ভালো কাজের হোটেল

ভালো কাজের হোটেল
প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজের বিনিময়ে রাতে খাবারের হোটেল গড়ে উঠেছে রাজধানীর কমলাপুর বাসস্ট্যান্ডে।

‘ভালো কাজের বিনিময়ে আহার’। প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজের বিনিময়ে রাতে খাবারের হোটেল গড়ে উঠেছে রাজধানীর কমলাপুর বাসস্ট্যান্ডে। আরিফুর রহমানের পরিচালনায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এই হোটেলে কাজ করে থাকে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এলাকার দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য এই ছেলেমেয়েরা রাতের খাবার পরিবেশন করে।

কিছুদিন আগে হেঁটে যাচ্ছিলাম কমলাপুর বাসস্ট্যান্ড দিয়ে। দেখলাম বাসস্ট্যান্ডে বসে অনেক মানুষ খাবার খাচ্ছে। কিছু ছেলেমেয়ে তাদের খাবার পরিবেশন করছে। অনেক আনন্দ করেই তারা খাচ্ছিল। কয়েক দিন লক্ষ করলাম। পরে ওদের সঙ্গে কথা বললাম। জানলাম, ওদের বড় ভাই মনির ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। তার নেতৃত্বেই চলছে কমলাপুরের এই হোটেল। আমি ওদের সঙ্গে থাকতে চাই শুনে তাদের সদস্য হওয়ার নিয়ম জানালেন। সদস্যদের একটি ব্যাংক দেওয়া হয়। তার মধ্যে প্রতিদিন ১০ টাকা করে জমা করে বা মাসে ৩০০ টাকা দিতে হবে। একটি ভালো কাজের বিনিময়ে রাতের খাবার খাবে এমন দুস্থ বা অসহায় মানুষের জন্য আরিফ রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় কয়েক বন্ধু মিলে ২০১১ সাল থেকে শুরু করেন এই হোটেল।

এখন তাদের বাসাবোতে একটি অফিসও রয়েছে। সোহানুর রহমান আসিফ, সাকিব হাসান শাওন, ফারুক আহমেদ, মনিরুজ্জামান মনির, রুবেল আহমেদ হিমেলসহ অনেকেই এ কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাদের সহায়তা করছে স্কুল ও কলেজের অনেক শিক্ষার্থী।

তারা বাসাবোতে একটি স্কুলে রান্না করে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ জন দুস্থ ও অসহায় মানুষের মধ্যে খাবার পরিবেশন করছেন। তবে শর্ত থাকে, প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করতে হবে। শুক্রবার বাদে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তারা খাবার পরিবেশন করে থাকেন কমলাপুর বাসস্ট্যান্ডে। শুক্রবার তারা বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় খাবার পরিবেশন করেন। এর পাশাপাশি এয়ারপোর্ট, বনানী কবরস্থান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার ও সদরঘাটে সপ্তাহে এক দিন করে খাবার পরিবেশন করে এই সংগঠন।

কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে শুরু করেছে এই হোটেল। সেখানে মাসে এক দিন করে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। ভালো কাজের বিনিময়ে খাবারের হোটেলের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বাড্ডা আনন্দনগর ও বাসাবোতে দুটি স্কুলও পরিচালনা করছে তারা। স্কুলটিতে আড়াই শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশু পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। কমলাপুর বাসস্ট্যান্ডে ফুটপাতে পড়ে থাকা একটি শিশুকে দেখেছেন অনেকেই। নোংরা কাপড়-চোপড় আবৃত অসুস্থ শিশুটিকে দেখে দুই দিন খুব খারাপ লাগছিল। কী করা যায় বুঝতে পারছিলাম না। তৃতীয় দিনে দেখলাম ছেলেটি আনন্দ করে এক প্যাকেট খাবার খাচ্ছে। ওর মুখের হাসি আমার মাতৃহৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। পরের দিন ওকে খাবার দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করে আমার কাছে। ভালো কাজের হোটেলের নেতৃত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা মনিরুজ্জামান মনিরের সঙ্গে কথা বললাম। মনির জানান, ছেলেটি নিজে খেতে পারে না। দুই-এক দিন কিছুটা খাবার খায়, তবে সব খাবার ফেলে দেয়। তাই ওকে খাওয়ানোর জন্য লোক ঠিক করা হয়েছে। তারাও ঐ ফুটপাতেই অবস্থান করে।

মনির আরো জানান, ছেলেটিকে ওদের সহায়তায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়েছেন তারা। ছেলেটির একটি পা নেই, অন্যটিও অসুস্থ। ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হলে প্রথমে ডাক্তার-নার্সরা তাকে দেখতে রাজি না হলেও পরে জার্সি দেখে এবং পরিচয় শুনে চিকিৎসা দেয়। মনির সন্ধ্যায় এসে তাকে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো দেখেন। পরে পাশের লোকটির সহায়তায় খাবার খাইয়ে দেওয়া হতো।

গত ২৭ ডিসেম্বর মোমিন হোসেন নামের ঐ ছেলে মারা যায়। তার বয়স আনুমানিক ১৪ বছর। শেষ পর্যন্ত তার বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা এই সংগঠনই করে।

আরও পড়ুন: এক বাদাম বিক্রেতা

যান্ত্রিক এই জীবনযাত্রায় আশপাশে নষ্ট হয়ে যাওয়া বহু মানুষ যখন ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে ন্যায়-নীতিবিবর্জিত জীবন চালাতে ব্যস্ত সময় পার করছে; তার মধ্য থেকেও এদের মতো অনেকেই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন।

দৈনন্দিন কাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে এমন একটা পরিবেশ সত্যি অকল্পনীয়। যেখানে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ সারি বেঁধে আনন্দ করে খাবার খাচ্ছেন; তাদের মুখে নির্মল তৃপ্তির হাসি পথ চলায় প্রতিদিন এনে দেয় প্রশান্তি।

লেখক: সাংবাদিক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x