ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৫ °সে

করোনায় ঈদ উদযাপন ও আমাদের করণীয়

করোনায় ঈদ উদযাপন ও আমাদের করণীয়
করোনায় ঈদ উদযাপন ও আমাদের করণীয়।ছবি:সংগৃহীত

শনিবার সন্ধ্যায় দেশের আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি, তাই সোমবার (২৫ মে) মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে।

আল্লাহপাকের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের একমাস সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে যে ঈদ আসে তা হলো ঈদুল ফিতর। যদিও এবার বিশ্বময় মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে সেভাবে হয়তো ঈদ উদযাপন করা সম্ভব হবে না যেভাবে মুসলিম বিশ্ব প্রতি বছর ঈদ উদযাপন করে থাকেন। ইনশাল্লাহ আল্লাহতায়ালা যেভাবে চাইবেন সেভাবেই আমরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করব। বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার কর্তৃক নিয়ম-নীতি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই মুসলিম উম্মাহ ঈদ উদযাপন করবে।

একজন রোজাদারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো আল্লাহতায়ালার আদেশ অনুযায়ী মাসব্যাপী রোজা রাখতে আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন। এ খুশি প্রকাশ করতেই রমজান মাস শেষ করে শাওয়াল মাসের ১লা তারিখে ঈদের আনন্দে মিলিত হয়। আর এই দিনটির মাধ্যমে আল্লাহপাক মুমিনের জন্য সকল বৈধ খাবার ও পানীয় ও কাজ কর্ম যা কিনা রোজার কারণে বিরত রেখে ছিলেন তার অনুমতি প্রদান করেন।

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। মুসলিম উম্মাহ বছরে দু’টি ঈদ পালন করে থাকে আর তা হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। একটি আসে পবিত্র মাহে রমজানে রোজা পালনের মাধ্যমে আর অপরটি আসে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান কোরবানির স্মৃতিরূপে পশু কোরবানির মাধ্যমে। মুসলিম উম্মাহ ঈদ আল্লাহপাকের শোকরানা স্বরূপ আদায় করে থাকেন। একজন আল্লাহপ্রেমিক মাত্রই তার সকল আনন্দ খোদার সন্তুষ্টির সাথেই যুক্ত করে। তাই একজন প্রকৃত আল্লাহপ্রেমিক খোদার সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ পেলে শোকরানা আদায় করে থাকে আর ঈদ আমাদের সেই শোকরানা আদায়ের সুযোগ করে দেয়। তাই সকলে মিলেমিশে শোকরানা স্বরূপ দুরাকাত নামাজের মাধ্যমে ঈদ পালন করে মুসলিম উম্মাহ।

অথচ এই ঈদের দিনেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ধর্মের নামে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারণ করে নিরীহ মানুষকে খুন করা হচ্ছে। কারোর আবার শিরোচ্ছেদ করা হচ্ছে। আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিরীহ শান্তিকামী শত শত মানুষকে পাখির ন্যায় মেরে ফেলা হচ্ছে। প্রত্যেকটি মুসলিম দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ আজ আতঙ্কগ্রস্থ। এমন দুর্বিপাকে নিপতিত মানুষদের জন্য এ ঈদ প্রকৃত ঈদ হতে পারে না। সবার হৃদয়ে যখন প্রশান্তি লাভ হবে, হৃদয় থেকে যখন আনন্দ বের হবে তখনই হবে প্রকৃত ঈদ।

আরো পড়ুন: সদকাতুল ফিতর প্রত্যেকের জন্য ওয়াজিব

ঈদের চাঁদ অর্থাৎ শাওয়ালের চাঁদ দেখার পর তাকবীর পড়তে হয়-আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। অর্থ: আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সব প্রশংসা আল্লাহর।

ঈদের পূর্বে প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, শিশু এমনকি সদ্য জন্মলাভকারী শিশুর জন্যও নির্ধারিত ফিতরানা আদায় করা জরুরি। ফিতরানার অর্থ দিয়ে গরীব, অসহায় দুস্থগণ অন্যান্যদের সাথে ঈদের আনন্দ করে থাকে। যেহেতু ফিতরানার টাকা দিয়ে দুস্থ অসহায়গণ ঈদ করে তাই ঈদের কিছুদিন পূর্বে এই অর্থ আদায় করা সবচেয়ে উত্তম। এ ফিতরানা ঈদের নামাজের আগেই আদায় করা উচিত।

কেননা গরীব রোজাদার যেন ফিতরানার অর্থ দিয়ে ঈদের খুশিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। ফিতরানা দেয়া কারও ওপর কোনো প্রকার অনুগ্রহ নয়। এটা আমাদের জন্য ইবাদতের অংশ। এমনকি যে ব্যক্তিকে ফিতরানার সাহায্য দেয়া হয়, তার নিজের পক্ষ থেকেও ফিতরানা দেয়া কর্তব্য। সকলের অংশগ্রহণের ফলে সদকাতুল ফিতরের ফান্ডটি একটি সাধারণ ফান্ডে পরিণত হয়। যার ফলে এ থেকে যারা উপকৃত হয় তাদের মনে হীনমন্যতার ভাব সৃষ্টি হয় না। মূল বিষয় হলো ফিতরানা আদায়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের গরীব ভাইদের দু:খ-কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি এবং তাদেরকেও ঈদের আনন্দে অন্তর্ভুক্ত করি। যাদেরকে আল্লাহতায়ালা ধন-সম্পদ দিয়েছেন তারা আল্লাহর রাস্তায় এবং গরীব অসহায়দের প্রতি যতই দান করুক না কেন এতে কিন্তু তার ধন-সম্পদে কমতি দেখা দিবে না বরং বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

ঈদের অনুষ্ঠান সাধারণত খোলা আকাশের নীচে অথবা জামে মসজিদে হয়ে থাকে। আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) ঈদগাহ যাওয়ার জন্য ভিন্ন রাস্তা ও ফিরে আসার জন্য ভিন্ন রাস্তা ব্যবহার করতেন যেন অনেক বেশী লোকের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং যেন তাদের খোঁজ-খবর নেয়া যায়। যদিও করোনা পরিস্থিতির কারণে একাজটি করা এবার মুসলিম উম্মাহর জন্য সম্ভব হবে না কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রতিবেশীর খোঁজ অবশ্যই নিতে হবে।

পবিত্র ঈদ উপলক্ষে ঈদের উপহার বিতরণ করা সামর্থ্যবানদের জন্য কর্তব্য। এছাড়া আমাদের সমাজে ঈদের খুশিতে আত্মীয়-অনাত্মীয় পরস্পরকে তোহফা বিনিময় করে থাকে, যা একটি ভাল রীতি। এতে আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সুদৃঢ় হয়। কাপর-চোপড়, দ্রব্যাদি, টাকা-পয়সা ঈদের তোহফা হিসাবে বিতরণ করা হয়ে থাকে। অনেকে তৈরি খাবার, মিষ্টি বিতরণ করে থাকে। অনেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কুশলাদি বিনিময় ও তোহফা বিতরণ করে থাকেন আর এসবের মাঝেই একজন আল্লাহপ্রেমিক খুঁজে পায় তার রবের সাক্ষাত। তবে এবারের ঈদে এটি না করাই উত্তম। সামর্থ্যবানরা এবারের ঈদের বাজেটটি অসহায় মানুষদের জন্য খরচ করতে পারেন। কেননা দীর্ঘ দিন ধরে করোনা পরিস্থিতির কারণে সাধারণ খেঁটে খাওয়া মানুষ এবং দরিদ্ররা অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা প্রকৃত ঈদ উদযাপনের আনন্দ উপভোগ করতে পারি।

এছাড়া এ বিষয়টিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশের মসজিদ কিংবা বাইরে বিশাল জামাআতে ঈদের নামাজ আদায়ে রয়েছে বিধি-নিষেধ। আমরা আশা করি প্রতিটি মুসলমান অবশ্যই সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসরণ করবেন এবং সে অনুযায়ী ঈদের নামায আদায় করবেন।

যে নির্দেশনাসমূহ আমরা মেনে চলবো:

ঈদের নামাজের জামাতের পূর্বে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দ্বারা পরিষ্কার করতে হবে।ঈদের নামাজের জামাতের সময় মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিগণ প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসবেন। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধ নিশ্চিতকল্পে মসজিদে প্রবেশদ্বারে সাবান অথাবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। মসজিদের ওজুখানা ব্যবহার না করে প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসস্থান থেকে ওযু করে মসজিদে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

ঈদের নামাজের জামাতে আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিগণকে অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে। ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দাঁড়াতে হবে। এক কাতার অন্তর অন্তর কাতারবদ্ধ হতে হবে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে মসজিদে জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো থেকে বিরত থাকুন। করোনা পরিস্থিতিতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাসায় যাতায়াত করা থেকে বিরত থাকুন।

মহামারি করোনা ভাইরাসের বিস্তাররোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের অনুরোধ জানিয়েছে। (সূত্র: জাগোনিউজ২৪)

ঈদের নামাজের মাধ্যমেই ঈদের প্রকৃত আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ঈদের সকল প্রস্তুতি মূলত: আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে শোকরানা স্বরূপ দু’রাকাত নামাজ পড়ার মাধ্যমে। সকালের দিকে খোলা মাঠে অথবা মসজিদে এই দু’রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়। ঈদের নামাজে আজান ও আকামত নেই। দু’রাকাত নামাজে সর্বমোট ১২টি তাকবীর দিতে হয়। প্রথম রাকাতে সূরা কারাত শুরু করার পূর্বে ৭টি তাকবীর অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলতে হয় তারপর যথারীতি ১ম রাকাত পুরা করে ২য় রাকাতের শুরুতে ৫টি তাকবীর দিয়ে যথারীতি নামাজ শেষ করে সমসাময়িক বিষয়ের ওপর খুতবা প্রদান করতে হয়।

খুতবা শেষ হলে ইজতেমায়ী দোয়া করে সবাই মোলাকাত করতে থাকে। ঈদ আনন্দে সকলে বুকে বুকে মিলে একাকার হয়ে যায়। কিন্তু করোনা মহামারি এবার আমাদেরকে মোলাকাত ও বুকে বুক মেলানো থেকে দূরে রাখবে। মন চাইলেও এই কাজ থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের উচিত হবে ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে সরকার যতটুকু অনুমতি প্রদান করেছে তা অনুসরণ করে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে নামাজ আদায় করা।

ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য মূলত: আল্লাহতায়ালার কৃতজ্ঞতা আদায় করা। আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি হাসিল করে তারই ইবাদতের মাধ্যমে শোকরানা আদায় করে এটাকে বাস্তবে প্রকাশ করা। তাই এই আনন্দ শুধু খুশি বা মজার জন্য নয় বরং আপন প্রভুর বান্দা হিসাবে স্থায়ীভাবে ইবাদত প্রতিষ্ঠায় রত থাকা। আমরা যেন ঈদের আনন্দে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সর্বদা জীবনের জন্য স্থায়ী ইবাদত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে নেই।

আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে সর্বদা তার শোকরানা আদায় করার তৌফিক দিন। আসুন, আমরা দয়াময় প্রভুর দরবারে সকাতর প্রার্থনা করি তিনি যেন ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে বিশ্বকে সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন, আমিন।

লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এএএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০৬ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন