ঢাকা রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৪ °সে

সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ এইডসের চেয়েও ভয়াবহ

সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ এইডসের চেয়েও ভয়াবহ
ছবি: ইত্তেফাক

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে আমাদের দেশে ফেসবুক সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ মাধ্যমের যেমন ভালো দিক রয়েছে তেমনি খারাপ দিকও রয়েছে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে ততই এর ব্যবহারে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। সামান্য অসকর্তায় অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ সামাজিক অশান্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেক নিউজের বিষয়ে সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়টি নিয়ে সম্প্র্রতি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর তার পরামর্শমূলক মন্তব্য শেয়ার করেন দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার ও ফেক নিউজ আমাদের দেশের জন্য একটি আতঙ্ক। একটি ফেক নিউজকে কেন্দ্র করে মারামারি ও হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে আমাদের দেশে। ফেক নিউজ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘ফেক নিউজের উপদ্রব অনেক আগে থেকেই ছিল। তবে এখন ইন্টারনেট ভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর জনপ্রিয়তার কারণে এগুলো সমাজকে বেশি প্রভাবিত করছে। শুধু অনলাইনেই নয়, প্রিন্টেও আজকাল এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি সাংবাদিকতার জন্য অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জ। ফেক নিউজ চেনার উপায় রয়েছে। কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকলে ফেক নিউজ চিহ্নিত করা যেতে পারে।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজার হাজার নিউজ দেখি আমরা। এগুলো থেকে কীভাবে বুঝতে পারব কোনটা সঠিক নিউজ আর কোনটা ফেক নিউজ? এমন প্রশ্নের জবাবে আলমাস কবীর বলেন, ‘ফেক নিউজ চেনার অনেকগুলো উপায় রয়েছে। কয়েকটি বিষয়ে লক্ষ্য করলে ফেক নিউজ চিহ্নিত করা সম্ভব। বিষয়গুলো হলো—সাধারণত ফেক নিউজগুলোর হেডলাইনটা একটু চাঞ্চল্যকর হয়ে থাকে। অনেক সময়েই ঐ শিরোনামের সঙ্গে বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য থাকে না অথবা ভুল তথ্য দিয়ে সাজানো থাকে। শুধু তা-ই নয়, যে সাইটগুলো থেকে ঐ নিউজগুলো পাবলিশ করা হয়, সেগুলোকে দেখলেই আনপ্রফেশনাল সাইট মনে হবে। নিউজের ভাষায় এটিকে স্টান্টবাজিও বলে কেউ কেউ।’

তিনি আরো জানান, অনেক সময় এমন কিছু নিউজ দেখা যায় যেগুলো একতরফা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সম্পাদিত। এমন নিউজও ফেক নিউজের আওতাভুক্ত। আবার কখনো কখনো দেখা যায়, কোনো পুরোনো নিউজকে ফলো করে, কাটছাঁট করে নিউজ সম্পাদনা করা হয়। এক্ষেত্রে নিউজে ব্যবহূত ছবি ফটোশপ বা নিজের ইচ্ছামতো এডিট করে ছবি তৈরি করা হয়। দ্রুত যে নিউজগুলো ভাইরাল হয়, সেগুলোর বেশির ভাগই ফেক নিউজ। দ্রুত ভাইরাল হওয়া নিউজগুলোতে সতর্কতা আরো জরুরি বলেও মন্তব্য করেন সৈয়দ আলমাস কবীর।

ফেক নিউজ কেন করা হয় এবং কাদের নিয়ে ও কাদেরকে টার্গেট করে করা হয়? এমন প্রশ্নের উত্তরে আলমাস কবীর বলেন, ‘ফেক নিউজ সাধারণত, রাজনীতিবিদ, বড়ো ব্যবসায়ী, তারকা ও খ্যাতিমান ব্যক্তি ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে হয়ে থাকে। যারা এ নিউজগুলো করেন, তারা জানেন দ্রুত ভাইরাল করতে হলে এ বিষয়গুলোর আশ্রয় নিতে হবে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে থাকে। এদের বিভিন্ন পেজ থাকে যেগুলোতে লাইক বা শেয়ায়ের ভিত্তিতে তাদের অর্থ উপার্জন হয়। এছাড়াও, একদল সুবিধাভোগী ফেক নিউজ ছড়িয়ে নিজেদের ফায়দা হাসিল করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অথবা সরকারের সাফল্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে তা ভাইরাল করেও ফায়দা লুটে কেউ কেউ।’

সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজের প্রভাব সম্পর্কে আলমাস কবীর বলেন, ‘ফেক নিউজ সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই বেশি ছড়ায়। এর ফলে ব্যক্তি তথা সমাজের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। রামুতে ঘটে যাওয়া ঘটনা, চাঁদে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছবি, সম্প্র্রতি ভোলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা এর বড়ো উদাহরণ হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া যত আধুনিক হচ্ছে ফেক নিউজ কন্ট্রোল করা তত কঠিন হচ্ছে। আর একটি বিষয় হলো—ইদানিং ফেক ভিডিও দেখা যাচ্ছে। এই ফেক ভিডিও চিহ্নিত করতে বিশ্বের অনেক দেশে ল্যাব তৈরি হয়েছে। তবে আমাদের দেশে এখনো এ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।’ ফেক নিউজের প্রভাবে সঠিক নিউজ থেকেও অনেকের আস্থা সরে যাচ্ছে দিন দিন। এ বিষয়টি শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন আলমাস কবীর। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ফেক নিউজের প্রভাব সব মহলেই ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্র্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যে তাদের আস্থা নেই। এখানে যে ধরনের নিউজগুলো ছড়ায়, তাতে তাদের আস্থা দিন দিন কমে আসছে। এতে তারা বিশ্বাসও রাখতে পারছে না, আবার বর্জনও করতে পারছে না।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ ছড়ানোতে ইন্টারনেট হলো—সবচেয়ে দ্রুততম বাহন। এর ওপর ভর করেই সর্বস্তরের জনগণের কাছে নিমিশেই পৌঁছে যায় নিউজগুলো। ৫৫.৫ শতাংশ শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিতে তারা ইন্টারনেটে নিরাপদ নয়। ফেক নিউজ ও প্রোপাগান্ডার জন্য ইন্টারনেটই দায়ী।

৬৩.৬ শতাংশ শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিতে ফেক নিউজ প্রতিরোধ জরুরি। তাদের মতে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফেক নিউজ প্রতিরোধ করা না গেলে এর প্রভাব সমাজের মধ্যে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়বে। তারা মনে করে, সঠিক নিউজ চিহ্নিত করতে বিশ্বাসযোগ্য নীতিমালা দরকার, যার ওপর ভিত্তি করে সঠিক নিউজ চিহ্নিত করা যায় অথবা ফেক নিউজ চিহ্নিত করে দোষীদেরকে শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হবে। এতে যেমন দোষীরা শাস্তি পাবে ঠিক, তেমনি ফেক নিউজের প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে দেশের জনগণ ও সমাজ।

আমাদের দেশের শিশুরা বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহার শিখছে। তারা গেম খেলা, ড্রইং করা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়াতেও অংশগ্রহণ করছে। ইউটিউবে শিশুদের নিয়ে নির্মিত কার্টুনগুলো দেখছে আবার বিভিন্ন সাইটেও প্রবেশ করছে জেনে বা না জেনে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় শিশুরা এডাল্ট সাইটেও প্রবেশ করছে ভুলক্রমে। এ বিষয়টিতে শিশুদের অভিভাবকরা যদি সতর্ক থাকেন তাহলে তার শিশুটি ভুল পথে প্রভাবিত হবে না। তাকে বিভিন্ন হয়রানি থেকেও রক্ষা করা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন আলমাস কবীর।

এ বিষয়ে তিনি আরো জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় ১০ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে ধর্মীয় আক্রমণের শিকার হয়। এতে তাদের শিশুমনে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ও ধর্মীয় বিষয়ে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। শিশুর অভিভাবকরা এ বিষয়টিতে সতর্ক হতে পারেন। ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে, ভুল তথ্য ছড়ানোর সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম হলো—ইন্টারনেট। এ মাধ্যমে যখন কেউ নতুন যুক্ত হয়, তখন সে আসলে বুঝতে পারে না কোনটি সঠিক তথ্য আর কোনটি ভুল তথ্য। ৪৯ শতাংশ স্কুল শিক্ষার্থী অনলাইনে তাদের বন্ধুবান্ধব থেকে গালিগালাজ শিখে। এজন্য ইন্টারনেটের ব্যবহারে শিশুদের অভিভাবকদের সতর্কতা জরুরি। অভিভাবকরা চাইলে তার শিশুকে নিরাপদ ইন্টারনেট উপহার দিতে পারেন। তার শিশু কোন সাইটে প্রবেশ করছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করছে— এ বিষয়গুলো ফলোআপ করা কর্তব্য। সামান্য ভুলে অসামান্য ক্ষতির মুখে পড়তে পারে তার শিশু। ইন্টারনেটে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য অনেকগুলো কাজ করা যেতে পারে। যেমন—ইউটিউবে এডাল্ট চ্যানেলগুলোর ইউআরএল ব্লক করে দিতে পারেন, কিওয়ার্ড দিয়ে ব্লক করে দিতে পারেন। নিয়মিত ফলোআপের পাশাপাশি শিশুর ব্যবহূত ডিভাইসের সার্চ হিস্ট্রি ফলো করলে বুঝতে পারা যাবে যে শিশুটি কোন কোন সাইটে প্রবেশ করছে। সন্দেজনক কোনো সাইটে প্রবেশ করলে তা ব্লক করে দেওয়া উচিত। গুগল এরই মধ্যে শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শিশুদের জন্য আলাদা জিমেইল সার্ভিস ও ইউটিউব সার্ভিস চালু করেছে। নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য কারা কাজ করবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আলমাস কবীর বলেন, ‘ সমীক্ষা অনুযায়ী ১০০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের ধারণা, ইন্টারনেটে নিরাপত্তা দিতে অভিভাবকদের ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু শিশু তার অভিভাবকদের নিকটে ও চোখে চোখে থাকে এবং ইন্টারনেটের ব্যবস্থা তারাই করেন, সেহেতু অভিভাবকদের সতর্কতা পালন করাটা এখানে মুখ্য। অন্যদিকে ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে, সরকার ও এনজিওর উচিত নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে কাজ করা।’

ফেক নিউজ কন্ট্রোল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সতর্কতা নিয়ে আলমাস কবীর বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা হলো এমন যে, প্রতি মিনিটে শিশু জন্মহারের তুলনায় ফেসবুক আইডি বেশি খোলা হচ্ছে। এমন অবস্থায় অবিলম্বে সতর্ক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। রাস্তায় চলাচল করতেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। তেমনি সোশ্যাল মিডিয়াতে সুরক্ষিত থাকার জন্যও কিছু নিয়মনীতি মেনে চলা উচিত। ইন্টারনেটে অনুপযোগী কনটেন্টগুলো বাতিল করতে সরকার এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। যদিও তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা বা কন্ট্রোল করা সম্ভব হবে না। নতুন নতুন প্রযুক্তির আগমনে সবসময় কন্ট্রোল করা সম্ভব হয় না। এজন্য আমাদের সতর্ক থাকার বিকল্প নেই।’

তিনি জানান, সম্প্র্রতি মার্কিন সিনেটরদের বৈঠকে মার্ক জাকাবার্গ এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, ফেক নিউজ ফিল্টার করা ফেসবুকের পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ কন্ট্রোল করা খুব একটা সহজ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, ‘৭০ দশকে জনসংখ্যা বিষয়ে একটি প্রচার প্রাধান্য পেয়েছিল; তা হলো—‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’। এর সুফল কিন্তু আমরা পেয়েছি। এটি ছিল সতর্কতামূলক কার্যক্রম। পরবর্তীতে ৯০ দশকে এইডস নিয়ে এমন একটি সতর্কতামূলক প্রচার কার্যক্রম চলেছে, যার সুফল আমরা পেয়েছি। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া এইডসের চেয়েও ভয়াবহ। এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে সচেতনতা ও সতর্কতামূলক প্রচারের ব্যবস্থা অবিলম্বে নিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই এ সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শিশুদের শিখাতে হবে তারা ইন্টারনেটে কীভাবে সতর্ক থাকবে।

২০১৮ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন হয়েছে। এ আইন আমাদের বিপক্ষে নয়, আমাদের নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে। এটি সতর্কতার একটি ধাপ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সাক্ষাত্কার : মাহবুব শরীফ

ইত্তেফাক/বিএএফ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন