গীয় সুখের অনুভব যোগায়।’

তিনি বলেন, ‘একসাথে ইফতার বানানো, প্রতিদিন নতুন নতুন ইফতার বানানোর প্ল্যান করা, একসাথে পরিবারের সদস্য মিলে আড্ডা দেয়া, বাকি সময়টা বই পড়ে ও আকাশ দেখে কাটিয়ে দিচ্ছি দিব্যি। এইভাবেই আবিষ্কার করলাম চারিদিকে করোনা মহামারির ভয়াবহতায় প্রকৃতির কিচ্ছু যায় আসছে না। তার যেন ঈদের আনন্দ, প্রতিদিনই সে নতুন নতুন রঙে রঙিন হয়ে গৃহবন্দী মানুষগুলোকে দেখাচ্ছে তার রূপ। এ মহামারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে অনেক কিছু। আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া, ঈদের ছোঁয়ায় আর রমজানের কল্যাণে যেন এই মহামারির ছুটি হয়।’

আসলেই লকডাউনে রমজানের দিনগুলোতে আমাদের ইবাদত-বন্দেগিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এই দিনগুলোতে কোরআন খতম দেয়ার চেষ্টা করছি। কোরআনী দোয়াগুলো নিজে মুখস্থ করছি এবং সন্তানকে মুখস্থ করানোর চেষ্টা করছি।

ইতিমধ্যে পবিত্র রমজানের প্রথম দশক পার করে আমরা মাগফিরাতের দশকের প্রথম রোজা সুস্থতার সাথে রেখেছি, আলহামদুলিল্লাহ। দোয়া করছি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন মুসলিম উম্মাহকে এ দশকে ক্ষমা করেছেন। এছাড়া শেষ দশক অর্থাৎ নাজাতের দশকেও যেন আমরা নাজাত লাভ করি, সেই দোয়াই থাকবে।

এই দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করে দিন কাটলেও সকল পরিচিত জনকে খুব মিস করি। ঘরের নানান কাজের ভিড়ে, বাচ্চার দেখাশোনার ফাঁকে, নামাজ ও দোয়ার শেষে, সাহরি ইফতারের আয়োজনে, কোরআন পড়ার শেষে, সকল কাজের অবসানে হে খোদা তোমার কাছে একটাই চাওয়া তুমি বিশ্বকে এই মহামারি থেকে রক্ষা কর। আর আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দাও। আমরা যেনো দুনিয়াবি কাজে ব্যস্ত হয়ে তোমায় না ভুলে যাই।

হে দয়াময় প্রভু! আমাদের ওপর তোমার কৃপাবারি বর্ষণ করো। আমিন, সুম্মা আমিন।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত